শিরোনাম

প্রশাসনের গাফিলতিতে বেড়েছে ইলেকট্রিক শকে মাছ শিকার

সোহেল রানা
প্রশাসনের গাফিলতিতে বেড়েছে ইলেকট্রিক শকে মাছ শিকার
রায়পুরা উপজেলার মহিষবেড় গ্রামের মেঘনা নদীর ঘাটে বাধা নৌকাগুলো। এসব নৌকা ব্যবহার করে রাতের অন্ধকারে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ শিকার করে জেলেরা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

মেঘনা নদীতে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ শিকার বেড়ে গেছে। অল্প সময় ও কম পরিশ্রমে প্রচুর মাছ ধরা যায়। এ কারণে এই পদ্ধতিতে মাছ ধরছে অসাধু জেলেরা। তবে এই পদ্ধতিতে মাছ শিকারের ফলে রেণু-পোনা, মাছের ডিম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মারা পড়ছে নানা প্রজাতির জলজ প্রাণী। সাধারণ জেলে ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সরকারের কাছে দ্রুত এই পদ্ধতিতে মাছ ধরা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় কয়েকজন জেলে বলেন, ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ ধরতে জেলেরা চিকন বাঁশ অথবা প্লাস্টিক পাইপের সঙ্গে ইলেকট্রিক তার যুক্ত করেন। সেই তার ব্যাটারি ও ইনভার্টারের (বিদ্যুৎ শক্তি কমানো-বাড়ানোর যন্ত্র) সঙ্গে যুক্ত থাকে। সেখান থেকে দুইটি বৈদ্যুতিক তার বের করে একটি পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। অপর তারটি প্লাস্টিক ওই পাইপের সঙ্গে যুক্ত থাকে। বিদ্যুৎতায়িত পাইপটি যখন নদীর পানিতে ফেলা হয় তখন ৫ থেকে ৭ ফুট দূরে মাছগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠা মাছগুলো পরে ‘স্টিক জাল’ দিয়ে নৌকায় তোলা হয়। এ পদ্ধতিতে মাছ শিকারের কারণে সাপ-ব্যাঙসহ অন্যান্য জলজপ্রাণীও মারা পড়ে।

এ বিষয়ে মহিষবেড় এলাকার জেলে শওকত মিয়া সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আমি ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে মেঘনা নদীতে মাছ ধরি। ইলেকট্রিক শক আর গ্যাস দিয়ে মাছ শিকার করার ফলে বর্তমানে আমরা নদীতে তেমন মাছ পাই না। ইলেক্টিক শকে ছোট মাছসহ ডিম ধ্বংস হচ্ছে।

নৌকায় রাখা স্টিক জাল। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
নৌকায় রাখা স্টিক জাল। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

মেঘনা নদীর পাড়ের বাসিন্দারা বলেন, নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার শ্রীনগর, চংপাড়া, মহিশবেড়, মল্লিকপুর, বাঘাইকান্দি, বেলুয়ারচর এলাকার অসাধু জেলেরা ইলেকট্রিক শক দিয়ে প্রতিনিয়ত মাছ শিকার করে আসছেন। স্থানীয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।

রায়পুরা উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামের বাসিন্দা আক্তারুজ্জামান বলেন, মেঘনায় সন্ধ্যা হলেই অসাধু জেলেরা নৌকা নিয়ে বের হয় এবং ইলেকট্রিক বিভিন্ন ডিভাইস দিয়ে মাছ ধরা শুরু করে। মহিষবেড় গ্রামের ৮-১০ জন জেলে কয়েকটি নৌকা নিয়ে এভাবে নিয়মিত মাছ ধরেন। এটি বন্ধ করতে ইলেকট্রিক ডিভাইসের বিক্রি বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নদীতে অভিযান চালাতে হবে।

পরিবেশ ও জলবায়ু কর্মী বালাক রাসেল বলেন, রাতে মেঘনায় ‘স্টিক জাল’ নিয়ে শতাধিক অসাধু জেলেরা মাছ শিকারে বেরিয়ে পড়েন। তারা নির্বিচারে মাছের পোনাসহ অসংখ্য জলজ প্রাণীদের হত্যা করছে।

স্টিক জালের তার
স্টিক জালের তার

‘স্টিক জাল’ কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, জালটা থলের মতো। আম পাড়ার সময় যে ধরনের থলে ব্যবহার করা হয় ঠিক সেটার মতোই দেখতে। ‘স্টিক জাল’ পরিবেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। এটি কারেন্ট জাল থেকেও ভয়ংকর। অবিলম্বে এই ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত সবাইকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা উচিত।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নরসিংদীর সভাপতি মঈনুল ইসলাম বলেন, আইনগত বিধিনিষেধ তো আছেই। কিন্তু পরিবেশ ও মৎস্য অধিদপ্তরের কোনো তদারকি নেই। এ কারণেই ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ ধরার সুযোগ পাচ্ছে অসাধু জেলেরা।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ সামসুল মোমেন পলাশ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এভাবে মাছ ধরে অনেক উপকারী জলজপ্রাণী হত্যা করা হচ্ছে। দ্রুত এই অপতৎপরতা বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

চায়না দুয়ারী জাল। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
চায়না দুয়ারী জাল। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রায়পুরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, মেঘনা নদীতে ইলেক্টিক শক দিয়ে মাছ ধরা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নরসিংদী জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বদরুল হুদা বলেন, ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছ ধরা বন্ধে মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিকা দাস সিটিজেন জার্নালকে বলেন, মেঘনা নদীর বেশিভাগ অংশই নরসিংদীর রায়পুরায়। রায়পুরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া আছে। ইতোমধ্যে ইলেট্রিক শক দিয়ে মাছ ধরার অপরাধে বেশ কয়েকজনকে সাজা দেওয়া হয়েছে।

/এসআর/