শিরোনাম

দেশের বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিতে মানুষ-প্রকৃতির সহাবাস্থান

সিটিজেন ডেস্ক
দেশের বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিতে মানুষ-প্রকৃতির সহাবাস্থান
ওয়ালটনের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন বাংলাদেশের প্রথম নারী সাপ উদ্ধারকর্মী সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

রবিবার সকাল ঠিক দশটা। ওয়াল্টন হাই–টেক ইন্ডাস্ট্রিজের প্রশিক্ষণকক্ষে সারি সারি চেয়ারে বসে আছেন কারখানার কর্মকর্তা–কর্মচারী, নিরাপত্তাকর্মী আর বন্যপ্রাণি উদ্ধারকাজে যুক্ত কর্মীরা। বাইরে কারখানার স্বাভাবিক ব্যস্ততা, ভেতরে যন্ত্রপাতি আর রঙের গন্ধ। এমন এক পরিবেশে আলোচনার বিষয় সাপ।

কোনো সাপ যদি কারখানা এলাকার কোনো ভবনে ঢুকে পড়ে, তখন কীভাবে আতঙ্ক না ছড়িয়ে, কাউকে ঝুঁকিতে না ফেলে, আবার প্রাণিটিকেও আঘাত না করে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া যায়–সেটিই শেখানো হচ্ছে এই প্রশিক্ষণে। সামনে কথা বলছেন বাংলাদেশের প্রথম নারী সাপ উদ্ধারকর্মী, ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া। তার কথা মন দিয়ে শুনছেন সবাই। কেউ নিরাপত্তা শাখার, কেউ প্রকৌশলী, কেউ আবার সরাসরি বন্যপ্রাণি উদ্ধারকাজের সঙ্গে যুক্ত। তাদের আগ্রহ এক জায়গায়–কীভাবে বন্যপ্রাণির সঙ্গে সংঘাত না করে সহাবস্থান নিশ্চিত করা যায়।

প্রথম দেখায় দৃশ্যটি বেমানান মনে হতে পারে। শিল্পকারখানার প্রশিক্ষণকক্ষে উৎপাদন, যন্ত্রপাতি বা কর্মদক্ষতা নিয়ে নয়, আলোচনা হচ্ছে সাপ, পাখি, জলাশয় আর বন্যপ্রাণি নিয়ে। কিন্তু ওয়াল্টনের বিস্তৃত এই প্রাঙ্গণে এমন আলোচনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এখানে কারখানার সীমানা শুধু কংক্রিটে থেমে নেই, তার ভেতরে আছে গাছ, ফাঁকা জমি, ঝোপঝাড়, জলাশয়, আর সেই সঙ্গে রয়েছে নানা প্রজাতির প্রাণির বিচরণ।

ওয়াল্টনের এনভায়রনমেন্ট, হেলথ অ্যান্ড সেফটি (ইএইচএস) বিভাগটিও কাজ করছে এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই। কর্মীদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ককে আলাদা করে না দেখে, একসঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বন্যপ্রাণি উদ্ধার ও অবমুক্তকরণ নিয়ে এই কর্মশালাটিও সেই ভাবনারই অংশ। অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া এবং ফয়সাল আহমেদ।

ওয়াল্টনের ইএইচএস ডিপার্টমেন্ট হেড মোস্তাফিজুর রহমান রাজু বলেন, ‘আমাদের কারখানা ৮শত একর জায়গা নিয়ে। এখানে অনেক বন্যপ্রাণির বাস। আমাদের একটা বিশেষায়িত টিম শুধুমাত্র প্রাণি উদ্ধার এবং সেফলি অবমুক্ত করার কাজ করে। আমাদের এই টিমে প্রায় ৫০ জন কর্মী কাজ করেন, যা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সচরাচর দেখা যায় না।’

ওয়ালটনের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
ওয়ালটনের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

এই একটি বক্তব্যেই যেন পুরো উদ্যোগের চরিত্র ধরা পড়ে। কারণ দেশে সাপ বা অন্য বন্যপ্রাণি দেখা গেলেই আতঙ্ক তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। অনেক ক্ষেত্রেই সেই আতঙ্ক গিয়ে ঠেকে প্রাণি হত্যায়। কিন্তু এখানে চেষ্টা হচ্ছে–ঝুঁকি মেনে নিয়েও অকারণ ক্ষতি না করে, উদ্ধার ও অবমুক্তির মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার।

প্রশিক্ষণে বাংলাদেশের বহুল পরিচিত নির্বিষ ও বিষধর সাপ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। জোর দেওয়া হয় আতঙ্ক নয়, সচেতনতার ওপর; আঘাত নয়, নিরাপদ ব্যবস্থাপনার ওপর। কীভাবে না মেরে একটি সাপকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া যায়, কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে মানুষ ও প্রাণি–দু’পক্ষকেই নিরাপদ রাখা যায়, সেই বিষয়ে। অনুষ্ঠান শেষে ওয়াল্টনে উদ্ধার করা একটি হলদে পা হরিয়াল এবং একটি দাঁড়াশ সাপ অবমুক্ত করা হয় কারখানার নির্জন এলাকায়। ঘটনাটি ছোট, কিন্তু এর তাৎপর্য এদেশের প্রক্ষাপটে বিশাল গুরুত্ব বহন করে।

সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া বলেন, ‘ওয়াল্টন বন্যপ্রাণি, পরিবেশ এবং কর্মীদের স্বাস্থ্য রক্ষায় ভীষণ জোর দেয়। আমাদের দেশের ইন্ডাস্ট্রিতে এটা একটা অনুসরণীয় উদ্যোগ। কোনো বন্যপ্রাণি বিপদগ্রস্ত হলে তারা স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তা নেয়, আবার নিজেদের মাধ্যমেও এদের রক্ষা করে। এরকম উদ্যোগ যদি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও নিত, তাহলে দেশের বন্যপ্রাণিরা আরও ভালো থাকত।’

ওয়াল্টনের এই প্রাঙ্গণে বহুদিন ধরে কাজ করতে গিয়ে তাদের দল যে অভিজ্ঞতা পেয়েছে, সেটিও কম বিস্ময়কর নয়। সৈয়দা অনন্যা ফারিয়ার ভাষায়, ‘আমরা এখানে বহু দিন ধরে কাজ করছি। কাজ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত ২৮ প্রজাতির পাখি, ১২ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর এবং ৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণি দেখতে পেয়েছি। সাভারের মতো এরকম জনবহুল জায়গায় প্রাণিদের জন্য এমন নিবাস গড়ে উঠেছে, এটা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো।’

এই বিস্তৃত এলাকায় গন্ধগোকুল, বেজি, হরিয়াল, ঘুঘু, ফিঙে, শেয়াল, লাউডগা, ঢোরা, এমনকি গোখরার মতো প্রাণিরও দেখা মেলে। দেশীয় ফলের গাছ, জলাশয়, ঝোপঝাড় আর অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি কিছু অংশ মিলে এখানে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে মানুষের পাশাপাশি প্রাণিরাও নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকার জায়গা খুঁজে নিয়েছে। শিল্পপ্রাঙ্গণ বলেই এখানে সবুজের অস্তিত্ব মুছে যায়নি; বরং সেই সবুজের ভেতরেই উৎপাদন আর প্রকৃতির সচেতন সহাবস্থান গড়ে উঠেছে।

ওয়াল্টনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যেহেতু এখানে বিষধর সাপ আছে, এজন্য আমরা সব সময় এ ব্যাপারে সতর্ক থাকি যেন আমাদের কোনো কর্মীর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি না হয়। আবার কোনো বন্যপ্রাণিই যেন অকারণে হত্যার শিকার না হয়, সেজন্যই আমাদের বিশেষায়িত টিম প্রতিনিয়ত কাজ করে।’

কথা বলছেন ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
কথা বলছেন ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

এই প্রাঙ্গণে সারা বছরই ঘুরে বেড়ায় নানা ধরনের বন্যপ্রাণি। শীতকালে এখানকার জলাশয়গুলো আবার পরিযায়ী পাখিতে মুখর হয়ে ওঠে। সরালি, বালি হাঁসের ঝাঁক নামে নিশ্চিন্তে। জলকেলি করে আপন মনে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিসরে এমন দৃশ্য কল্পনায় ধরা কঠিন, কিন্তু এখানকার কর্মীদের কাছে তা নতুন কিছু নয়। বরং এই উপস্থিতিগুলোই তাদের শিখিয়েছে–প্রকৃতিকে পুরোপুরি সরিয়ে রেখে শিল্প টিকে থাকে না; বরং সমঝোতার জায়গা খুঁজে নিতে হয়।

শুধু বন্যপ্রাণি নয়, কমিউনিটি প্রাণিদের সঙ্গেও এখানে তৈরি হয়েছে আলাদা এক সম্পর্ক। কুকুর ও বিড়ালদের সঙ্গে কর্মীদের এক ধরনের নীরব সহাবস্থান গড়ে উঠেছে। কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে এদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়। গত এক বছর ধরে এখানকার কুকুরদের নিয়ে কাজ করছেন স্বেচ্ছাসেবী ফয়সাল। গল্প করতে করতে তিনি বলেন, ‘এখানকার কুকুর-বিড়ালরা বেশ অদ্ভুত। তারা কখনো মানুষের কাছে আসে না, আবার ভয়ও পায় না। তারা আদর বা আঘাত–কোনোটার সঙ্গেই অভ্যস্ত নয়। তাই তারা নিরাপদ দূরত্ব রেখে নির্দ্বিধায় ঘুরে বেড়ায়।’

সবুজ অবকাঠামোর দিক থেকেও এই প্রাঙ্গণটি আলাদা করে চোখে পড়ে। ইএইচএস সেক্টরের এক কর্মকর্তা মেহেদি হাসান জানান, ‘আমরা এখানে কয়েকশ প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ করেছি, যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেশীয় প্রজাতির গাছ। এর অনেকগুলোই বন্যপ্রাণির খাবারের জন্য নির্ধারিত রাখা হয়েছে।’

পানি ব্যবস্থাপনাতেও পরিবেশের কথা ভাবা হয়েছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে প্রতিদিন পানি আসে, যা এখানকার গাছপালায় সরবরাহ করা হয়। পানি পরিশোধনের এই ব্যবস্থাকে তারা পরিবেশ সংরক্ষণের অংশ হিসেবেই দেখছে। অন্যদিকে এখানে ফ্লোটিং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও রয়েছে, যা শিল্পাঙ্গনের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার ভাবনাকেও সামনে আনে। অর্থাৎ প্রাণি রক্ষা, গাছ লাগানো বা জলাশয় রক্ষা–এসব এখানে বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়; বরং একটি বৃহত্তর পরিবেশ ভাবনার অংশ।

এখানে ঝুঁকি আছে, মানুষ-প্রাণি সংঘাতের আশঙ্কাও রয়েছে। এই বাস্তবতায় যদি একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ, উদ্ধার, টিকা, বৃক্ষরোপণ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সমান্তরালভাবে দেখতে চায়, তবে সেটি অবশ্যই আলাদা মনোযোগের দাবি রাখে।

রবিবার (১৯ এপ্রিল) সকালের সেই প্রশিক্ষণকক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কেউ হয়তো খুব বীরত্বপূর্ণ কিছু শেখেননি। কেউ সাপ ধরার রোমাঞ্চ নিয়েও ফেরেননি। কিন্তু তারা অন্তত এটুকু বুঝেছেন–প্রাণিকে দেখলেই ভয়ে মেরে ফেলতে হয় না। কখনও কখনও সামান্য জ্ঞান, সতর্কতা, প্রস্তুতি আর সংযমই যথেষ্ট। উন্নয়নের ম্যারাথনে প্রকৃতিকে বিসর্জন দেয়া যখন এদেশের খুব সাধারণ চিত্র তখন সহাবস্থানের এই চর্চা আমাদেরকে নতুন করে আশাবাদী করে বৈকি!

/.এমআর/