ইসলামী ব্যাংকে লুটপাট: দুদকের জালে এস আলমের সঙ্গীরা

ইসলামী ব্যাংকে লুটপাট: দুদকের জালে এস আলমের সঙ্গীরা
মরিয়ম সেঁজুতি

আমানতের সুরক্ষা, আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতায় এক সময়ে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ নেওয়ার নামে লুটপাট চালানোর কারণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকটি বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে।
ব্যাংকটিতে কীভাবে এই লুটপাট চালানো হয়েছে এবং এর নেপথ্যে কারা ছিলেন তার বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া লিখিত অভিযোগ ও দাপ্তরিক চিঠিপত্রে।
ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ঋণের নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করার বিষয়ে সম্প্রতি এই অভিযোগ দেওয়া হয় দুদকে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির উচ্চপদস্থ একদল কর্মকর্তার যোগসাজশে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকের এ টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করেছে।
ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বড় একটি অংশ এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এস আলম গ্রুপ ও এর কর্ণধার সাইফুল আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৫টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৫৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৬২ শতাংশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের এই বিশাল অনিয়মগুলো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
আর্থিক কেলেঙ্কারির এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে ব্যাংকটির কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট ও সম্পদ বিবরণী তলব করেছে দুদক।
এ বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. তানজির আহমেদ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঋণের নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং তা পাচারের অভিযোগের তদন্ত চলছে। তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। নতুন করে আরও কিছু তথ্য চেয়ে চিঠি ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে।
যেভাবে চলত লুটপাট
দুদকের কাছে পাঠানো অভিযোগ বিশ্লেষণে জানা যায়, এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত ব্যাংকের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এই লুটপাটে তাকে সহায়তা করেছে। তারা হলেন ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জে কিউ এম হাবিবুল্লাহ, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আকিজ উদ্দিন মো. সাব্বির, মিফতাহ উদ্দিন কাজী মো. রেজাউল করিম, মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং অগ্রণী ব্যাংকের পান্থপথ শাখার ব্যবস্থাপক (বর্তমানে প্রধান শাখায় কর্মরত) আবু নোমান মুহাম্মদ শামসুদ্দিন ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আকিজ উদ্দিন প্রথমে এস আলমের পিএস ছিলেন। নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এস আলম তাকে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে তিনি ডিএমডি হন। মূলত তিনিই ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এস আলম গ্রুপের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা করতেন। বিনিময়ে তিনি ১ শতাংশ হারে কমিশন নিতেন। তার মাধ্যমেই সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং দুবাইতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে।
আকিজ উদ্দিনসহ অভিযুক্ত বেশিরভাগ কর্মকর্তা দেশের বাইরে থাকায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসলামী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত ৯ বছরে নামসর্বস্ব ও বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া ঋণ নেওয়ার ঘটনার আংশিক চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ঋণের বিষয়ে ইতোমধ্যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সীমার মধ্যে নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে দেওয়ানি এবং অনিয়মের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে ২৪টি এবং এনআই অ্যাক্টে ৩৬৮টি মামলা হয়েছে।
পর্দার আড়ালে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা
লুটপাটের এই অপতৎপরতায় কেবল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই নন, বরং ব্যাংকের অর্থ পাচার প্রতিরোধ কর্মকর্তা তাহের আহমেদ চৌধুরী এবং ইসলামী ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল নজরুল ইসলামের নামও উঠে এসেছে।
এ ছাড়া আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক থেকেও কয়েক শ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। তিনি দুদকের মামলা ও গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে বারবার বিভিন্ন ব্যাংকে প্রভাবশালী পদে আসীন হয়েছেন।
দুদকের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আব্দুল্লাহ আল মামুন এর আগে জনতা ব্যাংক থেকে ভুয়া রপ্তানি বিল দেখিয়ে ৬৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া একই ব্যাংক থেকে টাকা আত্মসাতের ঘটনায় মেসার্স ক্রিসেন্ট ক্রোকারিজের চেয়ারম্যানসহ ১৫ কর্মকর্তার নামে দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ভুয়া রপ্তানি বিল দেখিয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন ৫২২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এ বিষয়ে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান আরা ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেন।
আব্দুল্লাহ আল মামুন অগ্রনী ব্যাংকে জিএম হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান তার দুর্নীতির ফিরিস্তি দেখে যোগদান করতে বাধা দেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানার পরে তার নিয়োগ বাতিল করে এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। তখন এস আলমের পিএস আকিজ উদ্দিনের নজরে আসেন তিনি। এরপর এস আলমের বিশ্বস্ত লোক হিসেবে তাকে ইসলামী ব্যাংকে ডিএমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংকের টাকা আত্মসাতে এস আলম গ্রুপকে সহায়তা করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল্লাহ আল মামুন মুঠোফোনে সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি ইসলামী ব্যাংকের অপারেশন শাখায় কর্মরত ছিলাম। লোন সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো ফাইলে আমার সই নেই। আমি কিছুই করিনি।’
অগ্রণী এবং জনতা ব্যাংকে থাকা অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এমন কোনো কাজ করিনি এবং আমার বিষয়ে কোনো অভিযোগ নেই।’
তবে অগ্রণী এবং জনতা ব্যাংকে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, আব্দুল্লাহ আল মামুন এই দুই ব্যাংকে কর্মরত থাকাকালীন যেসব ঋণ বিতরণ করেছেন তার বেশিরভাগই অনাদায়ী। অগ্রণী ব্যাংকের একজন ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি ব্যাংকে থাকাকালীন উল্টাপাল্টা প্রজেক্টনির্ভর লোন দিয়েছেন, যার বেশিরভাগই আদায়যোগ্য নয়।
এ ছাড়া আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে অগ্রনী ব্যাংকের পান্থপথ শাখার ব্যবস্থাপক আবু নোমান মুহাম্মদ শামসুদ্দিনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে আবু নোমান মুহাম্মদ শামসুদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি পান্থপথ শাখা থেকে বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান শাখায় চলে এসেছি। এ বিষয়ে রবিবার (১০ মে) দুদক থেকে আমাকে ডাকা হয়েছিল। আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি এ বিষয়ে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই।’ তিনি দাবি করেন, ‘যে ঋণের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে তা প্রায় ৭-৮ বছর আগের, যখন আমি মাত্র অগ্রণী ব্যাংকে যোগদান করেছি। তিনি আরও বলেন, অগ্রণী ব্যাংকে এস আলমের কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া নেই। সুতরাং এ বিষয়ে আমি কিভাবে সম্পৃক্ত হলাম।’
এ ছাড়া অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য ইসলামী ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলে তিনি ধরেননি। একই নম্বরের হোয়াটস অ্যাপে এই প্রতিবেদক নিজের পরিচয় জানিয়ে তার বক্তব্যের জন্য সময় চেয়ে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
দুদকের পদক্ষেপ
এই বিশাল দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে ইস্যু করা একটি দাপ্তরিক চিঠিতে দেখা যায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের জন্য ‘দৈনিক ও সাম্প্রতিক অভিযোগ সেলে’ পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংক ও এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের যে ২ হাজার কোটি টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করেছে-সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শেয়ারাবাজারে ‘এ’ থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে
আর্থিক দুরবস্থার কারণে ব্যাংকটিকে সম্প্রতি ‘এ’ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
গ্রাহকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
ঋণ নেওয়ার কথা বলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের কারণে ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। এতে গ্রাহকেরা তাদের আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ আত্মসাৎ করে দেশের বাইরে বিলাসি জীবনযাপন করছে। এ অবস্থায় নতুন সরকারের কাছে ব্যাংকিং খাতে শুদ্ধি অভিযান শুরুর দাবি সাধারণ মানুষের। তাদের দাবি, এই মহালুটপাটের হিসাব এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক।

আমানতের সুরক্ষা, আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতায় এক সময়ে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ নেওয়ার নামে লুটপাট চালানোর কারণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকটি বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে।
ব্যাংকটিতে কীভাবে এই লুটপাট চালানো হয়েছে এবং এর নেপথ্যে কারা ছিলেন তার বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া লিখিত অভিযোগ ও দাপ্তরিক চিঠিপত্রে।
ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ঋণের নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করার বিষয়ে সম্প্রতি এই অভিযোগ দেওয়া হয় দুদকে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির উচ্চপদস্থ একদল কর্মকর্তার যোগসাজশে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকের এ টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করেছে।
ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বড় একটি অংশ এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এস আলম গ্রুপ ও এর কর্ণধার সাইফুল আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৫টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৫৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৬২ শতাংশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের এই বিশাল অনিয়মগুলো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
আর্থিক কেলেঙ্কারির এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে ব্যাংকটির কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট ও সম্পদ বিবরণী তলব করেছে দুদক।
এ বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. তানজির আহমেদ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঋণের নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং তা পাচারের অভিযোগের তদন্ত চলছে। তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। নতুন করে আরও কিছু তথ্য চেয়ে চিঠি ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে।
যেভাবে চলত লুটপাট
দুদকের কাছে পাঠানো অভিযোগ বিশ্লেষণে জানা যায়, এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত ব্যাংকের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এই লুটপাটে তাকে সহায়তা করেছে। তারা হলেন ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জে কিউ এম হাবিবুল্লাহ, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আকিজ উদ্দিন মো. সাব্বির, মিফতাহ উদ্দিন কাজী মো. রেজাউল করিম, মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং অগ্রণী ব্যাংকের পান্থপথ শাখার ব্যবস্থাপক (বর্তমানে প্রধান শাখায় কর্মরত) আবু নোমান মুহাম্মদ শামসুদ্দিন ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আকিজ উদ্দিন প্রথমে এস আলমের পিএস ছিলেন। নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এস আলম তাকে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে তিনি ডিএমডি হন। মূলত তিনিই ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এস আলম গ্রুপের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা করতেন। বিনিময়ে তিনি ১ শতাংশ হারে কমিশন নিতেন। তার মাধ্যমেই সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং দুবাইতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে।
আকিজ উদ্দিনসহ অভিযুক্ত বেশিরভাগ কর্মকর্তা দেশের বাইরে থাকায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসলামী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত ৯ বছরে নামসর্বস্ব ও বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া ঋণ নেওয়ার ঘটনার আংশিক চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ঋণের বিষয়ে ইতোমধ্যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সীমার মধ্যে নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে দেওয়ানি এবং অনিয়মের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে ২৪টি এবং এনআই অ্যাক্টে ৩৬৮টি মামলা হয়েছে।
পর্দার আড়ালে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা
লুটপাটের এই অপতৎপরতায় কেবল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই নন, বরং ব্যাংকের অর্থ পাচার প্রতিরোধ কর্মকর্তা তাহের আহমেদ চৌধুরী এবং ইসলামী ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল নজরুল ইসলামের নামও উঠে এসেছে।
এ ছাড়া আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক থেকেও কয়েক শ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। তিনি দুদকের মামলা ও গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে বারবার বিভিন্ন ব্যাংকে প্রভাবশালী পদে আসীন হয়েছেন।
দুদকের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আব্দুল্লাহ আল মামুন এর আগে জনতা ব্যাংক থেকে ভুয়া রপ্তানি বিল দেখিয়ে ৬৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া একই ব্যাংক থেকে টাকা আত্মসাতের ঘটনায় মেসার্স ক্রিসেন্ট ক্রোকারিজের চেয়ারম্যানসহ ১৫ কর্মকর্তার নামে দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ভুয়া রপ্তানি বিল দেখিয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন ৫২২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এ বিষয়ে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান আরা ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেন।
আব্দুল্লাহ আল মামুন অগ্রনী ব্যাংকে জিএম হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান তার দুর্নীতির ফিরিস্তি দেখে যোগদান করতে বাধা দেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানার পরে তার নিয়োগ বাতিল করে এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। তখন এস আলমের পিএস আকিজ উদ্দিনের নজরে আসেন তিনি। এরপর এস আলমের বিশ্বস্ত লোক হিসেবে তাকে ইসলামী ব্যাংকে ডিএমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংকের টাকা আত্মসাতে এস আলম গ্রুপকে সহায়তা করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল্লাহ আল মামুন মুঠোফোনে সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি ইসলামী ব্যাংকের অপারেশন শাখায় কর্মরত ছিলাম। লোন সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো ফাইলে আমার সই নেই। আমি কিছুই করিনি।’
অগ্রণী এবং জনতা ব্যাংকে থাকা অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এমন কোনো কাজ করিনি এবং আমার বিষয়ে কোনো অভিযোগ নেই।’
তবে অগ্রণী এবং জনতা ব্যাংকে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, আব্দুল্লাহ আল মামুন এই দুই ব্যাংকে কর্মরত থাকাকালীন যেসব ঋণ বিতরণ করেছেন তার বেশিরভাগই অনাদায়ী। অগ্রণী ব্যাংকের একজন ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি ব্যাংকে থাকাকালীন উল্টাপাল্টা প্রজেক্টনির্ভর লোন দিয়েছেন, যার বেশিরভাগই আদায়যোগ্য নয়।
এ ছাড়া আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে অগ্রনী ব্যাংকের পান্থপথ শাখার ব্যবস্থাপক আবু নোমান মুহাম্মদ শামসুদ্দিনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে আবু নোমান মুহাম্মদ শামসুদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি পান্থপথ শাখা থেকে বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান শাখায় চলে এসেছি। এ বিষয়ে রবিবার (১০ মে) দুদক থেকে আমাকে ডাকা হয়েছিল। আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি এ বিষয়ে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই।’ তিনি দাবি করেন, ‘যে ঋণের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে তা প্রায় ৭-৮ বছর আগের, যখন আমি মাত্র অগ্রণী ব্যাংকে যোগদান করেছি। তিনি আরও বলেন, অগ্রণী ব্যাংকে এস আলমের কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া নেই। সুতরাং এ বিষয়ে আমি কিভাবে সম্পৃক্ত হলাম।’
এ ছাড়া অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য ইসলামী ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলে তিনি ধরেননি। একই নম্বরের হোয়াটস অ্যাপে এই প্রতিবেদক নিজের পরিচয় জানিয়ে তার বক্তব্যের জন্য সময় চেয়ে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
দুদকের পদক্ষেপ
এই বিশাল দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে ইস্যু করা একটি দাপ্তরিক চিঠিতে দেখা যায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের জন্য ‘দৈনিক ও সাম্প্রতিক অভিযোগ সেলে’ পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংক ও এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের যে ২ হাজার কোটি টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করেছে-সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শেয়ারাবাজারে ‘এ’ থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে
আর্থিক দুরবস্থার কারণে ব্যাংকটিকে সম্প্রতি ‘এ’ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
গ্রাহকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
ঋণ নেওয়ার কথা বলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের কারণে ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। এতে গ্রাহকেরা তাদের আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ আত্মসাৎ করে দেশের বাইরে বিলাসি জীবনযাপন করছে। এ অবস্থায় নতুন সরকারের কাছে ব্যাংকিং খাতে শুদ্ধি অভিযান শুরুর দাবি সাধারণ মানুষের। তাদের দাবি, এই মহালুটপাটের হিসাব এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক।

ইসলামী ব্যাংকে লুটপাট: দুদকের জালে এস আলমের সঙ্গীরা
মরিয়ম সেঁজুতি

আমানতের সুরক্ষা, আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতায় এক সময়ে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ নেওয়ার নামে লুটপাট চালানোর কারণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকটি বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে।
ব্যাংকটিতে কীভাবে এই লুটপাট চালানো হয়েছে এবং এর নেপথ্যে কারা ছিলেন তার বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া লিখিত অভিযোগ ও দাপ্তরিক চিঠিপত্রে।
ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ঋণের নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করার বিষয়ে সম্প্রতি এই অভিযোগ দেওয়া হয় দুদকে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির উচ্চপদস্থ একদল কর্মকর্তার যোগসাজশে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকের এ টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করেছে।
ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বড় একটি অংশ এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এস আলম গ্রুপ ও এর কর্ণধার সাইফুল আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৫টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৫৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৬২ শতাংশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের এই বিশাল অনিয়মগুলো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
আর্থিক কেলেঙ্কারির এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে ব্যাংকটির কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট ও সম্পদ বিবরণী তলব করেছে দুদক।
এ বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. তানজির আহমেদ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঋণের নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং তা পাচারের অভিযোগের তদন্ত চলছে। তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। নতুন করে আরও কিছু তথ্য চেয়ে চিঠি ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে।
যেভাবে চলত লুটপাট
দুদকের কাছে পাঠানো অভিযোগ বিশ্লেষণে জানা যায়, এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত ব্যাংকের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এই লুটপাটে তাকে সহায়তা করেছে। তারা হলেন ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জে কিউ এম হাবিবুল্লাহ, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আকিজ উদ্দিন মো. সাব্বির, মিফতাহ উদ্দিন কাজী মো. রেজাউল করিম, মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং অগ্রণী ব্যাংকের পান্থপথ শাখার ব্যবস্থাপক (বর্তমানে প্রধান শাখায় কর্মরত) আবু নোমান মুহাম্মদ শামসুদ্দিন ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আকিজ উদ্দিন প্রথমে এস আলমের পিএস ছিলেন। নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এস আলম তাকে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে তিনি ডিএমডি হন। মূলত তিনিই ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এস আলম গ্রুপের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা করতেন। বিনিময়ে তিনি ১ শতাংশ হারে কমিশন নিতেন। তার মাধ্যমেই সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং দুবাইতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে।
আকিজ উদ্দিনসহ অভিযুক্ত বেশিরভাগ কর্মকর্তা দেশের বাইরে থাকায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসলামী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত ৯ বছরে নামসর্বস্ব ও বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া ঋণ নেওয়ার ঘটনার আংশিক চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ঋণের বিষয়ে ইতোমধ্যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সীমার মধ্যে নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে দেওয়ানি এবং অনিয়মের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে ২৪টি এবং এনআই অ্যাক্টে ৩৬৮টি মামলা হয়েছে।
পর্দার আড়ালে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা
লুটপাটের এই অপতৎপরতায় কেবল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই নন, বরং ব্যাংকের অর্থ পাচার প্রতিরোধ কর্মকর্তা তাহের আহমেদ চৌধুরী এবং ইসলামী ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল নজরুল ইসলামের নামও উঠে এসেছে।
এ ছাড়া আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক থেকেও কয়েক শ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। তিনি দুদকের মামলা ও গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে বারবার বিভিন্ন ব্যাংকে প্রভাবশালী পদে আসীন হয়েছেন।
দুদকের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আব্দুল্লাহ আল মামুন এর আগে জনতা ব্যাংক থেকে ভুয়া রপ্তানি বিল দেখিয়ে ৬৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া একই ব্যাংক থেকে টাকা আত্মসাতের ঘটনায় মেসার্স ক্রিসেন্ট ক্রোকারিজের চেয়ারম্যানসহ ১৫ কর্মকর্তার নামে দুদকের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ভুয়া রপ্তানি বিল দেখিয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন ৫২২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এ বিষয়ে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান আরা ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেন।
আব্দুল্লাহ আল মামুন অগ্রনী ব্যাংকে জিএম হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান তার দুর্নীতির ফিরিস্তি দেখে যোগদান করতে বাধা দেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানার পরে তার নিয়োগ বাতিল করে এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। তখন এস আলমের পিএস আকিজ উদ্দিনের নজরে আসেন তিনি। এরপর এস আলমের বিশ্বস্ত লোক হিসেবে তাকে ইসলামী ব্যাংকে ডিএমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংকের টাকা আত্মসাতে এস আলম গ্রুপকে সহায়তা করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল্লাহ আল মামুন মুঠোফোনে সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি ইসলামী ব্যাংকের অপারেশন শাখায় কর্মরত ছিলাম। লোন সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো ফাইলে আমার সই নেই। আমি কিছুই করিনি।’
অগ্রণী এবং জনতা ব্যাংকে থাকা অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এমন কোনো কাজ করিনি এবং আমার বিষয়ে কোনো অভিযোগ নেই।’
তবে অগ্রণী এবং জনতা ব্যাংকে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, আব্দুল্লাহ আল মামুন এই দুই ব্যাংকে কর্মরত থাকাকালীন যেসব ঋণ বিতরণ করেছেন তার বেশিরভাগই অনাদায়ী। অগ্রণী ব্যাংকের একজন ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি ব্যাংকে থাকাকালীন উল্টাপাল্টা প্রজেক্টনির্ভর লোন দিয়েছেন, যার বেশিরভাগই আদায়যোগ্য নয়।
এ ছাড়া আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে অগ্রনী ব্যাংকের পান্থপথ শাখার ব্যবস্থাপক আবু নোমান মুহাম্মদ শামসুদ্দিনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে আবু নোমান মুহাম্মদ শামসুদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি পান্থপথ শাখা থেকে বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান শাখায় চলে এসেছি। এ বিষয়ে রবিবার (১০ মে) দুদক থেকে আমাকে ডাকা হয়েছিল। আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি এ বিষয়ে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই।’ তিনি দাবি করেন, ‘যে ঋণের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে তা প্রায় ৭-৮ বছর আগের, যখন আমি মাত্র অগ্রণী ব্যাংকে যোগদান করেছি। তিনি আরও বলেন, অগ্রণী ব্যাংকে এস আলমের কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া নেই। সুতরাং এ বিষয়ে আমি কিভাবে সম্পৃক্ত হলাম।’
এ ছাড়া অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য ইসলামী ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলে তিনি ধরেননি। একই নম্বরের হোয়াটস অ্যাপে এই প্রতিবেদক নিজের পরিচয় জানিয়ে তার বক্তব্যের জন্য সময় চেয়ে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
দুদকের পদক্ষেপ
এই বিশাল দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে ইস্যু করা একটি দাপ্তরিক চিঠিতে দেখা যায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের জন্য ‘দৈনিক ও সাম্প্রতিক অভিযোগ সেলে’ পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংক ও এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের যে ২ হাজার কোটি টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করেছে-সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শেয়ারাবাজারে ‘এ’ থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে
আর্থিক দুরবস্থার কারণে ব্যাংকটিকে সম্প্রতি ‘এ’ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
গ্রাহকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
ঋণ নেওয়ার কথা বলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের কারণে ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। এতে গ্রাহকেরা তাদের আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ আত্মসাৎ করে দেশের বাইরে বিলাসি জীবনযাপন করছে। এ অবস্থায় নতুন সরকারের কাছে ব্যাংকিং খাতে শুদ্ধি অভিযান শুরুর দাবি সাধারণ মানুষের। তাদের দাবি, এই মহালুটপাটের হিসাব এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক।




