শিরোনাম

শৈশব কেড়ে নিচ্ছে স্ক্রিন, এ যেন ‘নীরব মহামারি’

নিজস্ব প্রতিবেদক
শৈশব কেড়ে নিচ্ছে স্ক্রিন, এ যেন ‘নীরব মহামারি’
মোবাইল ফোনে সময় কাটাচ্ছে একটি শিশু

একসময় মাগরিবের আজানের পর গলির মাথায় ব্যাডমিন্টনের নেট টাঙানো হতো, কোথাও ফুটবল, কোথাও ক্রিকেট, কোথাওবা লুকোচুরি খেলতে খেলতে হারিয়ে যেত শিশুরা। এখনও সেই অলি-গলিতে আলো জ্বলে, কিন্তু শিশুর কলরব শোনা যায় কম। বারান্দার ভেতরে, বিছানার কোণে, ডাইনিং টেবিলের পাশে কিংবা গাড়ির পেছনের সিটে– একটি নীলচে আলোয় ডুবে আছে ছোট ছোট মুখ। যেন পুরো শহর নিঃশব্দে বন্দি হয়ে গেছে এক অদৃশ্য পর্দার ভেতর। সব মিলিয়ে এই বাস্তবতাকে বলা যায় ‘নীরব মহামারি’।

ঢাকার শিশুদের জীবনে মোবাইল, টিভি বা কম্পিউটার স্ক্রিন এখন শুধু বিনোদন নয়; এটি অভ্যাস, নির্ভরতা, কখনো কখনো আসক্তি। আর সেই আসক্তি নিঃশব্দে বদলে দিচ্ছে তাদের ঘুম, মন, আচরণ, স্মৃতিশক্তি, এমনকী শৈশবও।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আসিডিডিআর,বি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ৬টি স্কুলের ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ শিশুর ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৩ শতাংশ শিশু প্রতিদিন ২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিভিন্ন ডিভাইসের স্ক্রিনে কাটায়। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, এই বয়সী শিশুদের দৈনিক বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম ২ ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিত নয়।

বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার শিশুরা গড়ে প্রতিদিন ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছে স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাব, কম্পিউটার ও গেমিং ডিভাইসে। কারও কারও ক্ষেত্রে সেই সময় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টাও ছুঁয়ে যাচ্ছে।

একসময় পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করত, ছাদে হাঁটত, ঈদের ছুটিতে গ্রামে যেত। এখন একই ঘরে বসেও সবাই আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ডুবে থাকে। শিশুরা কথা কম বলছে, চোখে চোখ রাখছে কম, বাস্তবের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি স্বস্তি খুঁজছে।

রংপুরের ১২ বছরের আল আদিবের গল্প যেন এই সময়ের প্রতীক। একসময় দিনে প্রায় ৯ ঘণ্টা মোবাইল ফোনে ডুবে থাকত সে। ফোন কেড়ে নিলে খেতে চাইত না, রেগে যেত, কখনো কখনো আক্রমণাত্মক আচরণ করত। ধীরে ধীরে বাইরে খেলাও বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তার স্কুলশিক্ষিকা মা সিফাত আরা ইসলাম ছেলেকে মাঠে ফেরাতে ক্রিকেট ব্যাট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন র‍্যাকেট, এমনকী ঘুড়িও কিনে দেন। অনেক চেষ্টার পর ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে পরিস্থিতি।

কিন্তু ঢাকার অসংখ্য পরিবারে সেই সুযোগও নেই। কারণ, এই শহরে শিশুদের জন্য মাঠ নেই– আছে কংক্রিটের দেয়াল, কোচিং সেন্টার, ব্যস্ত রাস্তা আর নিরাপত্তাহীনতার ভয়। শিশুরা খেলবে কোথায়?

আসিডিডিআর,বির গবেষক শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলছেন, দ্রুত নগরায়ণ, খেলাধুলার জায়গার সংকট এবং বাবা-মায়ের ব্যস্ততা শিশুদের ক্রমশ ঘরের ভেতরে বন্দি করে ফেলছে। বিকাল মানেই এখন প্রাইভেট, কোচিং, হোমওয়ার্ক। তারপর ক্লান্ত শরীর নিয়ে হাতে মোবাইল। এভাবেই তাদের পুরো দৈনন্দিন জীবন স্ক্রিনকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এই পরিবর্তনটা ঘটছে নিঃশব্দে।

একসময় পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করত, ছাদে হাঁটত, ঈদের ছুটিতে গ্রামে যেত। এখন একই ঘরে বসেও সবাই আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ডুবে থাকে। শিশুরা কথা কম বলছে, চোখে চোখ রাখছে কম, বাস্তবের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি স্বস্তি খুঁজছে।

ঢাকার ধানমন্ডির এক বাবা জানিয়েছেন, তার ১৩ বছরের ছেলে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। ফোন সরিয়ে নিলে সে এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে যে একদিন বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেয়। শিশুটির বাবা স্বীকার করেন, ছোটবেলায় খাওয়ানোর সময় তাকে শান্ত রাখতে মোবাইল ফোন ধরিয়ে দেওয়ার অভ্যাসই আজ অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, রিলস, ভিডিও আর মোবাইল গেমসের দ্রুত উদ্দীপনা শিশুদের মনোযোগ ও ধৈর্য কমিয়ে দিচ্ছে। বাস্তব জীবনের ধীর গতি তাদের কাছে এখন বিরক্তিকর মনে হয়। ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে। আচরণে বাড়ছে খিটখিটে ভাব, রাগ, অস্থিরতা।

গবেষণার তথ্যও ভয় ধরানো। স্ক্রিনে বেশি সময় কাটানো শিশুদের গড় ঘুম নেমে এসেছে ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টায়– যেখানে সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম। প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় ভুগছে। প্রতি তিনজনের একজন চোখের সমস্যায় আক্রান্ত। প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুর নিয়মিত মাথাব্যথা হয়। আর প্রতি পাঁচজনের দুইজন ভুগছে উদ্বেগ, অতিচঞ্চলতা, আবেগজনিত সংকট কিংবা আচরণগত সমস্যায়।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলছেন, মোবাইল-নির্ভরতার কারণে শিশুদের মধ্যে আগ্রাসী আচরণ, মনোযোগের ঘাটতি, ভাষা বিকাশে বিলম্ব ও আচরণগত সমস্যা বাড়ছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো– এই আসক্তির শিকড় অনেক সময় পরিবারেই তৈরি হচ্ছে। বাবা অফিস থেকে ফিরে ফোনে ব্যস্ত, মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে; শিশুটি তখন একা। সেই শূন্যতা পূরণ করছে স্ক্রিন। শিশুর সঙ্গে পরিবারের আবেগিক দূরত্ব যত বাড়ছে, ডিভাইসের সঙ্গে সম্পর্ক তত গভীর হচ্ছে।

তবু প্রযুক্তিকে শত্রু বানিয়ে ফেলতে বলছেন না বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এই যুগে প্রযুক্তি এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। তাহলে কী করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা সেই পরামর্শও দিয়েছেন। অভিভাবককে একটু সচেতন হতে হবে। আর স্ক্রিনে সময় কাটানোর সীমা নির্ধারণ করার সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে ভার্চুয়াল ও বাস্তব জীবনে কাটানোর সময়ের ভারসাম্য করার দিকে।

শিশুকে শুধু ‘ফোন দিও না’ বললেই হবে না, তাকে বিকল্পও দিতে হবে। গল্পের বই, ছাদের বাগান, বিকালের হাঁটা, পারিবারিক আড্ডা, খেলাধুলা– এসব ফিরিয়ে আনতে হবে। স্কুলগুলোয় খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। শহর পরিকল্পনায় শিশুদের জন্য খেলার মাঠকে বিলাসিতা নয়, মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখতে হবে। কারণ, একটি শহর তখনই সত্যিকার অর্থে অসুস্থ হয়ে পড়ে, যখন তার শিশুরা আকাশের দিকে তাকানো ভুলে যায়।

ঢাকার বহু শিশুর শৈশব এখন আঙুলের ডগায় বন্দি। তারা মাঠের ঘাস ছুঁতে জানে না, কিন্তু স্ক্রিন সোয়াইপ করতে জানে। তারা পাখির ডাক চিনতে পারে না, কিন্তু ইউটিউবের নোটিফিকেশন চিনে ফেলে মুহূর্তে। এই নীরব মহামারি তাই শুধু স্ক্রিন-আসক্তি নয়; এটি নীরবে হারিয়ে যেতে থাকা এক প্রজন্মেরও গল্প।

/আরএ/এফসি/