শিরোনাম

শান্তার ফাইল পার করতে রাজউকের ‘গোপন মিশন’

শান্তার ফাইল পার করতে রাজউকের ‘গোপন মিশন’
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

রাজধানীর গুলশানে সিনেমা হলের প্লট একত্রীকরণ এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরিতে অনুমোদন দেওয়ার কাজ নানা জটিলতায় আটকে ছিল। কিন্তু অনেকটা ‘গোপন মিশন’ চালিয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্লট একত্রীকরণের প্রাথমিক ধাপ শেষ করলেও তা আবার আটকে গেছে সিনেমা হল নির্মাণ করার শর্তে প্লট লিজ নেওয়া প্রতিষ্ঠান ‘বাণীচিত্র’ ও ‘চলচ্চিত্র’-এর পক্ষ থেকে লিখিত আপত্তি কারণে। সেই সঙ্গে আইনি বাগড়া দিয়ে বাদ সেধেছেন রাজউকের ভূমি শাখার পরিচালক। সিটিজেন জার্নালের হাতে আসা নথিপত্র ও দীর্ঘ অনুসন্ধানে এ ফাইল সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে।

সিনেমা হলের প্লট একত্রীকরণ এবং বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার গোপন মিশনে ‘চেইন’ হিসেবে কাজ করেছেন রাজউকের চেয়ারম্যান থেকে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট শাখার অফিস সহকারী পর্যন্ত। তারা সবাই মিলে অতি গোপনীয়তার সঙ্গে পুরো কাজটি করেছেন।

দীর্ঘ সময় ধরে রাজউকের এ টেবিল থেকে ও টেবিলে ঘুরতে থাকা ফাইলটি একটি আলাদা নামও পেয়ে যায়-‘শান্তার ফাইল’। প্লট একত্রীকরণ এবং ৩০ তলার অধিক বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরির অনুমোদন শান্তা হোল্ডিংসকে দেওয়া হচ্ছে বলেই এমন নামকরণ। ‘শান্তা’র ফাইল অনুমোদন করানো নিয়ে রাজউকের শীর্ষ কর্মকর্তারা জটিলতায় পড়লেও শেষ পর্যন্ত কাজটি করিয়ে নিতে পারেন। যেসব কর্মকর্তা ফাইলে নানা আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন ও প্লট একত্রীকরণ করার সুযোগ নেই বলে মতামত দিয়েছিলেন, তারাই পরে নানা কায়দায় তা ‘পার’ করে দেন।

রাজউকের নথি বলছে, ১৯৭৫ সালে গুলশান (দক্ষিণ) বাণিজ্যিক এলাকার ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লট ৯৯ বছরের জন্য ‘বাণীচিত্র’ ও ‘চলচ্চিত্র’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দের শর্ত ছিল এই জমিতে সিনেমা হল নির্মাণ করতে হবে, অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া এবং দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন হলেও দীর্ঘ সময় ধরে শর্ত অনুযায়ী সেখানে কোনো সিনেমা হল নির্মিত হয়নি।

রাজউকের এক কর্মকর্তা জানান, কাজটি করিয়ে নিতে শান্তা হোল্ডিংস রাজউক ভবনে অর্ধশত কোটি টাকা ঢেলেছে। সিনেমা হলের জন্য বরাদ্দ দেওয়া তিনটি প্লটের সঙ্গে আরেকটি প্লট একত্রীকরণ করে বাণিজ্যিক করার কাজটি দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকলেও তা চূড়ান্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সরকারের বিশেষ শর্তে দেওয়া অর্থাৎ বিনোদন কেন্দ্রের নামে বরাদ্দ প্লটগুলো বাণিজ্যিক স্থাপনায় রূপান্তর হয়ে যাচ্ছে। অথচ আইনগতভাবে এর কোনো সুযোগ নেই।

সিনেমা হল থেকে শান্তা হোল্ডিংসের ৪০ তলা বাণিজ্যিক ভবন

রাজউকের নথি বলছে, ১৯৭৫ সালে গুলশান (দক্ষিণ) বাণিজ্যিক এলাকার ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লট ৯৯ বছরের জন্য ‘বাণীচিত্র’ ও ‘চলচ্চিত্র’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দের শর্ত ছিল এই জমিতে সিনেমা হল নির্মাণ করতে হবে, অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া এবং দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন হলেও এই দীর্ঘ সময়েও সেখানে কোনো সিনেমা হল নির্মিত হয়নি।

পরবর্তীতে বরাদ্দের শর্ত আংশিক পরিবর্তনের উদ্যোগ, নকশা সংশোধন এবং আম-মোক্তারনামার মাধ্যমে প্লটগুলোর নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন আসে। একপর্যায়ে শান্তা হোল্ডিংস আম-মোক্তার হিসেবে যুক্ত হয়ে বাণিজ্যিক উন্নয়ন কার্যক্রমে এগিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই শান্তা হোল্ডিংস উল্লিখিত তিনটি প্লটের সঙ্গে আরও একটি প্লট (১৪ নম্বর) একত্রীকরণের জন্য রাজউকে চিঠি দেয়। অভিযোগ আছে, আম-মোক্তারনামার শর্ত ভেঙে এসব প্লটের বিপরীতে বড় অঙ্কের ঋণ নেয় শান্তা। এ নিয়ে পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে শান্তার বিরোধ সৃষ্টি হয়।

গুলশান-১ গোল চত্বরে রাজউকের বরাদ্দ দেওয়া প্লটে শান্তা হোল্ডিংসের বিলবোর্ড। ছবি: ‍সিটিজেন জার্নাল
গুলশান-১ গোল চত্বরে রাজউকের বরাদ্দ দেওয়া প্লটে শান্তা হোল্ডিংসের বিলবোর্ড। ছবি: ‍সিটিজেন জার্নাল

জানা গেছে, ২০২৩ সালের আগস্টে অনিয়মের অভিযোগ তুলে শান্তা হোল্ডিংসকে নোটিশ অব টার্মিনেশনের মাধ্যমে আম-মোক্তারনামা বাতিলের ঘোষণা দেয় প্রতিষ্ঠান দুটি। এরপর এ বিষয়ে মামলা করা হলে তা আদালত খারিজ করে দেন। পরে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করা হয়। সেখানে আদালত রুল জারি করে মামলা চলাকালীন উক্ত স্থানে সব ধরনের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। বিষয়টি আপিল বিভাগে গড়ালে প্রথমে ৮ সপ্তাহের জন্য স্টে অর্ডার দেওয়া হয়, পরে তা মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। একইসঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগের জারি করা রুল ৩ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। পরবর্তীতে আদালত আরও ১ মাসের স্টে অর্ডার জারি করেন।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, গুলশান-১ এলাকায় চারটি প্লট একত্রীকরণের জন্য শান্তা হোল্ডিংস আবেদন করলে শুরুতেই আপত্তি তোলে সংস্থাটির স্থাপত্য শাখা। স্থাপত্য বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত নথিতে বলা হয়, আম-মোক্তারনামা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্লট একত্রীকরণ সমীচীন হবে না।

ফাইল যারা অনুমোদন দিলেন

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, গুলশান-১ এলাকায় চারটি প্লট একত্রীকরণের জন্য শান্তা হোল্ডিংস আবেদন করলে শুরুতেই আপত্তি তোলে সংস্থাটির স্থাপত্য শাখা। স্থাপত্য বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত নথিতে বলা হয়, আম-মোক্তারনামা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্লট একত্রীকরণ সমীচীন হবে না।

তবে এই আপত্তির পরও থেমে থাকেনি শান্তা হোল্ডিংস। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করতে তৎপর হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু আম-মোক্তারনামা নিয়ে চলমান বিরোধের কারণে সংশ্লিষ্ট কেউই বিষয়টির কোনো কূলকিনারা করতে পারছিলেন না।

গুলশান-১ এলাকার প্লট একত্রীকরণ বিষয়ে আমরা কেবল মতামত দিয়ে তা এস্টেট ও ভূমি অফিসে পাঠিয়েছি। বিস্তারিত তারা জানাতে পারবে
মো. সাইদ ইবনে জায়েদ আইন কর্মকর্তা, রাজউক

এর মধ্যেই রাজউকের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে শান্তা হোল্ডিংস। রিট নম্বর ১৩৯৩৩/২০২৪। শুনানি শেষে হাইকোর্ট রাজউককে নির্দেশ দেন, শান্তা হোল্ডিংসের প্লট একত্রীকরণের আবেদন এক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হাইকোর্টের দেওয়া ‘আবেদন নিষ্পত্তি’ সংক্রান্ত নির্দেশনাকেই পরবর্তীতে কাজে লাগান রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, আবেদন নিষ্পত্তির নির্দেশকে কার্যত প্লট একত্রীকরণের অনুমোদন দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানো হয়।

রাজউকের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংস্থাটির আইন শাখা প্লট একত্রীকরণ বিষয়ে মতামত দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছে, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আবেদনটি ‘বিধি মোতাবেক নিষ্পত্তি’ করা যেতে পারে। তবে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কিছু জানাতে চায়নি রাজউকের আইন বিভাগ। যদিও কোনো মামলার শুধুমাত্র হাইকোর্ট বিভাগের আদেশের পর রাজউক তা বাস্তবায়ন করেছে, এমন নজির এখন পর্যন্ত নেই।

এই বিষয়ে গত মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে রাজউকের আইন কর্মকর্তা মো. সাইদ ইবনে জায়েদ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘গুলশান-১ এলাকার প্লট একত্রীকরণ বিষয়ে আমরা কেবল মতামত দিয়ে তা এস্টেট ও ভূমি অফিসে পাঠিয়েছি। বিস্তারিত তারা জানাতে পারবে।’ আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরে এ কর্মকর্তার মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি তা এড়িয়ে যান।

রাজউকের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, সাবেক এস্টেট ও ভূমির সদস্য (বর্তমান অর্থ ও প্রশাসন) শেখ মতিয়ার রহমান ও পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১/২) মাসুম আলী বেগ প্লট একত্রীকরণ অনুমোদনের নথিতে স্বাক্ষর করেন। একইসঙ্গে স্থাপত্য শাখাকে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

আইন শাখার মতামতের পর এস্টেট ও ভূমির সদস্য এবং পরিচালকের দপ্তর থেকে চারটি প্লট একত্রীকরণের পক্ষে মত দেওয়া হয়। রাজউকের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, সাবেক এস্টেট ও ভূমির সদস্য (বর্তমান অর্থ ও প্রশাসন) শেখ মতিয়ার রহমান ও পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১/২) মাসুম আলী বেগ প্লট একত্রীকরণ অনুমোদনের নথিতে স্বাক্ষর করেন। একইসঙ্গে স্থাপত্য শাখাকে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

পরে ফাইলটি রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি এতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। ফাইলটি আবার স্থাপত্য শাখায় পাঠানো হলে চলতি বছরের ১২ মার্চ চারটি প্লট একত্রীকরণ এবং সংশোধিত আংশিক লে-আউট প্রকাশ করে, যাতে স্বাক্ষর করেন রাজউক চেয়ারম্যান।

শেষ হয়েও হলো না শেষ

এরই ধারাবাহিকতায় আবার শান্তা হোল্ডিংসের আম-মোক্তারনামার কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়ে গত ১৬ মার্চ লিজ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠান বাণীচিত্র লিমিটেড ও চলচ্চিত্র লিমিটেড-এর পক্ষ থেকে ফ্লোরিন গনি রহমান একটি আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ মে উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. নজরুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম উক্ত প্লটগুলোর একত্রীকরণের অনুমতিপত্র বর্তমানে জারি করা হবে কি না, তা জানতে চেয়ে এস্টেট ও ভূমির সদস্য এবং পরিচালকের কাছে উপস্থাপন করেন। এবার পরিচালক মাসুম আলী বেগ নথিতে উল্লেখ করেন, আরবিট্রেশন মামলা নিষ্পত্তি না হলে প্লটগুলোর একত্রীকরণের অনুমতিপত্র বর্তমানে জারি করা সমীচীন হবে না।

গুলশান এক নম্বরের গোল চত্বরে টিন দিয়ে ঘেরা বিশাল জায়গায় শান্তা হোল্ডিংসের বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের তোড়জোড় চলছে। ছবি: ‍সিটিজেন জার্নাল
গুলশান এক নম্বরের গোল চত্বরে টিন দিয়ে ঘেরা বিশাল জায়গায় শান্তা হোল্ডিংসের বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের তোড়জোড় চলছে। ছবি: ‍সিটিজেন জার্নাল

ফাইল নড়ে না স্বাভাবিকভাবে

রাজউকে ‘জটিল ফাইল’ হিসেবে পরিচিত শান্তা হোল্ডিংসের প্লট একত্রীকরণের বিষয়টি শুরু থেকেই এগিয়েছে অতি গোপনীয়তার সঙ্গে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পুরো প্রক্রিয়ায় ফাইলটি ছিল হাতে হাতে এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে। দাপ্তরিক স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সীমিত পরিসরে নথিপত্র আদান-প্রদান করা হয়। এমনকী চেয়ারম্যানের দপ্তরেও ফাইলটি কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। শান্তা হোল্ডিংসকে অনুমোদন দেওয়ার জন্য পুরো কার্যক্রমজুড়ে ছিল বাড়তি সতর্কতা ও গোপনীয়তা। যা রাজউকের সবার মুখে মুখে।

সংশ্লিষ্টরা যা বলেন

গত ২ ফেব্রুয়ারি সিটিজেন জার্নালে প্রকাশিত ‘পদে পদে আইন ভেঙে গুলশানে হচ্ছে শান্তার বাণিজ্যিক ভবন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে রাজউকের জোন-৪ এর অথরাইজড কর্মকর্তা মো. হাসানুর রেজা সিটিজেন জার্নালকে বলেছিলেন, ‘আম-মোক্তারনামা বাতিলের মামলা নিষ্পত্তি না হলে প্লট একত্রীকরণের আবেদন গ্রহণ করার সুযোগ নেই। শুরুতেই তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ওই প্লটগুলোতে শান্তা হোল্ডিংসের বিলবোর্ড টানানো বা গ্রাউন্ড ওয়াল তৈরির কাজের কোনো এখতিয়ার নেই।’

রাজউক সূত্র জানায়, শান্তা হোল্ডিংসের এ ফাইল ঘিরে আলোচিত ভূমিকায় থাকা পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. মিজানুর রহমানকে ইতোমধ্যে বদলি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তার জায়গায় ভূমি ও এস্টেট-২ বিভাগের পরিচালক মাসুম আলী বেগকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমার বিস্তারিত জানা নেই। এস্টেট ও ভূমি-১ বিভাগের উপপরিচালকের সঙ্গে কথা বলুন।’

শুধু ভূমি পরিচালক একা নন, চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে অফিস সহকারী সবাই যেন এক সুরে কথা বলছেন। শান্তার ফাইল নিয়ে জিজ্ঞেস করলে রাজউকের সব কর্মকর্তার মধ্যেই লুকোচুরি একটা ভাব দেখা যায়। কেউ গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন, আবার কেউ কৌশলে উত্তর দিয়েছেন।

শুধু তিনি একা নন, চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে অফিস সহকারী সবাই যেন এক সুরে কথা বলছেন। শান্তার ফাইল নিয়ে জিজ্ঞেস করলে রাজউকের সব কর্মকর্তার মধ্যেই লুকোচুরি একটা ভাব দেখা যায়। কেউ গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলেছেন, আবার কেউ কৌশলে উত্তর দিয়েছেন। রাজউকের সাবেক এস্টেট ও ভূমির সদস্য শেখ মতিয়ার রহমান (বর্তমানে অর্থ ও প্রশাসন সদস্য) প্লট একত্রীকরণ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতেই রাজি হননি। বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না, অফিস প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’

এস্টেট ও ভূমি-১ বিভাগের উপপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমানেরও একই সুর। তিনি জানান, এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার তার নেই। কথা বলতে পরামর্শ দেন রাজউক চেয়ারম্যানের সঙ্গে।

এবার আমরা রাজউক চেয়ারম্যানের বক্তব্য নিতে দীর্ঘ চেষ্টা করি। সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের দপ্তরে গেলে তার ব্যক্তিগত সহকারী জানান, তিনি সভায় ব্যস্ত। প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর তার সহকারী বলেন, ‘আজ স্যারের সাথে দেখা করা যাবে না। স্যার চলে গিয়েছেন।’ পরে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। বিস্তারিত লিখে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও কোনো সাড়া দেননি।

অন্যদিকে শান্তা হোল্ডিংসের নির্বাহী পরিচালক (গ্রুপ ফাইন্যান্স) এম. আনিসুল হকের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। বুধবার (৬ মে) দুপুরে প্রথমবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিস্তারিত লিখে পাঠানো হলেও কোনো উত্তর দেননি। সর্বশেষ সোমবার রাতে (১১ মে) আবারও কল করা হলে রিসিভ করেননি তিনি।

নগর পরিকল্পনায় সাংস্কৃতিক অবকাঠামোকে উপেক্ষা করে কেবল বাণিজ্যিকায়নের দিকে ঝুঁকে পড়া দীর্ঘমেয়াদে নগর জীবনের জন্য ক্ষতিকর। এ ধরনের সিদ্ধান্তের জন্য রাজউকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত
স্থপতি ইকবাল হাবিব নগরবিদ

এদিকে, সিনেমা হলের জায়গায় শান্তার বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ বিষয়ে নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘রাজধানীর গুলশান এলাকায় গত কয়েক বছরে জনসংখ্যার ঘনত্ব কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় মানুষ প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক সেবা পাচ্ছে না। ফলে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।’

এরপর তিনি যোগ করেন, ‘রাজউকের মূল দায়িত্ব হলো জমির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। সিনেমা হলের জায়গায় বিকল্প সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, পাঠাগার কিংবা শিল্পচর্চার স্থান গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। কিন্তু তা না করে সেখানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা রাজউকের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতারই প্রমাণ।’

এ নগরবিদের মতে, ‘নগর পরিকল্পনায় সাংস্কৃতিক অবকাঠামোকে উপেক্ষা করে কেবল বাণিজ্যিকায়নের দিকে ঝুঁকে পড়া দীর্ঘমেয়াদে নগর জীবনের জন্য ক্ষতিকর। এ ধরনের সিদ্ধান্তের জন্য রাজউকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত।’

সরকার হারাবে শতকোটি টাকার রাজস্ব

রাজউকের একাধিক অথরাইজড কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্লট একত্রীকরণের ফলে এ জায়গার ওপর বড় পরিসরের বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সিটিজেন জার্নালের অনুসন্ধান ও শান্তা হোল্ডিংসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি তলার আয়তন ১২ হাজার বর্গফুট ধরে ৪০ তলা ভবনের মোট আয়তন দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট। বাণিজ্যিক হারে ওই জায়গা বিক্রি করা হলে এর আর্থিক পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে সিটিজেন জার্নাল কথা বলেছে শান্তা হোল্ডিংসের তেজগাঁও অফিসের বিক্রয় ব্যবস্থাপক মো. ইয়াসিন পাটওয়ারীর সঙ্গে। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ভবনটি ৩০ তলার অধিক হবে। প্রতিটি তলায় আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার স্কয়ার ফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া যাবে। শুরুতে প্রতি স্কয়ার ফুটের দাম ধরা হতে পারে প্রায় ৪০ হাজার টাকা।

সিটিজেন জার্নালের অনুসন্ধান ও শান্তা হোল্ডিংসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি তলার আয়তন ১২ হাজার বর্গফুট ধরে ৪০ তলা ভবনের মোট আয়তন দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট। বাণিজ্যিক হারে ওই জায়গা বিক্রি করা হলে এর আর্থিক পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা।

এতে বরাদ্দের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকার সম্ভাব্য বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। কারণ, নির্ধারিত শর্তে দেওয়া জমির ব্যবহার পরিবর্তনের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি হচ্ছে, তার পুরোটা রাষ্ট্রের রাজস্ব কাঠামোর আওতায় আসছে না।

/এসএ/