শিরোনাম

হকারের দখলে পদচারী সেতু, দুর্ভোগ পথচারীর

হকারের দখলে পদচারী সেতু, দুর্ভোগ পথচারীর
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার পদচারী সেতুতে হকাররা দোকান নিয়ে বসেছে। এতে চলাচল করতে সমস্যা হচ্ছে পথচারীদের। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পদচারী সেতু (ফুটওভার ব্রিজ) এখন হকারদের দখলে চলে গেছে। ফলে চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পথচারীরা। পাশাপাশি এসব সেতু ব্যবহার করতে গিয়ে তাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ঝক্কি এড়াতে অনেকে সেতু ব্যবহার করছেন না, বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়ক দিয়ে চলাচল করছেন।

পথচারীদের অভিযোগ, হকাররা পদচারী সেতুর হাঁটার পথ দখল করে দোকান দিলেও প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এতে সেতু দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে তাদের সমস্যা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে পদচারী সেতুর সংখ্যা শতাধিক। দুর্ঘটনা কমাতে এবং পথচারীদের চলাচলের সুবিধার জন্য সরকার বিভিন্ন সময় এসব সেতু নির্মাণ করে।

পদচারী সেতুগুলোর অবস্থা সম্পর্কে জানতে এই প্রতিবেদক গত বৃহস্পতি ও গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এই বিশৃঙ্খলার চিত্র দেখতে পান।

রাজধানীর ফার্মগেট, ভাটারা, নিউমার্কেট, শ্যামলী, পরীবাগ এবং শাহবাগসহ বেশ কিছু এলাকার সেতুগুলোর দুই-তৃতীয়াংশ অংশই হকারদের দখলে। কাপড়ের দোকান, প্রসাধনী, খেলনা থেকে শুরু করে হরেক রকমের মুখরোচক খাবারের পসরাও সাজিয়ে বসেছে হকাররা। ফলে প্রশস্ত এই সেতুগুলোতে হাঁটার পথ অনেক সরু হয়ে গেছে।

​পদচারী দিয়ে হাঁটার সময় দেখা যায়, পথচারীরা একে অপরের গায়ে ধাক্কা খাচ্ছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু এবং বয়স্কদের বেশি সমস্যা হচ্ছে। সেতুর ওপরের ভিড় এড়াতে অনেক পথচারীকে নিচের সড়ক দিয়ে দৌড়ে পার হতে দেখা গেছে।

পরীবাগ এবং শাহবাগ মোড়ের বারডেম জেনারেল হাসপাতাল সংলগ্ন পদচারী সেতু চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সেতুগুলো মেরামতের কাজ চলছে।

পথচারীদের ক্ষোভ

নিউমার্কেট এলাকায় পল্লব মাহমুদ নামের একজন পথচারী জানান, নিউমার্কেটের পদচারী সেতু পারাপারে স্বাভাবিকভাবে ২ মিনিট সময় লাগার কথা। কিন্তু হকাররা দোকান নিয়ে বসায় পারাপার হতে ৫ থেকে ৭ মিনিট সময় লাগছে। তিনি আরও বরেন, ‘ফুটওভার ব্রিজে ভিড়ের কারণে আমি প্রায়ই সময় বাঁচানোর জন্য ঝুঁকি নিয়ে মূল রাস্তা দিয়েই এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাই।’

ফার্মগেটের পদচারী সেতুর ওপর কথা হয় আরেক পথচারী তানবীন আহমেদের সঙ্গে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ব্রিজ করা হয়েছে মানুষের সহজে রাস্তা পারাপারের জন্য, ব্যবসা করার জন্য নয়। এখানে হাঁটার জায়গা নেই, অথচ প্রশাসন আর সিটি করপোরেশনের কোনো নজরদারি নেই।’

হকারদের বক্তব্য

ফার্মগেট পদচারী সেতুতে দোকান নিয়ে বসেছেন মো. আক্তার হোসেন নামের একজন হকার। সেতুর ওপর দোকান দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাস্তায় বসার জায়গা না পাওয়ায় আমরা বাধ্য হয়ে এখানে বসি। পেটের তাগিদেই ব্যবসা করতে হয়। ​তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ মাঝে মাঝে উচ্ছেদ করে, কিন্তু আমরা আবার চলে আসি। কারণ অন্য কোথাও বসলে বিক্রি হয় না। মানুষ যেহেতু ব্রিজ দিয়ে হাঁটে, তাই এখানে কিছু বিক্রি করতে পারি।’

নিউমার্কেট পদচারী সেতুতে দোকান নিয়ে বসা কামাল নামের আরেকজন হকার বলেন, ‘আমরাও বুঝি, দোকান নিয়ে বসায় পথচারীদের কষ্ট হয়। কিন্তু দিন শেষে পেটের দায় বড় কথা। সারা দিনে যা আয় করি, তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে।’

নিউমার্কেট এলাকার পদচারী সেতুর দুই পাশ দখল করে দোকান নিয়ে বসেছে হকাররা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
নিউমার্কেট এলাকার পদচারী সেতুর দুই পাশ দখল করে দোকান নিয়ে বসেছে হকাররা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

শ্যামলী মোড়ের পদচারী সেতুতে দোকান নিয়ে বসা একজন হকার বলেন, ‘আমরা চাই না, মানুষের চলাচলে সমস্যা হোক। কিন্তু বড় দোকান ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই ছোট দোকান নিয়ে এখানে বসে ব্যবসা করছি।’ ব্যবসা করতে কাউকে চাঁদা দেওয়া লাগে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চাঁদা দেওয়া লাগছে। তবে বর্তমানে কোনো চাঁদা দিই না।’

সেতু হকারমুক্ত রাখার পরামর্শ

নগরপরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজগুলো শহরের জরুরি অবকাঠামোর অংশ। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। ফুটওভার ব্রিজে যারা ব্যবসা করেন, তাদের বিষয়ে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণের নিরাপদ চলাচলের স্বার্থে সব ফুটওভার ব্রিজ সারা বছর হকারমুক্ত রাখা জরুরি।’

ড. আদিল মুহাম্মদ বলেন, যেসব পদচারী সেতু ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সেগুলো দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। ফুটওভার ব্রিজ হকারদের দখলের কারণে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে সরাসরি সড়ক পার হন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা হকারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো এবং ফুটওভার ব্রিজে তাদের বসতে দেওয়া হবে না। তবে উচ্ছেদের পর তারা আবারও ফিরে আসে কি না, সেটি নিশ্চিত করতে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যেসব এলাকায় ফুটওভার ব্রিজ দখল করে হকাররা বসছে, সেসব এলাকার মার্কেট ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্ব রয়েছে তাদের সেখানে বসতে নিরুৎসাহিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ব্যবসায়ীও এ বিষয়ে নীরব থাকছেন।

সংস্কার কাজ চলায় শাহবাগ মোড়ের বারডেম হাসপাতাল সংলগ্ন পদচারী সেতু বন্ধ রয়েছে। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
সংস্কার কাজ চলায় শাহবাগ মোড়ের বারডেম হাসপাতাল সংলগ্ন পদচারী সেতু বন্ধ রয়েছে। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

ঝুঁকিপূর্ণ পদচারী সেতুগুলো পর্যায়ক্রমে সংস্কার করা হবে মন্তব্য করে ডিএসসিসির এই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫টি ফুটওভার ব্রিজ রয়েছে। যেসব ফুটওভার ব্রিজের কাঠামোগত ফিটনেস নষ্ট হয়ে গেছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে সংস্কার করা হবে। ইতোমধ্যে ৭টি ফুটওভার ব্রিজ সংস্কারের জন্য টেন্ডার দেওয়া হয়েছে এবং সংস্কার কাজও শুরু হয়েছে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামানের কাছে মুঠোফোনে পদচারী সেতুগুলো হকারমুক্ত করা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।

/বিবি/