ট্রাম্প ফিরে যেতেই পুতিনের চীন সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ

সিটিজেন ডেস্ক
সিটিজেন ডেস্ক
ট্রাম্প ফিরে যেতেই পুতিনের চীন সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের এক সপ্তাহ না পেরোতেই চীন সফরে যাচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মঙ্গলবার (১৯ মে) শুরু হতে যাওয়া দুই দিনের এ সফরকে সাধারণ কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখছেন না আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এটি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন শক্তির ভারসাম্য এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন-রাশিয়া সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয় ক্রেমলিন জানিয়েছে, সফরে পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব’ আরও শক্তিশালী করার বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নানা ইস্যুতেও মতবিনিময় হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সফরের সময়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছিল। ফলে পুতিনের সফরকে অনেকেই দেখছেন বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবে– যেখানে চীন একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করছে না, আবার অন্যদিকে মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও বজায় রাখছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ পুতিনের এই সফর

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের চীন সফরে বড় কোনো অগ্রগতি না হলেও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। তাইওয়ান, ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিরল খনিজ সম্পদ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে শি জিনপিং কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি সতর্ক করেন, এ বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্ত সংঘাত তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্পও তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে নন বলে মন্তব্য করেন এবং তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেন। এসব বিষয়কে চীনের জন্য ইতিবাচক কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে পুতিনের চীন সফর এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বেইজিং এখনও মস্কোকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।

বর্তমানে চীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি। জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি ও ডিজিটাল অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বেড়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

রাশিয়ার জন্য চীনের গুরুত্ব বেড়েছে

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে মস্কো। এরপর থেকে রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে।

বর্তমানে চীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি। জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি ও ডিজিটাল অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বেড়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

পশ্চিমা বাজারে সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার পর চীনের বাজার রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্পে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থাও গড়ে তুলছে দুই দেশ।

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, পুতিনের এই সফরের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো– এটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রতীকী বার্তা। চীন ও রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলে আসছে, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলোর একক আধিপত্য থাকবে না।

সীমাহীন অংশীদারত্ব কতটা গভীর

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে চীন ও রাশিয়া নিজেদের সম্পর্ককে ‘নো-লিমিটস পার্টনারশিপ’ বা সীমাহীন অংশীদারত্ব হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার সমালোচনায় দুই দেশ আরও কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্কটি পুরোপুরি সমান নয়। বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়া অনেক বেশি চীনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ সম্পর্ককে অনেকেই ‘অসম কিন্তু প্রয়োজনীয় অংশীদারত্ব’ হিসেবে দেখছেন।

চীন প্রকাশ্যে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সমর্থন না দিলেও পশ্চিমা অবস্থানের সমালোচনা করেছে। বেইজিং কখনও রাশিয়ার অভিযানের নিন্দা করেনি। বরং ন্যাটোর সম্প্রসারণকে সংঘাতের একটি কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও নতুন ভূরাজনৈতিক হিসাব

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাও বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে পরিস্থিতি চীন ও রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে।

একদিকে রাশিয়া জ্বালানি বাজারে সুবিধা পেতে পারে, অন্যদিকে চীন নিজেকে স্থিতিশীল ও দায়িত্বশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ফলে পুতিনের বেইজিং সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যে বার্তা

বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রকে দেখাতে চাইছে যে পশ্চিমা চাপের মধ্যেও তার শক্তিশালী বিকল্প অংশীদার রয়েছে। একই সময়ে রাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, পুতিনের এই সফরের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো– এটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রতীকী বার্তা। চীন ও রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলে আসছে, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলোর একক আধিপত্য থাকবে না।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার এই ত্রিমুখী সম্পর্ক আগামী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং সামরিক ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

/এফসি/