শতবর্ষী বংশাল পুকুর, আয়ের টাকায় সহায়তা পান গরিবরা
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

শতবর্ষী বংশাল পুকুর, আয়ের টাকায় সহায়তা পান গরিবরা
শেখ শাহরিয়ার হোসেন
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ০৭: ০০

পুরান ঢাকার বংশাল পুকুর। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
পুরান ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ভিড়ে এখনও টিকে আছে এক ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগের গল্প। শতবর্ষী বংশাল পুকুর শুধু গোসল, সাঁতার বা বিনোদনের জায়গা নয়, বরং এটি স্থানীয় মানুষের জন্য সহমর্মিতা ও সামাজিক সহযোগিতার এক অনন্য কেন্দ্র। পুকুরের আয় দিয়ে এলাকাবাসীর জন্য বিনামূল্যে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়, স্থানীয়দের জন্য রয়েছে ফ্রি গোসলের সুবিধাও। একইসঙ্গে সহায়তা করা হয় গরিব-দুঃখী মানুষ ও কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারকে। প্রায় ১৭৬ বছরের পুরোনো এই পুকুর আজও পুরান ঢাকার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জনকল্যাণের এক জীবন্ত নিদর্শন হয়ে আছে।
জানা যায়, ব্যক্তিগত মালিকানাধীন এই পুকুরটি ১৮৫০ থেকে ১৮৫৪ সালের মধ্যে খনন করেন পুরান ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার হাজী বদরুদ্দীন ভুট্টো, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘ভোট্টো হাজী’ নামে পরিচিত ছিলেন। এলাকাবাসীর পানি সংকট নিরসনের লক্ষ্যেই তিনি ও তার ভাই মিলে প্রায় ছয় বিঘা জায়গাজুড়ে পুকুরটি খনন করেন। প্রায় ৪০০ ফুট লম্বা, ২৫০ ফুট চওড়া ও প্রায় ২০ ফুট গভীর এ পুকুরটির চারপাশে রয়েছে পাকা বেষ্টনী ও হাঁটার রাস্তা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে মানুষের চলাচল লেগেই থাকে। সারি সারি গাছের ছায়া আর স্বচ্ছ পানির প্রতিফলনে পুরো পরিবেশে তৈরি হয়েছে নৈসর্গিক সৌন্দর্য। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পুকুরটির সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা এখনো মানুষকে মুগ্ধ করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন প্রায় পাঁচশো মানুষ এখানে গোসল করতে আসেন। মাত্র ৫ টাকায় গোসলের এই সুযোগ মহল্লাবাসী পান বিনামূল্যে। হাত-মুখ ধোয়া ও অজুর জন্য কোনো টাকা দিতে হয় না। পুকুরে মাছ ধরার জন্য ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। সেই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় অসহায় মানুষদের সহায়তায়। পাশাপাশি পুকুর থেকে প্রাপ্ত আয়ের টাকা স্থানীয় মসজিদ পরিচালনা ও এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজেও ব্যবহার করে এখানকার পঞ্চায়েত কমিটি।
বংশাল পুকুরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশও। ভোর হতেই এখানে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ হাঁটেন, কেউ সাঁতার কাটেন, কেউ আবার পুকুরপাড়ে বসে গল্প করেন। পুকুর পাড়ে থাকা নোটিশ বোর্ডে উল্লেখ রয়েছে, পুরো পুকুর একবার চক্কর দিলে প্রায় ৯৩০ ফুট বা ২৭৫ মিটার পথ অতিক্রম করা হয়। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের হাঁটতে উদ্বুদ্ধ করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে পুকুরটি।
স্থানীয়দের মতে, একসময় এই পুকুরপাড়েই নিয়মিত বিচার-শালিস বসত। সেই ঐতিহ্য এখন না থাকলেও সকালবেলার গোসল ও আড্ডা যেন এখনও পুরান ঢাকার সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে। সন্ধ্যার পরেও পুকুরপাড়ে জমে ওঠে আড্ডা। আশপাশের বাড়িগুলোও তৈরি করা হয়েছে পুকুরমুখী করে, যেন বাসিন্দারা এই জলাশয়ের শীতল পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন।

এদিকে, পুকুরকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় কয়েকজন পাহারাদার পুকুরটি দেখভাল করেন। এছাড়া পানির পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে কাজ করেন আরও কয়েকজন। স্থানীয় শিশু-কিশোরদের সাঁতার শেখার অন্যতম কেন্দ্রও এই পুকুর। কম খরচে সাঁতার শেখার সুযোগ থাকায় বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ এখানে আসেন।
ঢাকার মতো নগরে যেখানে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া অনেকের জন্য কঠিন, সেখানে বংশাল পঞ্চায়েত কমিটি পুকুরের আয়ের অর্থ দিয়ে নিজস্ব পানির পাম্পের মাধ্যমে এলাকাবাসীকে বিনামূল্যে সুপেয় পানি সরবরাহ করছে। স্থানীয়দের মতে, শুধু একটি পুকুর নয়, এটি পুরান ঢাকার মানুষের জীবনযাত্রা, ঐতিহ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বংশালের স্থানীয় বাসিন্দা আলিমুল ইসলাম বলেন, ‘এখনকার সময়ে ঢাকার মধ্যে ফ্রিতে বিশুদ্ধ খাবার পানি পাওয়া কঠিন ব্যাপার। সেখানে বংশাল পুকুর থেইকা এলাকার মানুষজন বিনামূল্যে পানি নিতে পারতেছে, আবার স্থানীয়দের গোসলের জন্যও কোনো টাকাও লাগে না। সবকিছুর পেছনে যেখানে ব্যবসা চলে, সেখানে মানুষজনের সুবিধার কথা চিন্তা কইরা এমন ব্যবস্থা চালাইয়া রাখা সহজ না। এলাকার মানুষ ছোটবেলা থেইকাই এই পুকুরের সাথে জড়িত। এই পুকুর শুধু একটা জলাশয় না, আমাদের জীবনেরই একটা অংশ।’
বংশাল পঞ্চায়েত কমিটির সদস্য হাজী গোলাম মউলা বলেন, ‘এই পুকুরটা এখন এলাকার মানুষের জীবনের একটা অংশ হইয়া গেছে। সকালে কেউ হাঁটতে আসে, কেউ গোসল করে, কেউ আবার এমনি পুকুরপাড়ে বসে আড্ডা দেয়। পুকুর থেকে আয়ের টাকা দিয়ে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়। অনেক গরীবের সাহায্য করা হয়। আমার বাবাও এই পুকুরের রক্ষণাবেক্ষণ করতো। আমাদের পঞ্চায়েত কমিটিই এখন এটা পরিচালনা করে। পুরান ঢাকার এই ব্যস্ততার মধ্যে পুকুরটা মানুষদের একটু শান্তি দেয়, তাই সবাই এই জায়গাটাকে আপন মনে করে।

পুরান ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ভিড়ে এখনও টিকে আছে এক ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগের গল্প। শতবর্ষী বংশাল পুকুর শুধু গোসল, সাঁতার বা বিনোদনের জায়গা নয়, বরং এটি স্থানীয় মানুষের জন্য সহমর্মিতা ও সামাজিক সহযোগিতার এক অনন্য কেন্দ্র। পুকুরের আয় দিয়ে এলাকাবাসীর জন্য বিনামূল্যে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়, স্থানীয়দের জন্য রয়েছে ফ্রি গোসলের সুবিধাও। একইসঙ্গে সহায়তা করা হয় গরিব-দুঃখী মানুষ ও কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারকে। প্রায় ১৭৬ বছরের পুরোনো এই পুকুর আজও পুরান ঢাকার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জনকল্যাণের এক জীবন্ত নিদর্শন হয়ে আছে।
জানা যায়, ব্যক্তিগত মালিকানাধীন এই পুকুরটি ১৮৫০ থেকে ১৮৫৪ সালের মধ্যে খনন করেন পুরান ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার হাজী বদরুদ্দীন ভুট্টো, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘ভোট্টো হাজী’ নামে পরিচিত ছিলেন। এলাকাবাসীর পানি সংকট নিরসনের লক্ষ্যেই তিনি ও তার ভাই মিলে প্রায় ছয় বিঘা জায়গাজুড়ে পুকুরটি খনন করেন। প্রায় ৪০০ ফুট লম্বা, ২৫০ ফুট চওড়া ও প্রায় ২০ ফুট গভীর এ পুকুরটির চারপাশে রয়েছে পাকা বেষ্টনী ও হাঁটার রাস্তা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে মানুষের চলাচল লেগেই থাকে। সারি সারি গাছের ছায়া আর স্বচ্ছ পানির প্রতিফলনে পুরো পরিবেশে তৈরি হয়েছে নৈসর্গিক সৌন্দর্য। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পুকুরটির সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা এখনো মানুষকে মুগ্ধ করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন প্রায় পাঁচশো মানুষ এখানে গোসল করতে আসেন। মাত্র ৫ টাকায় গোসলের এই সুযোগ মহল্লাবাসী পান বিনামূল্যে। হাত-মুখ ধোয়া ও অজুর জন্য কোনো টাকা দিতে হয় না। পুকুরে মাছ ধরার জন্য ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। সেই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় অসহায় মানুষদের সহায়তায়। পাশাপাশি পুকুর থেকে প্রাপ্ত আয়ের টাকা স্থানীয় মসজিদ পরিচালনা ও এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজেও ব্যবহার করে এখানকার পঞ্চায়েত কমিটি।
বংশাল পুকুরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশও। ভোর হতেই এখানে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ হাঁটেন, কেউ সাঁতার কাটেন, কেউ আবার পুকুরপাড়ে বসে গল্প করেন। পুকুর পাড়ে থাকা নোটিশ বোর্ডে উল্লেখ রয়েছে, পুরো পুকুর একবার চক্কর দিলে প্রায় ৯৩০ ফুট বা ২৭৫ মিটার পথ অতিক্রম করা হয়। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের হাঁটতে উদ্বুদ্ধ করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে পুকুরটি।
স্থানীয়দের মতে, একসময় এই পুকুরপাড়েই নিয়মিত বিচার-শালিস বসত। সেই ঐতিহ্য এখন না থাকলেও সকালবেলার গোসল ও আড্ডা যেন এখনও পুরান ঢাকার সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে। সন্ধ্যার পরেও পুকুরপাড়ে জমে ওঠে আড্ডা। আশপাশের বাড়িগুলোও তৈরি করা হয়েছে পুকুরমুখী করে, যেন বাসিন্দারা এই জলাশয়ের শীতল পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন।

এদিকে, পুকুরকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় কয়েকজন পাহারাদার পুকুরটি দেখভাল করেন। এছাড়া পানির পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে কাজ করেন আরও কয়েকজন। স্থানীয় শিশু-কিশোরদের সাঁতার শেখার অন্যতম কেন্দ্রও এই পুকুর। কম খরচে সাঁতার শেখার সুযোগ থাকায় বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ এখানে আসেন।
ঢাকার মতো নগরে যেখানে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া অনেকের জন্য কঠিন, সেখানে বংশাল পঞ্চায়েত কমিটি পুকুরের আয়ের অর্থ দিয়ে নিজস্ব পানির পাম্পের মাধ্যমে এলাকাবাসীকে বিনামূল্যে সুপেয় পানি সরবরাহ করছে। স্থানীয়দের মতে, শুধু একটি পুকুর নয়, এটি পুরান ঢাকার মানুষের জীবনযাত্রা, ঐতিহ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বংশালের স্থানীয় বাসিন্দা আলিমুল ইসলাম বলেন, ‘এখনকার সময়ে ঢাকার মধ্যে ফ্রিতে বিশুদ্ধ খাবার পানি পাওয়া কঠিন ব্যাপার। সেখানে বংশাল পুকুর থেইকা এলাকার মানুষজন বিনামূল্যে পানি নিতে পারতেছে, আবার স্থানীয়দের গোসলের জন্যও কোনো টাকাও লাগে না। সবকিছুর পেছনে যেখানে ব্যবসা চলে, সেখানে মানুষজনের সুবিধার কথা চিন্তা কইরা এমন ব্যবস্থা চালাইয়া রাখা সহজ না। এলাকার মানুষ ছোটবেলা থেইকাই এই পুকুরের সাথে জড়িত। এই পুকুর শুধু একটা জলাশয় না, আমাদের জীবনেরই একটা অংশ।’
বংশাল পঞ্চায়েত কমিটির সদস্য হাজী গোলাম মউলা বলেন, ‘এই পুকুরটা এখন এলাকার মানুষের জীবনের একটা অংশ হইয়া গেছে। সকালে কেউ হাঁটতে আসে, কেউ গোসল করে, কেউ আবার এমনি পুকুরপাড়ে বসে আড্ডা দেয়। পুকুর থেকে আয়ের টাকা দিয়ে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়। অনেক গরীবের সাহায্য করা হয়। আমার বাবাও এই পুকুরের রক্ষণাবেক্ষণ করতো। আমাদের পঞ্চায়েত কমিটিই এখন এটা পরিচালনা করে। পুরান ঢাকার এই ব্যস্ততার মধ্যে পুকুরটা মানুষদের একটু শান্তি দেয়, তাই সবাই এই জায়গাটাকে আপন মনে করে।

শতবর্ষী বংশাল পুকুর, আয়ের টাকায় সহায়তা পান গরিবরা
শেখ শাহরিয়ার হোসেন
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ০৭: ০০

পুরান ঢাকার বংশাল পুকুর। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
পুরান ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ভিড়ে এখনও টিকে আছে এক ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগের গল্প। শতবর্ষী বংশাল পুকুর শুধু গোসল, সাঁতার বা বিনোদনের জায়গা নয়, বরং এটি স্থানীয় মানুষের জন্য সহমর্মিতা ও সামাজিক সহযোগিতার এক অনন্য কেন্দ্র। পুকুরের আয় দিয়ে এলাকাবাসীর জন্য বিনামূল্যে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়, স্থানীয়দের জন্য রয়েছে ফ্রি গোসলের সুবিধাও। একইসঙ্গে সহায়তা করা হয় গরিব-দুঃখী মানুষ ও কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারকে। প্রায় ১৭৬ বছরের পুরোনো এই পুকুর আজও পুরান ঢাকার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জনকল্যাণের এক জীবন্ত নিদর্শন হয়ে আছে।
জানা যায়, ব্যক্তিগত মালিকানাধীন এই পুকুরটি ১৮৫০ থেকে ১৮৫৪ সালের মধ্যে খনন করেন পুরান ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার হাজী বদরুদ্দীন ভুট্টো, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘ভোট্টো হাজী’ নামে পরিচিত ছিলেন। এলাকাবাসীর পানি সংকট নিরসনের লক্ষ্যেই তিনি ও তার ভাই মিলে প্রায় ছয় বিঘা জায়গাজুড়ে পুকুরটি খনন করেন। প্রায় ৪০০ ফুট লম্বা, ২৫০ ফুট চওড়া ও প্রায় ২০ ফুট গভীর এ পুকুরটির চারপাশে রয়েছে পাকা বেষ্টনী ও হাঁটার রাস্তা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে মানুষের চলাচল লেগেই থাকে। সারি সারি গাছের ছায়া আর স্বচ্ছ পানির প্রতিফলনে পুরো পরিবেশে তৈরি হয়েছে নৈসর্গিক সৌন্দর্য। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পুকুরটির সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা এখনো মানুষকে মুগ্ধ করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন প্রায় পাঁচশো মানুষ এখানে গোসল করতে আসেন। মাত্র ৫ টাকায় গোসলের এই সুযোগ মহল্লাবাসী পান বিনামূল্যে। হাত-মুখ ধোয়া ও অজুর জন্য কোনো টাকা দিতে হয় না। পুকুরে মাছ ধরার জন্য ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। সেই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় অসহায় মানুষদের সহায়তায়। পাশাপাশি পুকুর থেকে প্রাপ্ত আয়ের টাকা স্থানীয় মসজিদ পরিচালনা ও এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজেও ব্যবহার করে এখানকার পঞ্চায়েত কমিটি।
বংশাল পুকুরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশও। ভোর হতেই এখানে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ হাঁটেন, কেউ সাঁতার কাটেন, কেউ আবার পুকুরপাড়ে বসে গল্প করেন। পুকুর পাড়ে থাকা নোটিশ বোর্ডে উল্লেখ রয়েছে, পুরো পুকুর একবার চক্কর দিলে প্রায় ৯৩০ ফুট বা ২৭৫ মিটার পথ অতিক্রম করা হয়। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের হাঁটতে উদ্বুদ্ধ করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে পুকুরটি।
স্থানীয়দের মতে, একসময় এই পুকুরপাড়েই নিয়মিত বিচার-শালিস বসত। সেই ঐতিহ্য এখন না থাকলেও সকালবেলার গোসল ও আড্ডা যেন এখনও পুরান ঢাকার সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে। সন্ধ্যার পরেও পুকুরপাড়ে জমে ওঠে আড্ডা। আশপাশের বাড়িগুলোও তৈরি করা হয়েছে পুকুরমুখী করে, যেন বাসিন্দারা এই জলাশয়ের শীতল পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন।

এদিকে, পুকুরকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় কয়েকজন পাহারাদার পুকুরটি দেখভাল করেন। এছাড়া পানির পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে কাজ করেন আরও কয়েকজন। স্থানীয় শিশু-কিশোরদের সাঁতার শেখার অন্যতম কেন্দ্রও এই পুকুর। কম খরচে সাঁতার শেখার সুযোগ থাকায় বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ এখানে আসেন।
ঢাকার মতো নগরে যেখানে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া অনেকের জন্য কঠিন, সেখানে বংশাল পঞ্চায়েত কমিটি পুকুরের আয়ের অর্থ দিয়ে নিজস্ব পানির পাম্পের মাধ্যমে এলাকাবাসীকে বিনামূল্যে সুপেয় পানি সরবরাহ করছে। স্থানীয়দের মতে, শুধু একটি পুকুর নয়, এটি পুরান ঢাকার মানুষের জীবনযাত্রা, ঐতিহ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বংশালের স্থানীয় বাসিন্দা আলিমুল ইসলাম বলেন, ‘এখনকার সময়ে ঢাকার মধ্যে ফ্রিতে বিশুদ্ধ খাবার পানি পাওয়া কঠিন ব্যাপার। সেখানে বংশাল পুকুর থেইকা এলাকার মানুষজন বিনামূল্যে পানি নিতে পারতেছে, আবার স্থানীয়দের গোসলের জন্যও কোনো টাকাও লাগে না। সবকিছুর পেছনে যেখানে ব্যবসা চলে, সেখানে মানুষজনের সুবিধার কথা চিন্তা কইরা এমন ব্যবস্থা চালাইয়া রাখা সহজ না। এলাকার মানুষ ছোটবেলা থেইকাই এই পুকুরের সাথে জড়িত। এই পুকুর শুধু একটা জলাশয় না, আমাদের জীবনেরই একটা অংশ।’
বংশাল পঞ্চায়েত কমিটির সদস্য হাজী গোলাম মউলা বলেন, ‘এই পুকুরটা এখন এলাকার মানুষের জীবনের একটা অংশ হইয়া গেছে। সকালে কেউ হাঁটতে আসে, কেউ গোসল করে, কেউ আবার এমনি পুকুরপাড়ে বসে আড্ডা দেয়। পুকুর থেকে আয়ের টাকা দিয়ে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়। অনেক গরীবের সাহায্য করা হয়। আমার বাবাও এই পুকুরের রক্ষণাবেক্ষণ করতো। আমাদের পঞ্চায়েত কমিটিই এখন এটা পরিচালনা করে। পুরান ঢাকার এই ব্যস্ততার মধ্যে পুকুরটা মানুষদের একটু শান্তি দেয়, তাই সবাই এই জায়গাটাকে আপন মনে করে।
/এফসি/




