৪ প্রকৌশলীর দায়ে শিশু পার্ক বঞ্চিত নগরবাসী

৪ প্রকৌশলীর দায়ে শিশু পার্ক বঞ্চিত নগরবাসী
আয়নাল হোসেন

২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে হঠাৎ একদিন শাহবাগের শিশু পার্কের সামনে একটি নোটিশ টানানো হয়। সেই নোটিশে জানানো হয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় শিশুপার্কের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজের জন্য কেন্দ্রীয় শিশুপার্কটি বন্ধ থাকবে। কিন্তু শিশু পার্কটি সেই যে বন্ধ হলো, এখন পর্যন্ত আর খোলেনি। শেষ হয়নি আধুনিকায়নের কাজ। অনুসন্ধানে জানা যায় অর্ধ যুগের বেশি সময়েও শিশু পার্কের আধুনিকায়নের কাজ শেষ না হওয়ার দায় মূলত প্রকল্প পরিচালক আনিছুর রহমান, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মাহবুব আলম, অঞ্চল ১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) সাইফুল ইসলাম জয় ও সহকারী প্রকৌশলী–১ মুবতাসিম ফুয়াদ বেগ। এই ৪ প্রকৌশলীর সিন্ডিকেট গত ৭ বছরের বেশি সময় ধরে প্রকল্পের কাটছাট, ব্যয়বৃদ্ধি, কেনাকাটাসহ সবকিছুই করেছে ইচ্ছামাফিক।
১৭ মে ও ১৮ মে পরপর দুই দিন শাহবাগ শিশু পার্কে গিয়ে দেখা যায় ভেতরে কয়েকটি নির্মাণাধীন ভবন পড়ে আছে। মাটির নিচে যে পার্কিং করা হচ্ছে, কাঁচঘেরা একটি ঘরের মধ্যে সেই গাড়ি পার্কিংয়ের প্রবেশ পথ। যেটা ঢেকে রাখা হয়েছে টিন দিয়ে।
মাটির উপরিভাগে কোনো কাজই সেভাবে দৃশ্যমান নয়। নেই রাস্তাঘাটও। শ্রমিকদের বসার জন্য ইট–বালু দিয়ে তৈরি কয়েকটি বেঞ্চ দেখা যায়। পার্কের পশ্চিম–দক্ষিণ পাশে প্রশাসনিক ভবন তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এটি চালু হতে আরও বছর খানেক সময় লাগবে বলে জানান সেখানে উপস্থিত ঠিকাদারের লোকজন। ১৮ মে দুপুরে গিয়ে দেখা যায় পার্ক লাগোয়া পূবালী ব্যাংকের শাখায় পুরোদমে অফিস চলছে। ব্যাংকের এই ভবনটি শিগগিরই ভেঙে দক্ষিণ পাশে নতুন একটি ভবনে স্থানান্তর করা হবে।
পার্কের জন্য নির্ধারিত এলাকাটি পুরো অরক্ষিত। সেখানে অনায়েসেই লোকজন ঢুকতে পারছে। আশপাশের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, রাতের বেলায় এখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। আনাগোনা বাড়ে ভাসমান যৌনকর্মীদের। প্রায় সাড়ে সাত বছর আগে আধুনিকায়নের কাজ শুরু হলেও সংশ্লিষ্টদের ধারণা পার্কটি চালু করতে আরও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে।
প্রকল্পের কাজ ২০২৪ সালে শুরু হয়ে ২০২৬ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দাপ্তরিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় চলতি বছরও এটির কাজ শেষ হচ্ছে না। সময় বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে সিটিজেন জার্নাল থেকে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আনিছুর রহমান প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
দীর্ঘদিন ধরে আনিছুর রহমান শাহবাগের শিশু পার্কটি দেখভালের দায়িত্বে আছেন। আর এখন তো তিনি পার্কটি সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের পরিচালক। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, স্বাভাবিকভাবেই এত বছরেও কাজ শেষ না হওয়ার দায় তাকে নিতে হবে।

এত বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ না করতে পারার পেছনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তাদের নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত, উদাসীনতা এবং দুর্নীতির সিন্ডিকেটের দায় আছে। দুর্নীতির সিন্ডিকেটটা মূলত প্রকল্প পরিচালক আনিছুর রহমান, ডিএসসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মাহবুব আলম, অঞ্চল ১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) সাইফুল ইসলাম জয় ও সহকারী প্রকৌশলী–১ মুবতাসিম ফুয়াদ বেগের সমন্বয়ে গড়া।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল–১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে অবশ্য বলেন, ‘আমরা পুর কাজ করবো। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে। তবে রাইডগুলো এখনও কেনা হয়নি। রাইডগুলো যেখানে স্থাপন করা হবে, সেখানে তাদের কাজ রয়েছে। ভারি যন্ত্রপাতি প্রবেশ করানো হবে। এ কারণে নির্মাণ কাজ আংশিক করা হয়েছে।’
নির্মাণ কাজ সময়মতো শেষ না হওয়ার আরও কিছু কারণ তুলে ধরে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা মহানগর পুলিশের ডাম্পিং স্টেশনের জন্য ৩ দশমিক ৮১ একর জমি রয়েছে। তাদের সরাতে সময় লেগেছে। এ ছাড়া শাহবাগ থানাটি স্থানান্তরের কথা ছিল। কিন্তু থানাটি সেখানেই থাকায় তাদের ৩৩ শতাংশ জমি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণ প্যারালালভাবে চলছে। অপর দিকে ফুল মার্কেট সরাতে পারেনি। অন্তবর্তীকালীন সরকার তাদের সরানোর উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমানে তাদের সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের পুনর্বাসনের চিন্তা করা হচ্ছে। পার্কের জমিতে বড় বড় গাছ থাকায় সেগুলো কাটতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। রাইডের জন্য সম্প্রতি দরপত্র আহবান করা হয়েছে। এগুলো এলে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে।’
কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায় রাইড কেনায় দুর্নীতির কারণেও পার্কের নির্মাণ কাজ পিছিয়ে পড়েছে। আনিছুর রহমানের সিন্ডিকেট পার্কের জন্য প্রস্তাবিত রাইড কেনায় অবিশ্বাস্য অতি-মূল্যায়ন করে। এ ছাড়া দরপত্র প্রক্রিয়ায়ও ছিল না কোনো স্বচ্ছতা। প্রকল্প পরিচালক আনিছুর রহমান আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মূল্যে ১৫টি রাইড আমদানির বিতর্কিত ফাইল প্রস্তুত করেন। ২০২৪ সালের মে মাসে কাজ শুরুর পরপরই তার দপ্তরের এই টেন্ডার কেলেঙ্কারি ফাঁস হলে কেনাকাটা ও এলসি খোলার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আটকে যায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ঢিলেঢালা কাজের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার দায়ও তার ওপর বর্তায়।
এই প্রকল্পের বেশির ভাগ ব্যয় (৪৪১ কোটি টাকা) ধরা হয় শিশুপার্কের জন্য ১৫টি রাইড কেনা ও স্থাপনে। এসব রাইডের দাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেসরকারি খাতে বিনোদনকেন্দ্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্তরা বলছেন, রাইডের যে দর দেখানো হয়েছে, তা অবিশ্বাস্য।
একসঙ্গে ৩০ জন চড়তে পারে এমন একটি রাইড ‘মাইন ট্রেন’ (মাইন কোস্টার নামেও পরিচিত) কেনা ও স্থাপন করার জন্য ৯৭ কোটি টাকা খরচ করার কথা প্রকল্পে উল্লেখ করেছে ডিএসসিসি। এই রাইডের জন্য প্রকল্পে যে ধরনের বৈশিষ্ট্য ও মানের কথা বলা হয়েছে, তাতে এর দাম কোনোভাবেই ৫ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
প্রকল্পে ‘১২ডি থিয়েটার’ স্থাপন করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮১ কোটি টাকা। এই থিয়েটারের ভেতরে একসঙ্গে ৩৬ জন মানুষ বসতে পারবে। এ ধরনের একটি থিয়েটার নির্মাণ করতে সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অনেকে বলেছেন জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব যন্ত্র আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য দাম বেশি পড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে একই আকৃতির থিয়েটার কেউ যদি ইউরোপের মানের নির্মাণ করতে চান, তাহলেও সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা খরচ হবে। ২০২৪ সালের মে মাসে কাজ শুরুর পরপরই রাইডগুলোর প্রস্তাবিত দাম নিয়ে মারাত্মক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ফলে কেনাকাটার প্রক্রিয়া থমকে যায়।
শিশু পার্কটি এখনো চালু না হওয়ার বিষয়ে এসওএস চিলড্রেন'স ভিলেজেস বাংলাদেশের উপ-পরিচালক (তহবিল উন্নয়ন ও যোগাযোগ) রাশাল মিয়া সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা শিশুপার্ক বন্ধ থাকায় রাজধানীর শিশুরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন ও বিকাশের স্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থ বিকাশে এমন উন্মুক্ত ও নিরাপদ বিনোদনকেন্দ্র অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক জাভেদ জাহান বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চরম অব্যবস্থাপনা, অদূরদর্শীতা, রাজনৈতিক রেশারেশি ও নজরদারির অভাবে জাতীয় এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রয়েছে। আর এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সুযোগ নিচ্ছে।
পার্কটির আধুনিকায়নের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (৩য় পর্যায়)’ প্রকল্প থেকে ডিএসসিসিকে ২৬৫ কোটি ৭৮ লাখ বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই টাকা যথেষ্ট মনে করেনি ডিএসসিসি। পরে ডিএসসিসি নতুন বাজেটে প্রকল্প তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠালে তা প্রক্রিয়া অনুযায়ী ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রকল্প পাস হয়।
দুই বছর মেয়াদের কাজকে বারবার পেছানোর পরও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক ও তদারককারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। মাঠপর্যায়ে কাজের তদারকি না থাকায় প্রকল্প এলাকায় জলাবদ্ধতা ও আবর্জনার স্তূপ জমে পার্কটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
পার্কের এমন অবস্থা এবং সংস্কার কাজ শেষ হতে আর কত সময় লাগবে– এমন প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘পার্কের জন্য ১৫টি রাইড কেনার জন্য আগে দরপত্র হয়েছিল। সেখানে দুটি কোটেশনের স্পেসিফিকেশন নিয়ে সমস্যা ছিল। বর্তমানে ডিপিপির ভেটিং কমিটির মাধ্যমে ১৫টি রাইড কেনার জন্য দরপত্র দেওয়া হবে।’ এগুলো কেনা সম্ভব হলে আগামি ছয় মাসের মধ্যে পার্কটি চালু করা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে হঠাৎ একদিন শাহবাগের শিশু পার্কের সামনে একটি নোটিশ টানানো হয়। সেই নোটিশে জানানো হয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় শিশুপার্কের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজের জন্য কেন্দ্রীয় শিশুপার্কটি বন্ধ থাকবে। কিন্তু শিশু পার্কটি সেই যে বন্ধ হলো, এখন পর্যন্ত আর খোলেনি। শেষ হয়নি আধুনিকায়নের কাজ। অনুসন্ধানে জানা যায় অর্ধ যুগের বেশি সময়েও শিশু পার্কের আধুনিকায়নের কাজ শেষ না হওয়ার দায় মূলত প্রকল্প পরিচালক আনিছুর রহমান, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মাহবুব আলম, অঞ্চল ১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) সাইফুল ইসলাম জয় ও সহকারী প্রকৌশলী–১ মুবতাসিম ফুয়াদ বেগ। এই ৪ প্রকৌশলীর সিন্ডিকেট গত ৭ বছরের বেশি সময় ধরে প্রকল্পের কাটছাট, ব্যয়বৃদ্ধি, কেনাকাটাসহ সবকিছুই করেছে ইচ্ছামাফিক।
১৭ মে ও ১৮ মে পরপর দুই দিন শাহবাগ শিশু পার্কে গিয়ে দেখা যায় ভেতরে কয়েকটি নির্মাণাধীন ভবন পড়ে আছে। মাটির নিচে যে পার্কিং করা হচ্ছে, কাঁচঘেরা একটি ঘরের মধ্যে সেই গাড়ি পার্কিংয়ের প্রবেশ পথ। যেটা ঢেকে রাখা হয়েছে টিন দিয়ে।
মাটির উপরিভাগে কোনো কাজই সেভাবে দৃশ্যমান নয়। নেই রাস্তাঘাটও। শ্রমিকদের বসার জন্য ইট–বালু দিয়ে তৈরি কয়েকটি বেঞ্চ দেখা যায়। পার্কের পশ্চিম–দক্ষিণ পাশে প্রশাসনিক ভবন তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এটি চালু হতে আরও বছর খানেক সময় লাগবে বলে জানান সেখানে উপস্থিত ঠিকাদারের লোকজন। ১৮ মে দুপুরে গিয়ে দেখা যায় পার্ক লাগোয়া পূবালী ব্যাংকের শাখায় পুরোদমে অফিস চলছে। ব্যাংকের এই ভবনটি শিগগিরই ভেঙে দক্ষিণ পাশে নতুন একটি ভবনে স্থানান্তর করা হবে।
পার্কের জন্য নির্ধারিত এলাকাটি পুরো অরক্ষিত। সেখানে অনায়েসেই লোকজন ঢুকতে পারছে। আশপাশের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, রাতের বেলায় এখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। আনাগোনা বাড়ে ভাসমান যৌনকর্মীদের। প্রায় সাড়ে সাত বছর আগে আধুনিকায়নের কাজ শুরু হলেও সংশ্লিষ্টদের ধারণা পার্কটি চালু করতে আরও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে।
প্রকল্পের কাজ ২০২৪ সালে শুরু হয়ে ২০২৬ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দাপ্তরিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় চলতি বছরও এটির কাজ শেষ হচ্ছে না। সময় বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে সিটিজেন জার্নাল থেকে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আনিছুর রহমান প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
দীর্ঘদিন ধরে আনিছুর রহমান শাহবাগের শিশু পার্কটি দেখভালের দায়িত্বে আছেন। আর এখন তো তিনি পার্কটি সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের পরিচালক। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, স্বাভাবিকভাবেই এত বছরেও কাজ শেষ না হওয়ার দায় তাকে নিতে হবে।

এত বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ না করতে পারার পেছনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তাদের নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত, উদাসীনতা এবং দুর্নীতির সিন্ডিকেটের দায় আছে। দুর্নীতির সিন্ডিকেটটা মূলত প্রকল্প পরিচালক আনিছুর রহমান, ডিএসসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মাহবুব আলম, অঞ্চল ১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) সাইফুল ইসলাম জয় ও সহকারী প্রকৌশলী–১ মুবতাসিম ফুয়াদ বেগের সমন্বয়ে গড়া।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল–১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে অবশ্য বলেন, ‘আমরা পুর কাজ করবো। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে। তবে রাইডগুলো এখনও কেনা হয়নি। রাইডগুলো যেখানে স্থাপন করা হবে, সেখানে তাদের কাজ রয়েছে। ভারি যন্ত্রপাতি প্রবেশ করানো হবে। এ কারণে নির্মাণ কাজ আংশিক করা হয়েছে।’
নির্মাণ কাজ সময়মতো শেষ না হওয়ার আরও কিছু কারণ তুলে ধরে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা মহানগর পুলিশের ডাম্পিং স্টেশনের জন্য ৩ দশমিক ৮১ একর জমি রয়েছে। তাদের সরাতে সময় লেগেছে। এ ছাড়া শাহবাগ থানাটি স্থানান্তরের কথা ছিল। কিন্তু থানাটি সেখানেই থাকায় তাদের ৩৩ শতাংশ জমি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণ প্যারালালভাবে চলছে। অপর দিকে ফুল মার্কেট সরাতে পারেনি। অন্তবর্তীকালীন সরকার তাদের সরানোর উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমানে তাদের সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের পুনর্বাসনের চিন্তা করা হচ্ছে। পার্কের জমিতে বড় বড় গাছ থাকায় সেগুলো কাটতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। রাইডের জন্য সম্প্রতি দরপত্র আহবান করা হয়েছে। এগুলো এলে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে।’
কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায় রাইড কেনায় দুর্নীতির কারণেও পার্কের নির্মাণ কাজ পিছিয়ে পড়েছে। আনিছুর রহমানের সিন্ডিকেট পার্কের জন্য প্রস্তাবিত রাইড কেনায় অবিশ্বাস্য অতি-মূল্যায়ন করে। এ ছাড়া দরপত্র প্রক্রিয়ায়ও ছিল না কোনো স্বচ্ছতা। প্রকল্প পরিচালক আনিছুর রহমান আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মূল্যে ১৫টি রাইড আমদানির বিতর্কিত ফাইল প্রস্তুত করেন। ২০২৪ সালের মে মাসে কাজ শুরুর পরপরই তার দপ্তরের এই টেন্ডার কেলেঙ্কারি ফাঁস হলে কেনাকাটা ও এলসি খোলার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আটকে যায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ঢিলেঢালা কাজের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার দায়ও তার ওপর বর্তায়।
এই প্রকল্পের বেশির ভাগ ব্যয় (৪৪১ কোটি টাকা) ধরা হয় শিশুপার্কের জন্য ১৫টি রাইড কেনা ও স্থাপনে। এসব রাইডের দাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেসরকারি খাতে বিনোদনকেন্দ্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্তরা বলছেন, রাইডের যে দর দেখানো হয়েছে, তা অবিশ্বাস্য।
একসঙ্গে ৩০ জন চড়তে পারে এমন একটি রাইড ‘মাইন ট্রেন’ (মাইন কোস্টার নামেও পরিচিত) কেনা ও স্থাপন করার জন্য ৯৭ কোটি টাকা খরচ করার কথা প্রকল্পে উল্লেখ করেছে ডিএসসিসি। এই রাইডের জন্য প্রকল্পে যে ধরনের বৈশিষ্ট্য ও মানের কথা বলা হয়েছে, তাতে এর দাম কোনোভাবেই ৫ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
প্রকল্পে ‘১২ডি থিয়েটার’ স্থাপন করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮১ কোটি টাকা। এই থিয়েটারের ভেতরে একসঙ্গে ৩৬ জন মানুষ বসতে পারবে। এ ধরনের একটি থিয়েটার নির্মাণ করতে সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অনেকে বলেছেন জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব যন্ত্র আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য দাম বেশি পড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে একই আকৃতির থিয়েটার কেউ যদি ইউরোপের মানের নির্মাণ করতে চান, তাহলেও সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা খরচ হবে। ২০২৪ সালের মে মাসে কাজ শুরুর পরপরই রাইডগুলোর প্রস্তাবিত দাম নিয়ে মারাত্মক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ফলে কেনাকাটার প্রক্রিয়া থমকে যায়।
শিশু পার্কটি এখনো চালু না হওয়ার বিষয়ে এসওএস চিলড্রেন'স ভিলেজেস বাংলাদেশের উপ-পরিচালক (তহবিল উন্নয়ন ও যোগাযোগ) রাশাল মিয়া সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা শিশুপার্ক বন্ধ থাকায় রাজধানীর শিশুরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন ও বিকাশের স্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থ বিকাশে এমন উন্মুক্ত ও নিরাপদ বিনোদনকেন্দ্র অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক জাভেদ জাহান বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চরম অব্যবস্থাপনা, অদূরদর্শীতা, রাজনৈতিক রেশারেশি ও নজরদারির অভাবে জাতীয় এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রয়েছে। আর এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সুযোগ নিচ্ছে।
পার্কটির আধুনিকায়নের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (৩য় পর্যায়)’ প্রকল্প থেকে ডিএসসিসিকে ২৬৫ কোটি ৭৮ লাখ বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই টাকা যথেষ্ট মনে করেনি ডিএসসিসি। পরে ডিএসসিসি নতুন বাজেটে প্রকল্প তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠালে তা প্রক্রিয়া অনুযায়ী ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রকল্প পাস হয়।
দুই বছর মেয়াদের কাজকে বারবার পেছানোর পরও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক ও তদারককারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। মাঠপর্যায়ে কাজের তদারকি না থাকায় প্রকল্প এলাকায় জলাবদ্ধতা ও আবর্জনার স্তূপ জমে পার্কটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
পার্কের এমন অবস্থা এবং সংস্কার কাজ শেষ হতে আর কত সময় লাগবে– এমন প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘পার্কের জন্য ১৫টি রাইড কেনার জন্য আগে দরপত্র হয়েছিল। সেখানে দুটি কোটেশনের স্পেসিফিকেশন নিয়ে সমস্যা ছিল। বর্তমানে ডিপিপির ভেটিং কমিটির মাধ্যমে ১৫টি রাইড কেনার জন্য দরপত্র দেওয়া হবে।’ এগুলো কেনা সম্ভব হলে আগামি ছয় মাসের মধ্যে পার্কটি চালু করা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

৪ প্রকৌশলীর দায়ে শিশু পার্ক বঞ্চিত নগরবাসী
আয়নাল হোসেন

২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে হঠাৎ একদিন শাহবাগের শিশু পার্কের সামনে একটি নোটিশ টানানো হয়। সেই নোটিশে জানানো হয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় শিশুপার্কের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজের জন্য কেন্দ্রীয় শিশুপার্কটি বন্ধ থাকবে। কিন্তু শিশু পার্কটি সেই যে বন্ধ হলো, এখন পর্যন্ত আর খোলেনি। শেষ হয়নি আধুনিকায়নের কাজ। অনুসন্ধানে জানা যায় অর্ধ যুগের বেশি সময়েও শিশু পার্কের আধুনিকায়নের কাজ শেষ না হওয়ার দায় মূলত প্রকল্প পরিচালক আনিছুর রহমান, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মাহবুব আলম, অঞ্চল ১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) সাইফুল ইসলাম জয় ও সহকারী প্রকৌশলী–১ মুবতাসিম ফুয়াদ বেগ। এই ৪ প্রকৌশলীর সিন্ডিকেট গত ৭ বছরের বেশি সময় ধরে প্রকল্পের কাটছাট, ব্যয়বৃদ্ধি, কেনাকাটাসহ সবকিছুই করেছে ইচ্ছামাফিক।
১৭ মে ও ১৮ মে পরপর দুই দিন শাহবাগ শিশু পার্কে গিয়ে দেখা যায় ভেতরে কয়েকটি নির্মাণাধীন ভবন পড়ে আছে। মাটির নিচে যে পার্কিং করা হচ্ছে, কাঁচঘেরা একটি ঘরের মধ্যে সেই গাড়ি পার্কিংয়ের প্রবেশ পথ। যেটা ঢেকে রাখা হয়েছে টিন দিয়ে।
মাটির উপরিভাগে কোনো কাজই সেভাবে দৃশ্যমান নয়। নেই রাস্তাঘাটও। শ্রমিকদের বসার জন্য ইট–বালু দিয়ে তৈরি কয়েকটি বেঞ্চ দেখা যায়। পার্কের পশ্চিম–দক্ষিণ পাশে প্রশাসনিক ভবন তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এটি চালু হতে আরও বছর খানেক সময় লাগবে বলে জানান সেখানে উপস্থিত ঠিকাদারের লোকজন। ১৮ মে দুপুরে গিয়ে দেখা যায় পার্ক লাগোয়া পূবালী ব্যাংকের শাখায় পুরোদমে অফিস চলছে। ব্যাংকের এই ভবনটি শিগগিরই ভেঙে দক্ষিণ পাশে নতুন একটি ভবনে স্থানান্তর করা হবে।
পার্কের জন্য নির্ধারিত এলাকাটি পুরো অরক্ষিত। সেখানে অনায়েসেই লোকজন ঢুকতে পারছে। আশপাশের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, রাতের বেলায় এখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। আনাগোনা বাড়ে ভাসমান যৌনকর্মীদের। প্রায় সাড়ে সাত বছর আগে আধুনিকায়নের কাজ শুরু হলেও সংশ্লিষ্টদের ধারণা পার্কটি চালু করতে আরও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে।
প্রকল্পের কাজ ২০২৪ সালে শুরু হয়ে ২০২৬ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দাপ্তরিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় চলতি বছরও এটির কাজ শেষ হচ্ছে না। সময় বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে সিটিজেন জার্নাল থেকে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আনিছুর রহমান প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
দীর্ঘদিন ধরে আনিছুর রহমান শাহবাগের শিশু পার্কটি দেখভালের দায়িত্বে আছেন। আর এখন তো তিনি পার্কটি সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের পরিচালক। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, স্বাভাবিকভাবেই এত বছরেও কাজ শেষ না হওয়ার দায় তাকে নিতে হবে।

এত বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ না করতে পারার পেছনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তাদের নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত, উদাসীনতা এবং দুর্নীতির সিন্ডিকেটের দায় আছে। দুর্নীতির সিন্ডিকেটটা মূলত প্রকল্প পরিচালক আনিছুর রহমান, ডিএসসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মাহবুব আলম, অঞ্চল ১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) সাইফুল ইসলাম জয় ও সহকারী প্রকৌশলী–১ মুবতাসিম ফুয়াদ বেগের সমন্বয়ে গড়া।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল–১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে অবশ্য বলেন, ‘আমরা পুর কাজ করবো। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে। তবে রাইডগুলো এখনও কেনা হয়নি। রাইডগুলো যেখানে স্থাপন করা হবে, সেখানে তাদের কাজ রয়েছে। ভারি যন্ত্রপাতি প্রবেশ করানো হবে। এ কারণে নির্মাণ কাজ আংশিক করা হয়েছে।’
নির্মাণ কাজ সময়মতো শেষ না হওয়ার আরও কিছু কারণ তুলে ধরে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা মহানগর পুলিশের ডাম্পিং স্টেশনের জন্য ৩ দশমিক ৮১ একর জমি রয়েছে। তাদের সরাতে সময় লেগেছে। এ ছাড়া শাহবাগ থানাটি স্থানান্তরের কথা ছিল। কিন্তু থানাটি সেখানেই থাকায় তাদের ৩৩ শতাংশ জমি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণ প্যারালালভাবে চলছে। অপর দিকে ফুল মার্কেট সরাতে পারেনি। অন্তবর্তীকালীন সরকার তাদের সরানোর উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমানে তাদের সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের পুনর্বাসনের চিন্তা করা হচ্ছে। পার্কের জমিতে বড় বড় গাছ থাকায় সেগুলো কাটতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। রাইডের জন্য সম্প্রতি দরপত্র আহবান করা হয়েছে। এগুলো এলে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে।’
কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায় রাইড কেনায় দুর্নীতির কারণেও পার্কের নির্মাণ কাজ পিছিয়ে পড়েছে। আনিছুর রহমানের সিন্ডিকেট পার্কের জন্য প্রস্তাবিত রাইড কেনায় অবিশ্বাস্য অতি-মূল্যায়ন করে। এ ছাড়া দরপত্র প্রক্রিয়ায়ও ছিল না কোনো স্বচ্ছতা। প্রকল্প পরিচালক আনিছুর রহমান আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মূল্যে ১৫টি রাইড আমদানির বিতর্কিত ফাইল প্রস্তুত করেন। ২০২৪ সালের মে মাসে কাজ শুরুর পরপরই তার দপ্তরের এই টেন্ডার কেলেঙ্কারি ফাঁস হলে কেনাকাটা ও এলসি খোলার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আটকে যায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ঢিলেঢালা কাজের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার দায়ও তার ওপর বর্তায়।
এই প্রকল্পের বেশির ভাগ ব্যয় (৪৪১ কোটি টাকা) ধরা হয় শিশুপার্কের জন্য ১৫টি রাইড কেনা ও স্থাপনে। এসব রাইডের দাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেসরকারি খাতে বিনোদনকেন্দ্র পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্তরা বলছেন, রাইডের যে দর দেখানো হয়েছে, তা অবিশ্বাস্য।
একসঙ্গে ৩০ জন চড়তে পারে এমন একটি রাইড ‘মাইন ট্রেন’ (মাইন কোস্টার নামেও পরিচিত) কেনা ও স্থাপন করার জন্য ৯৭ কোটি টাকা খরচ করার কথা প্রকল্পে উল্লেখ করেছে ডিএসসিসি। এই রাইডের জন্য প্রকল্পে যে ধরনের বৈশিষ্ট্য ও মানের কথা বলা হয়েছে, তাতে এর দাম কোনোভাবেই ৫ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
প্রকল্পে ‘১২ডি থিয়েটার’ স্থাপন করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮১ কোটি টাকা। এই থিয়েটারের ভেতরে একসঙ্গে ৩৬ জন মানুষ বসতে পারবে। এ ধরনের একটি থিয়েটার নির্মাণ করতে সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অনেকে বলেছেন জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব যন্ত্র আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য দাম বেশি পড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে একই আকৃতির থিয়েটার কেউ যদি ইউরোপের মানের নির্মাণ করতে চান, তাহলেও সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা খরচ হবে। ২০২৪ সালের মে মাসে কাজ শুরুর পরপরই রাইডগুলোর প্রস্তাবিত দাম নিয়ে মারাত্মক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ফলে কেনাকাটার প্রক্রিয়া থমকে যায়।
শিশু পার্কটি এখনো চালু না হওয়ার বিষয়ে এসওএস চিলড্রেন'স ভিলেজেস বাংলাদেশের উপ-পরিচালক (তহবিল উন্নয়ন ও যোগাযোগ) রাশাল মিয়া সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা শিশুপার্ক বন্ধ থাকায় রাজধানীর শিশুরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন ও বিকাশের স্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থ বিকাশে এমন উন্মুক্ত ও নিরাপদ বিনোদনকেন্দ্র অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক জাভেদ জাহান বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চরম অব্যবস্থাপনা, অদূরদর্শীতা, রাজনৈতিক রেশারেশি ও নজরদারির অভাবে জাতীয় এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রয়েছে। আর এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সুযোগ নিচ্ছে।
পার্কটির আধুনিকায়নের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (৩য় পর্যায়)’ প্রকল্প থেকে ডিএসসিসিকে ২৬৫ কোটি ৭৮ লাখ বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই টাকা যথেষ্ট মনে করেনি ডিএসসিসি। পরে ডিএসসিসি নতুন বাজেটে প্রকল্প তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠালে তা প্রক্রিয়া অনুযায়ী ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রকল্প পাস হয়।
দুই বছর মেয়াদের কাজকে বারবার পেছানোর পরও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক ও তদারককারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। মাঠপর্যায়ে কাজের তদারকি না থাকায় প্রকল্প এলাকায় জলাবদ্ধতা ও আবর্জনার স্তূপ জমে পার্কটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
পার্কের এমন অবস্থা এবং সংস্কার কাজ শেষ হতে আর কত সময় লাগবে– এমন প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘পার্কের জন্য ১৫টি রাইড কেনার জন্য আগে দরপত্র হয়েছিল। সেখানে দুটি কোটেশনের স্পেসিফিকেশন নিয়ে সমস্যা ছিল। বর্তমানে ডিপিপির ভেটিং কমিটির মাধ্যমে ১৫টি রাইড কেনার জন্য দরপত্র দেওয়া হবে।’ এগুলো কেনা সম্ভব হলে আগামি ছয় মাসের মধ্যে পার্কটি চালু করা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।




