শিরোনাম

এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করেছে কাতার, বিশ্ববাজারে প্রভাব

সিটিজেন ডেস্ক
এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করেছে কাতার, বিশ্ববাজারে প্রভাব
ড্রোন হামলার পর এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করেছে কাতার এনার্জি। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের ড্রোন হামলার পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে কাতার এনার্জি। এতে বৈশ্বিক গ্যাস বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হতে পারে।

সোমবার (২ মার্চ) ইরানের দুটি ড্রোন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানে বলে জানিয়েছে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মেসাইয়েদ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির ট্যাংক এবং রাস লাফানে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদক কাতার এনার্জির জ্বালানি স্থাপনায় এই হামলা হয়েছে।

এই হামলায় কেউ হতাহত না হলেও নিরাপত্তার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে এলএনজি ও অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন স্থগিত করেছে কাতার এনার্জি।

ড্রোন হামলায় কাতার এনার্জির রাস লাফান কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতার এনার্জি যে জ্বালানি রপ্তানি করে, সেই এলএনজি প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট এই কমপ্লেক্সে অবস্থিত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে রয়টার্স ও ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিটি ‘ফোর্স মাজ্যুর’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। ‘ফোর্স মাজ্যুর’ হলো এমন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি, যে পরিস্থিতিতে কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ করতে না পারলেও তাদের দায়ী করা যাবে না। কেননা, এই ঘটনা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

কাতার এনার্জির এই সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা আরও বড় হুমকির মুখে পড়বে। ইতিমধ্যেই যুদ্ধের কারণে বাণিজ্যপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে।

তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, প্রণালিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তেলবাহী জাহাজের চলাচল ৮৬ শতাংশ কমে গেছে। উভয় প্রান্তে প্রায় ৭০০টি জাহাজ আটকে রয়েছে।

এদিকে ‘এলএনজি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্তের পর কাতার এনার্জি কাতারে কিছু উপজাত পণ্যের উৎপাদনও বন্ধ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউরিয়া, পলিমার, মিথানল, অ্যালুমিনিয়াম ও অন্যান্য পণ্য।’ সামাজিকমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানিয়েছে কোম্পানিটি।

এ সপ্তাহের শুরুতে দক্ষিণ কাতারের দুটি স্থাপনা হামলার শিকার হওয়ার পর এ ঘোষণা এল।

বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে প্রভাব

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে কাতার অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। তারা বৈশ্বিক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করে। এই পরিস্থিতিতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ গবেষক র‍্যাচেল জিয়েম্বা বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপের কারণে যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে এশিয়ার বাজারে– বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে।’

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) বলছে, এ বছর ১১৫টি কার্গো (জাহাজ) এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে ৪০টি ও ওমান থেকে ১৬টি কার্গো আসার কথা।

আল জাজিরার সংবাদে বলা হয়েছে, চীন বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিকারক হলেও তাদের আমদানির বড় অংশ আসে অস্ট্রেলিয়া থেকে। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চীনের প্রায় ৩৪ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস আসে অস্ট্রেলিয়া থেকে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ফুয়েলস অব দ্য ফিউচারের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম্যাকসিম সোনিন বলেন, কাতার এনার্জির সিদ্ধান্ত জ্বালানি বাজারে ‘অস্থিরতা’ তৈরি করবে। তবে ‘সংকট’ তৈরি হয়ে গেছে, সে কথা এখনই বলা যাবে না।

সোনিন আল জাজিরাকে বলেন, ‘কাতার বা অন্যান্য জ্বালানিকেন্দ্রে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে এলএনজি বাজারে স্বল্প মেয়াদে অস্থিরতা তৈরি হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপে ২০২২ সালের গ্যাস সংকটের পুনরাবৃত্তি হবে বলে আমি মনে করি না।’ অর্থাৎ রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপের রুশ তেল-গ্যাস নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টার সময় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তিনি সেই সংকটের কথা স্মরণ করছেন।

কাতার এনার্জির উৎপাদিত এলএনজির ৮২ শতাংশ এশিয়ার বাজারে বিক্রি হলেও তাদের উৎপাদন বন্ধ থাকায় ইউরোপসহ অন্যান্য বাজারেও চাপ তৈরি হবে। বাস্তবে কম সরবরাহ দিয়ে একই বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে হবে। ফলে দাম ইতিমধ্যে বেড়েছে। কাতার এনার্জির ঘোষণার পর সোমবার (২ মার্চ) ডাচ ও ব্রিটিশ পাইকারি গ্যাসের ভিত্তিমূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এশিয়ায় এলএনজির ভিত্তিমূল্য বেড়েছে প্রায় ৩৯ শতাংশ।

এদিকে সোমবার রয়টার্সকে ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব মূল্যায়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যাস সমন্বয় গ্রুপ আগামীকাল বুধবার বৈঠকে বসবে।

সূত্র: আল জাজিরা

/জেএইচ/