শিরোনাম

জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে যেসব খাতে নামতে পারে ধস

জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে যেসব খাতে নামতে পারে ধস
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণার পর থেকে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে । তেলের দাম বাড়া মানে কেবল যাতায়াত খরচ বাড়া নয়, বরং এটি যেন এক অদৃশ্য কর যা অধিকাংশ পণ্যে যুক্ত হয়। মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ এমনিতেই সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কৃষিখাত, শিল্প উৎপাদনসহ সবক্ষেত্রেই অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে ।

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব খুব দ্রুত পড়েছে পরিবহন খাতে। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ায় ইতিমধ্যে বাস ভাড়া ৮৪ শতাংশ ও লঞ্চ ভাড়া ৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে মালিক সমিতিগুলো।

বাজার ও অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের প্রধান শিল্প খাতগুলোকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে পোশাক, সিরামিক এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মতো বৃহৎ খাতগুলো এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তেলের দাম বাড়ার ফলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান নড়বড়ে হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অস্থিরতার মধ্যেই শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাতে সরকার ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে, যা রবিার থেকে কার্যকর হয়েছে। গতকাল রাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা করে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।

যদিও গত ৩১ মার্চ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা (সংশোধিত)’ অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষ ভোক্তাপর্যায়ে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের বিক্রয়মূল্য অপরিবর্তিত রাখার বিষয়টির অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু এর ১৮ দিনের মধ্যেই দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টিকে সংশ্লিষ্টরা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ( আইএমএফ) নির্দেশনার প্রতিফলন বলে মনে করছেন।

যদিও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে আইএমএফের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সরকারি তহবিলে চাপ বাড়ায় দাম বাড়ানো হয়েছে।

এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের দাম ১১৪ টাকা করা হয়েছিল, যা ছিল সেই সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ। তবে এবার ১১৫ টাকা নির্ধারণের মাধ্যমে সেই রেকর্ড ভেঙে গেল। যদিও গত বছরের তুলনায় তেলের চাহিদা হঠাৎ ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে আশ্বস্ত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, ‘বাজারে যে অস্বাভাবিক চাহিদা দেখা যাচ্ছে তা আসলে যৌক্তিক নয়। মানুষের ভোগান্তি কমাতে আমরা সরবরাহ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছি।’

দেশে মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৩ শতাংশই ডিজেল। তাই এর দাম বাড়ার প্রভাব গণপরিবহন এবং কৃষি খাতেই বেশি পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি শিল্প খাত ও বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব ফেলবে।

দেশে মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৩ শতাংশই ডিজেল। তাই এর দাম বাড়ার প্রভাব গণপরিবহন এবং কৃষি খাতেই বেশি পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি শিল্প খাত ও বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব ফেলবে।

মূল্যস্ফীতি বাড়বে: কমবে সঞ্চয়ের সক্ষমতা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। ফলে খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের দ্রব্যের দাম বাড়বে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষি খাতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। সেচ, পরিবহন ও কৃষি উপকরণের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতেই ভীষণ কষ্ট হচ্ছে মানুষের। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলেন, যখন সবকিছুর দাম একসঙ্গে বাড়ে তখন টাকার মান বা ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। সাধারণ মানুষের আয়ের বড় অংশই খাবার আর যাতায়াত খরচে চলে যায়। এর ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

মুদ্রাস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস

মুদ্রাস্ফীতি বলতে সাধারণত অর্থের বিনিময়ে পণ্য বা সেবা কেনার ক্ষমতা কমে যাওয়াকে বোঝায়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এটি মুদ্রাস্ফীতিকে দুইভাবে প্রভাবিত করে। এর মধ্যে একটি টাকার মানের অবমূল্যায়ন ও অপরটি হচ্ছে ভোক্তা পর্যায়ে চাপ।

টাকার মানের অবমূল্যায়ন

জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রা (ডলার) ব্যয় করতে হয়। এর ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে মুদ্রার সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এতে পরোক্ষভাবে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে।

ভোক্তা পর্যায়ে চাপ

অর্থনীতির ভাষায় এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে মানুষের আয় স্থির থাকলেও সবকিছুর দাম বাড়তে থাকে, তখন তার প্রকৃত আয় কমে যায়। অর্থাৎ একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আগের চেয়ে কম পণ্য কেনা যায়।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে প্রভাব

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায়ই নীতি সুদহার বাড়িয়ে দেয়। এতে ঋণের সুদ হার খরচ বেড়ে যায় এবং বাজারে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানিকারক দেশ হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে।

পরিবহন খাত: খরচ বেড়ে যাওয়ায় নৈরাজ্য সৃষ্টির শঙ্কা

তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। বাস, ট্রাক, লঞ্চ ও পণ্যবাহী যানের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাত দিয়ে অনেক সময় সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও বেশি টাকা আদায় করেন পরিবহন শ্রমিকেরা।

নিত্যপণ্যের বাজারে ঊধ্বগতি

পরিবহন খরচ বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে পাইকারি ও খুচরা বাজারে। ট্রাক ভাড়া বাড়লে চাল, ডাল, সবজি ও মাছের সরবরাহ ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে প্রতিটি পণ্যের দাম ২-১০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

কৃষিখাত: বিপাকে কৃষক ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প

বাংলাদেশে কৃষিকাজ অনেকাংশেই সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল, যার বড় অংশ চলে ডিজেলে। এতে ডিজেলের দাম বাড়লে সেচ খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার ব্যবহারের খরচ বাড়ায় ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনের সামগ্রিক খরচ বেড়ে যায়। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষিকাজে উৎসাহ হারাতে পারে।

জ্বালানির দাম বাড়ায় বড় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিপাকে পড়বে। চিপস, বিস্কুট বা দুগ্ধজাত পণ্য পরিবহনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভ্যান ব্যবহারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাপর্যায়ে এসব পণ্যের দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।

শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি

কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করা হয়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এতে দেশীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা হারায় এবং স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়।

পোশাক শিল্প: বিশ্ববাজারে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাক খাত এখন ত্রিমুখী চাপে। লোডশেডিংয়ের সময় কারখানা সচল রাখতে প্রচুর ডিজেল পোড়াতে হয়। তেলের দাম বাড়ায় পোশাকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাক খাত এখন ত্রিমুখী চাপে। লোডশেডিংয়ের সময় কারখানা সচল রাখতে প্রচুর ডিজেল পোড়াতে হয়। তেলের দাম বাড়ায় পোশাকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আবার বন্দর থেকে কারখানায় কাপড় উৎপাদনের কাঁচামাল তুলা আনা এবং কারখানা থেকে তৈরি পোশাক বন্দরে পাঠানোর পিকআপ ভ্যানের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা কমে যাচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু সিটিজেন জার্নালকে বলেন, মার্কিন পাল্টা শুল্ক, শুল্কের প্রভাবে প্রতিযোগী দেশগুলোর আগ্রাসী বাণিজ্য নীতি এবং দেশে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জাতীয় নির্বাচন ঘিরে পোশাক খাতে আগেই বড় ধরনের অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ সমস্যা মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে ক্রমাগত রপ্তানি কমছে।

বিজিএমইএ সভাপতি আরও বলেন, এই মুহূর্তে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মানে হলো প্রতিযোগী দেশগুলোর (ভিয়েতনাম বা ভারত) তুলনায় পিছিয়ে পড়া। তবে বিগত সময়ে প্রতিমাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হতো। তাই নিয়মিতভাবে সমন্বয় করার বিষয়ে সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও তা নির্ধারণ করতে হবে।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমার উৎপাদন খরচ বাড়লেও আয় বাড়ছে না। এতে ব্যাংকে শর্টফল (দায় পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকা) তৈরি হচ্ছে। এতে একটা সময় পরে আমি খেলাপিদের তালিকায় পড়ে যাবো। আমার প্রতিষ্ঠান বন্ধের উপক্রম হবে। কর্মীরা বেকার হবে।’

সিরামিক শিল্প: উৎপাদন খরচে নাভিশ্বাস

সিরামিক একটি জ্বালানি-নিবিড় শিল্প। টাইলস বা স্যানিটারি পণ্য তৈরির জন্য উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। গ্যাসের সংকটের কারণে অনেক কারখানা বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল বা ডিজেল ব্যবহার করে। জ্বালানির দাম বাড়ায় এই খাতের উৎপাদন খরচ ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা স্থানীয় বাজারে সিরামিক পণ্যের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।

জাহাজ নির্মাণ ও শিপিং খাত: বড় বিনিয়োগে বড় ধাক্কা

দেশের উদীয়মান জাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যবস্থা তেলের দাম বাড়ার ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ নদীপথের ওপর নির্ভরশীল। তেলের দাম বাড়ায় কার্গো জাহাজের ভাড়া বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। জাহাজ তৈরির ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনায় যে পরিমাণ জ্বালানি লাগে, তার বাড়তি ব্যয় প্রকল্পের মোট বাজেটকে ওলটপালট করে দিচ্ছে।

সিমেন্ট ও ইস্পাত শিল্প: আবাসন খাতে স্থবিরতা

আবাসন শিল্পের প্রধান কাঁচামাল সিমেন্ট ও রড তৈরিতে প্রচুর জ্বালানি প্রয়োজন।

কাঁচামাল আনা-নেওয়া এবং কারখানার চুল্লি সচল রাখার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় রড ও সিমেন্টের প্রতিটি ব্যাগের দাম বাড়বে। এতে ভবন বা ফ্ল্যাট নির্মাণ এবং বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে।

অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মত

জ্বালানির দাম বাড়ানোর বিষয়টি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করে। যদি বাজার মনিটরিং শক্তিশালী না হয়, তবে অসাধু ব্যবসায়ীরা জ্বালানির দোহাই দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। কারণ আমাদের রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি ভালো না। কিন্তু এর একটি মূল্য তো দিতেই হবে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিকে অর্থনীতির ওপর নানাভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যারা সরাসরি ক্রয় করছে সেসব ভোক্তাকে এর মূল্য বেশি দিতে হবে। সার্বিকভাবে বিষয়টি ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্যানুসারে, বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার টন ডিজেল মজুত আছে। সমুদ্র পথে জাহাজে থাকা ১ লাখ টনের বেশি ডিজেল যুক্ত হবে। এ ছাড়া পেট্রোল ও অকটেনের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। আজ থেকে ডিজেলের দৈনিক সরবরাহ ১১ হাজার ১০৭ টন থেকে বাড়িয়ে ১৩ হাজার ৪৮ টন এবং অকটেনের সরবরাহ ১ হাজার ১২৯ টন থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২৩৭ টন করার কথা রয়েছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি যেন একটি ‘ডোমিনো ইফেক্ট’ বহুমুখী সংকট সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ একটি খাতের খরচ বাড়লে তা অন্য সব খাতকে টেনে ধরছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পোশাক ও জাহাজ নির্মাণের মতো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতগুলো যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। এ ছাড়া সরকার যদি পরিবহন ও কৃষিখাতে ভর্তুকি বা বিশেষ তদারকি নিশ্চিত না করে, তবে এই নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়বে। অর্থাৎ সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা ও শিল্পবান্ধব নীতি প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।

/বিবি/