ইরানের প্রস্তাবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প কি সম্মত হবে

ইরানের প্রস্তাবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প কি সম্মত হবে
মোসাদ্দেকুর রহমান
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৪: ০৫

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
চলমান যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা এখন বিশ্বের সামনে এক নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যুদ্ধবিরতি, অন্যদিকে উভয় পক্ষের দর-কষাকষি—এই দুইয়ের মাঝে শেষ পর্যন্ত কি কোনো বাস্তবসম্মত চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব?। আর সেই সমঝোতার শর্তে কি ডোনাল্ড ট্রাম্প সত্যিই রাজি হবেন?
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের একের পর এক পোস্টে তিনি এমন একটি চিত্র তুলে ধরছেন, যেন ইরান বড় ধরনের ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে। তার দাবি, তেহরান হরমুজ প্রণালি আর কখনো বন্ধ রাখবে না, পারমাণবিক সক্ষমতা কার্যত পরিত্যাগ করবে, এমনকি আঞ্চলিক উত্তেজনাও কমাতে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এসব বক্তব্যের বাস্তবতা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি ইস্যুই এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি টানাপোড়েন। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান প্রণালিটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে রাজি হয়েছে। কিন্তু ইরানের বক্তব্য অনেক বেশি শর্তসাপেক্ষ। তারা বলছে, কেবল চলমান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। তাও আবার তাদের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল।
এই পার্থক্যটিই আসলে বড় ইঙ্গিত দেয়, দুই পক্ষ একই বিষয়কে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালি একটি কৌশলগত অস্ত্র, যা তারা সহজে হাতছাড়া করতে চাইবে না, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী এই জলপথকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি ‘কখনোই বন্ধ হবে না’-এই ধরনের দাবি বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।
এদিকে পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নে মতপার্থক্য আরও গভীর। ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘সব ইউরেনিয়াম’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে। কিন্তু ইরান এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি জাতীয় সার্বভৌমত্বের অংশ এবং এটি কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে পুরোপুরি সমর্পণযোগ্য নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যু থাকলেও এটি সম্ভবত শেষ পর্যায়ে গিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে। কারণ এটি দুই পক্ষের জন্যই সবচেয়ে সংবেদনশীল ও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ইস্যু।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ফেরত এবং যুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত সম্পদের ক্ষতিপূরণ। এই দাবিগুলো পূরণ না হলে তেহরানের পক্ষে বড় কোনো ছাড় দেওয়া কঠিন। ফলে আলোচনার টেবিলে এক ধরনের সমান্তরাল দর-কষাকষি চলছে, একদিকে নিরাপত্তা ও সামরিক ইস্যু, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সুবিধা।
লেবানন প্রসঙ্গ আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইসরায়েল সেখানে বোমা হামলা বন্ধ রাখবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। ইসরায়েল নিজের নিরাপত্তা কৌশলকে অগ্রাধিকার দেয়, এটি বহুবার দেখা গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
এছাড়া, ট্রাম্পের বক্তব্যে যে দৃঢ়তা দেখা যাচ্ছে তা অনেক বিশ্লেষকের কাছে কৌশলগত বলে মনে হচ্ছে। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে চাইছেন, যাতে বাজার স্থিতিশীল থাকে, তেলের দাম কমে এবং আলোচনার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি ভবিষ্যৎ কোনো চুক্তির ভিত্তি তৈরি করার একটি প্রচেষ্টা।
তবে বাস্তবতা হলো, এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। যেমন হরমুজ প্রণালি কতদিন উন্মুক্ত থাকবে? পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী হবে? নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে কি না। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই সব শর্তের সমন্বয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য সমঝোতা আদৌ সম্ভব কি না।
এই প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্নটি থেকেই যায়, ইরানের প্রস্তাবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প কি সম্মত হবেন।
উত্তরটি সহজ নয়। কারণ নতুন বাস্তবতায় এখন এটি শুধু দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তির বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ। ট্রাম্প হয়তো দ্রুত একটি সাফল্য দেখাতে চাইবেন, কিন্তু সেই সাফল্য বাস্তবসম্মত হতে হলে ইরানের শর্তগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সম্ভাবনার দরজা খোলা থাকলেও চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত। ট্রাম্পের প্রত্যাশা এবং ইরানের শর্তসাপেক্ষ অবস্থানের মাঝেই নির্ধারিত হবে এই আলোচনার ভবিষ্যৎ, যেখানে উভয় পক্ষকে প্রতিটি পদক্ষেপই হিসাব করে ফেলতে হচ্ছে।

চলমান যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা এখন বিশ্বের সামনে এক নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যুদ্ধবিরতি, অন্যদিকে উভয় পক্ষের দর-কষাকষি—এই দুইয়ের মাঝে শেষ পর্যন্ত কি কোনো বাস্তবসম্মত চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব?। আর সেই সমঝোতার শর্তে কি ডোনাল্ড ট্রাম্প সত্যিই রাজি হবেন?
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের একের পর এক পোস্টে তিনি এমন একটি চিত্র তুলে ধরছেন, যেন ইরান বড় ধরনের ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে। তার দাবি, তেহরান হরমুজ প্রণালি আর কখনো বন্ধ রাখবে না, পারমাণবিক সক্ষমতা কার্যত পরিত্যাগ করবে, এমনকি আঞ্চলিক উত্তেজনাও কমাতে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এসব বক্তব্যের বাস্তবতা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি ইস্যুই এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি টানাপোড়েন। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান প্রণালিটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে রাজি হয়েছে। কিন্তু ইরানের বক্তব্য অনেক বেশি শর্তসাপেক্ষ। তারা বলছে, কেবল চলমান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। তাও আবার তাদের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল।
এই পার্থক্যটিই আসলে বড় ইঙ্গিত দেয়, দুই পক্ষ একই বিষয়কে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালি একটি কৌশলগত অস্ত্র, যা তারা সহজে হাতছাড়া করতে চাইবে না, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী এই জলপথকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি ‘কখনোই বন্ধ হবে না’-এই ধরনের দাবি বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।
এদিকে পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নে মতপার্থক্য আরও গভীর। ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘সব ইউরেনিয়াম’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে। কিন্তু ইরান এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি জাতীয় সার্বভৌমত্বের অংশ এবং এটি কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে পুরোপুরি সমর্পণযোগ্য নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যু থাকলেও এটি সম্ভবত শেষ পর্যায়ে গিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে। কারণ এটি দুই পক্ষের জন্যই সবচেয়ে সংবেদনশীল ও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ইস্যু।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ফেরত এবং যুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত সম্পদের ক্ষতিপূরণ। এই দাবিগুলো পূরণ না হলে তেহরানের পক্ষে বড় কোনো ছাড় দেওয়া কঠিন। ফলে আলোচনার টেবিলে এক ধরনের সমান্তরাল দর-কষাকষি চলছে, একদিকে নিরাপত্তা ও সামরিক ইস্যু, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সুবিধা।
লেবানন প্রসঙ্গ আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইসরায়েল সেখানে বোমা হামলা বন্ধ রাখবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। ইসরায়েল নিজের নিরাপত্তা কৌশলকে অগ্রাধিকার দেয়, এটি বহুবার দেখা গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
এছাড়া, ট্রাম্পের বক্তব্যে যে দৃঢ়তা দেখা যাচ্ছে তা অনেক বিশ্লেষকের কাছে কৌশলগত বলে মনে হচ্ছে। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে চাইছেন, যাতে বাজার স্থিতিশীল থাকে, তেলের দাম কমে এবং আলোচনার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি ভবিষ্যৎ কোনো চুক্তির ভিত্তি তৈরি করার একটি প্রচেষ্টা।
তবে বাস্তবতা হলো, এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। যেমন হরমুজ প্রণালি কতদিন উন্মুক্ত থাকবে? পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী হবে? নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে কি না। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই সব শর্তের সমন্বয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য সমঝোতা আদৌ সম্ভব কি না।
এই প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্নটি থেকেই যায়, ইরানের প্রস্তাবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প কি সম্মত হবেন।
উত্তরটি সহজ নয়। কারণ নতুন বাস্তবতায় এখন এটি শুধু দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তির বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ। ট্রাম্প হয়তো দ্রুত একটি সাফল্য দেখাতে চাইবেন, কিন্তু সেই সাফল্য বাস্তবসম্মত হতে হলে ইরানের শর্তগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সম্ভাবনার দরজা খোলা থাকলেও চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত। ট্রাম্পের প্রত্যাশা এবং ইরানের শর্তসাপেক্ষ অবস্থানের মাঝেই নির্ধারিত হবে এই আলোচনার ভবিষ্যৎ, যেখানে উভয় পক্ষকে প্রতিটি পদক্ষেপই হিসাব করে ফেলতে হচ্ছে।

ইরানের প্রস্তাবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প কি সম্মত হবে
মোসাদ্দেকুর রহমান
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৪: ০৫

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
চলমান যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা এখন বিশ্বের সামনে এক নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যুদ্ধবিরতি, অন্যদিকে উভয় পক্ষের দর-কষাকষি—এই দুইয়ের মাঝে শেষ পর্যন্ত কি কোনো বাস্তবসম্মত চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব?। আর সেই সমঝোতার শর্তে কি ডোনাল্ড ট্রাম্প সত্যিই রাজি হবেন?
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের একের পর এক পোস্টে তিনি এমন একটি চিত্র তুলে ধরছেন, যেন ইরান বড় ধরনের ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে। তার দাবি, তেহরান হরমুজ প্রণালি আর কখনো বন্ধ রাখবে না, পারমাণবিক সক্ষমতা কার্যত পরিত্যাগ করবে, এমনকি আঞ্চলিক উত্তেজনাও কমাতে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এসব বক্তব্যের বাস্তবতা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি ইস্যুই এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি টানাপোড়েন। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান প্রণালিটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে রাজি হয়েছে। কিন্তু ইরানের বক্তব্য অনেক বেশি শর্তসাপেক্ষ। তারা বলছে, কেবল চলমান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। তাও আবার তাদের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল।
এই পার্থক্যটিই আসলে বড় ইঙ্গিত দেয়, দুই পক্ষ একই বিষয়কে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালি একটি কৌশলগত অস্ত্র, যা তারা সহজে হাতছাড়া করতে চাইবে না, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী এই জলপথকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি ‘কখনোই বন্ধ হবে না’-এই ধরনের দাবি বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।
এদিকে পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নে মতপার্থক্য আরও গভীর। ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘সব ইউরেনিয়াম’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে। কিন্তু ইরান এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি জাতীয় সার্বভৌমত্বের অংশ এবং এটি কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে পুরোপুরি সমর্পণযোগ্য নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যু থাকলেও এটি সম্ভবত শেষ পর্যায়ে গিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে। কারণ এটি দুই পক্ষের জন্যই সবচেয়ে সংবেদনশীল ও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ইস্যু।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ফেরত এবং যুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত সম্পদের ক্ষতিপূরণ। এই দাবিগুলো পূরণ না হলে তেহরানের পক্ষে বড় কোনো ছাড় দেওয়া কঠিন। ফলে আলোচনার টেবিলে এক ধরনের সমান্তরাল দর-কষাকষি চলছে, একদিকে নিরাপত্তা ও সামরিক ইস্যু, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সুবিধা।
লেবানন প্রসঙ্গ আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইসরায়েল সেখানে বোমা হামলা বন্ধ রাখবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। ইসরায়েল নিজের নিরাপত্তা কৌশলকে অগ্রাধিকার দেয়, এটি বহুবার দেখা গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
এছাড়া, ট্রাম্পের বক্তব্যে যে দৃঢ়তা দেখা যাচ্ছে তা অনেক বিশ্লেষকের কাছে কৌশলগত বলে মনে হচ্ছে। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে চাইছেন, যাতে বাজার স্থিতিশীল থাকে, তেলের দাম কমে এবং আলোচনার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি ভবিষ্যৎ কোনো চুক্তির ভিত্তি তৈরি করার একটি প্রচেষ্টা।
তবে বাস্তবতা হলো, এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। যেমন হরমুজ প্রণালি কতদিন উন্মুক্ত থাকবে? পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী হবে? নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে কি না। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই সব শর্তের সমন্বয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য সমঝোতা আদৌ সম্ভব কি না।
এই প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্নটি থেকেই যায়, ইরানের প্রস্তাবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প কি সম্মত হবেন।
উত্তরটি সহজ নয়। কারণ নতুন বাস্তবতায় এখন এটি শুধু দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তির বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ। ট্রাম্প হয়তো দ্রুত একটি সাফল্য দেখাতে চাইবেন, কিন্তু সেই সাফল্য বাস্তবসম্মত হতে হলে ইরানের শর্তগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সম্ভাবনার দরজা খোলা থাকলেও চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত। ট্রাম্পের প্রত্যাশা এবং ইরানের শর্তসাপেক্ষ অবস্থানের মাঝেই নির্ধারিত হবে এই আলোচনার ভবিষ্যৎ, যেখানে উভয় পক্ষকে প্রতিটি পদক্ষেপই হিসাব করে ফেলতে হচ্ছে।
/এমআর/




