শিরোনাম

গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মোড়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মোড়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
ফারাক্কা ব্যারাজ। বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি গভীর দুঃখের নাম। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

গঙ্গার পানি যেন কেবল নদীর স্রোত নয়- এটি দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনীতি, রাজনীতি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার গভীর স্পন্দনের নাম। তিন দশক আগে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। এর আগে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নানা কারণে বহুল আলোচিত ফারাক্কা ও গঙ্গার পানি বণ্টনের প্রশ্ন।

যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি, বিদ্যমান চুক্তি নবায়ন হবে নাকি সম্পূর্ণ নতুন কোনো কাঠামোয় নতুন চুক্তি হবে। তবে দুই দেশের কারিগরি পর্যায়ের প্রস্তুতি এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে সরকার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে পারবেন এবং পরে যৌথ নদী কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

তবে এই প্রস্তুতির মধ্যেই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ভারতের একটি অনানুষ্ঠানিক প্রস্তাব। ভারত ভবিষ্যৎ চুক্তির ভিত্তি হিসেবে ফারাক্কা পয়েন্টে পানিপ্রবাহকে কেন্দ্র করে নতুন পদ্ধতি বিবেচনার কথা বলছে। আর এখানেই আপত্তি তুলেছেন বাংলাদেশের নদী ও পানি বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, গঙ্গার পানিবণ্টন নির্ভর করে উজানের বৃষ্টিপাত, পানিপ্রবাহ ও প্রবাহগতির ওপর। নদীর প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার নিচে নামলে দুই দেশ সমান পানি পায়। প্রবাহ ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পায় ৪০ হাজার কিউসেক, বাকিটা যায় ভারতে। আবার প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেক ছাড়ালে ভারত পায় ৪০ হাজার কিউসেক এবং অবশিষ্ট পানি আসে বাংলাদেশে।

ভারতের নতুন ভাবনায় ফারাক্কার পানিপ্রবাহকে ভিত্তি হিসেবে ধরার প্রস্তাব উঠেছে। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ফারাক্কায় এরই মধ্যেই উজান থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে প্রবাহ কমে গেছে। ফলে সেই কমে যাওয়া প্রবাহকে গড় ধরে বণ্টন করলে বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে।

কিন্তু ভারতের নতুন ভাবনায় ফারাক্কার পানিপ্রবাহকে ভিত্তি হিসেবে ধরার প্রস্তাব উঠেছে। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ফারাক্কায় এরই মধ্যেই উজান থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে প্রবাহ কমে গেছে। ফলে সেই কমে যাওয়া প্রবাহকে গড় ধরে বণ্টন করলে বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে।

নদী বিশেষজ্ঞ ও সাবেক যৌথ নদী কমিশনের সদস্য আইনুন নিশাত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘গঙ্গার উৎপত্তি তো ফারাক্কায় নয়। পুরো নদী ব্যবস্থার প্রবাহ বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু ফারাক্কার প্রবাহ ধরে ভাগাভাগি ন্যায্য হবে না।’

তিনি মনে করিয়ে দেন, অতীতেও দুই দেশ একমত হয়েছিল যে গঙ্গার সামগ্রিক প্রবাহের ওপর ভিত্তি করেই পানি বণ্টন হবে।

সম্প্রতি ভারত সফরে যাওয়া বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলাপে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি বলেন, পানি বরাবরই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তিনি জানান, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে পানিসহ সব দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনায় প্রস্তুত ভারত।

একই সফরে বাংলাদেশের সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ১৯৯৬ সালের চুক্তির ভিত্তি ছিল ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের পানিপ্রবাহের তথ্য। তিন দশক পরে সেই ফর্মুলা হয়তো আর কার্যকর নয়। তাই গত ৪০ বছরের তথ্য বিবেচনায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।

কিন্তু বাংলাদেশের দৃষ্টিতে প্রশ্নটি শুধু পরিসংখ্যানের নয়, অস্তিত্বেরও। কারণ, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে বাংলাদেশে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার কাছে নির্মিত ফারাক্কা ব্যারাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা বন্দর রক্ষা করতে গঙ্গার অতিরিক্ত পানি ভাগীরথীতে সরিয়ে নেওয়া। এজন্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ খালও খনন করা হয়।

বাংলাদেশের অভিযোগ, এই বাঁধের কারণে একসময়ের প্রমত্তা পদ্মা শুকিয়ে যেতে শুরু করে। নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে।

১৯৭৬ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ‘ফারাক্কা লং মার্চ’ কর্মসূচির মাধ্যমে এই ইস্যুকে জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিয়েছিলেন। সেই ইতিহাস এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতিতে প্রবলভাবে জীবন্ত। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ভারত ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করে।

ফারাক্কা চালুর দুই দশকেরও বেশি সময় পর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত ৩০ বছরের ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি চুক্তি স্বাক্ষর করে। প্রবাহ পরিস্থিতি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে প্রতি ১০ দিনে বাংলাদেশ কমপক্ষে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার অধিকার পায়, অন্যদিকে ভারত পায় ৪০ হাজার কিউসেক।

ফারাক্কা চালুর দুই দশকেরও বেশি সময় পর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারত ৩০ বছরের ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি চুক্তি স্বাক্ষর করে। প্রবাহ পরিস্থিতি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে প্রতি ১০ দিনে বাংলাদেশ কমপক্ষে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার অধিকার পায়, অন্যদিকে ভারত পায় ৪০ হাজার কিউসেক।

মানচিত্রে ফারাক্কা ব্যারাজের অবস্থান। ছবি: ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া
মানচিত্রে ফারাক্কা ব্যারাজের অবস্থান। ছবি: ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

তবে সময় বদলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং উজানে বাড়তি পানি প্রত্যাহার এখন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এ কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চুক্তি নবায়ন বা নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়।

২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞরা ফারাক্কা এলাকায় দুই দিনের মাঠপর্যায়ের জরিপ পরিচালনা করেন। পরে কলকাতায় যৌথ নদী কমিশনের ৮৬তম বৈঠকে সেই জরিপের ফলাফল নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় অগ্রগতি থমকে যায়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের প্রত্যাবর্তনের পর আবারও গতি পেতে শুরু করেছে গঙ্গা চুক্তি আলোচনা। ভারতের লোকসভায় দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং বলেন, আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো শুরু হয়নি, তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিনিধিরা এর মধ্যেই বিভিন্ন আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।

এরপর এপ্রিলে দিল্লি সফরে গিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গঙ্গা চুক্তিকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ‘প্রথম পরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। আমরা এমন একটি সংশোধিত চুক্তি চাই, যা মানুষের জরুরি প্রয়োজন ও জলবায়ু বাস্তবতা মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।’

এখনো অবশ্য স্পষ্ট নয়, শেষ পর্যন্ত পুরোনো চুক্তির পুনর্জন্ম হবে, নাকি গঙ্গার বুকে লেখা হবে একেবারে নতুন কোনো সমীকরণ।

তবে এটুকু নিশ্চিত- গঙ্গার পানি শুধু নদীর পানি নয়; এটি আস্থা, ন্যায়বিচার এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের এক কঠিন পরীক্ষারও নাম।

/বিবি/