শিরোনাম

বিশ্ব মা দিবস আজ

মাকে ভালোবাসতে হবে প্রতিদিন

মাকে ভালোবাসতে হবে প্রতিদিন
ছবি: সংগৃহীত

যেকোনো ভাষার সবচেয়ে গভীর আবেগ ও অনুভূতির একটি শব্দ ‘মা’। মায়ের গর্ভের অন্ধকার থেকে পৃথিবীতে আসার পর জীবনে চলার পথের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে যে মানুষটি নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকেন, তিনি মা। সন্তানের হাসিতে যার আনন্দ, সন্তানের কষ্টে যার চোখ ভিজে যায়, সেই মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যই পালন করা হয় ‘বিশ্ব মা দিবস’।

মা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন আশ্রয়। সভ্যতার ইতিহাস যত পুরোনো, মায়ের মমতা-ভালোবাসার গল্পও তত পুরোনো। মানুষের প্রথম শব্দ, প্রথম স্পর্শ, প্রথম নিরাপত্তাবোধ—সবকিছুর কেন্দ্রে একজন মা। তাই পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতি, ধর্ম ও সমাজে মাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশেষ মর্যাদা, আবেগ এবং শ্রদ্ধার এক অনন্য ঐতিহ্য।

প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার পালিত হয় বিশ্ব মা দিবস। কিন্তু দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি মানুষকে তার শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার এক আবেগময় উপলক্ষ। দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীতে, যেখানে সম্পর্কগুলো ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে উঠছে, সেখানে মা দিবস যেন মনে করিয়ে দেয়—জীবনের সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নাম মা।

মা দিবসের আধুনিক ইতিহাসের শুরু যুক্তরাষ্ট্রে। বিশ শতকের শুরুতে আনা জার্ভিস তার মায়ের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে একটি বিশেষ দিবস পালনের উদ্যোগ নেন। তার মা ছিলেন সমাজসেবক যিনি যুদ্ধাহত ও অসুস্থ মানুষের সেবায় তিনি কাজ করতেন। মায়ের মৃত্যুর পর আনা জার্ভিস উপলব্ধি করেন, সমাজে মায়েদের অবদানকে যথাযথভাবে স্মরণ করার মতো কোনো দিন নেই। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় আন্দোলন। অবশেষে ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে জাতীয় মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। পরে বিশ্বের নানা দেশে দিবসটি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করা শুরু হয়।

তবে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এই রীতি আধুনিক নয়। প্রাচীন গ্রিসে দেবতাদের মা ‘রিয়া’র সম্মানে উৎসব হতো। রোমান সভ্যতায়ও মাতৃত্বকে ঘিরে ছিল ধর্মীয় আয়োজন। ইউরোপে ‘মাদারিং সানডে’ নামে একটি দিবস পালনের রীতিও ছিল বহু পুরোনো। অর্থাৎ, মানুষ যুগে যুগে উপলব্ধি করেছে—মা কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি অস্তিত্বের ভিত্তি।

একজন মা সন্তানের জন্য কী করেন, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব কোনো সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি কিংবা মনোবিজ্ঞান কখনো দিতে পারবে না। পৃথিবীর অধিকাংশ সম্পর্কের পেছনে কোনো না কোনো প্রত্যাশা থাকে; কিন্তু মায়ের ভালোবাসা প্রায়ই প্রত্যাশাহীন। সন্তানের মুখে একবেলা খাবার তুলে দিতে গিয়ে অসংখ্য মা নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে রাখেন। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেন। অসুস্থ সন্তানের পাশে নির্ঘুম রাত কাটানো কিংবা সন্তানের ব্যর্থতায় নীরবে চোখ মুছে আবার সাহস জোগানো—এসব দৃশ্য পৃথিবীর প্রতিটি সমাজেই এক।

মায়ের এই আত্মত্যাগকে আমরা প্রায়ই স্বাভাবিক ধরে নিই। কারণ মা যেন এমন এক উপস্থিতি, যাকে মানুষ তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধরে নেয়। অথচ একজন মা প্রতিদিন যে শ্রম দেন, তার অধিকাংশই অদৃশ্য। সংসার চালানো, সন্তানকে বড় করা, মানসিক নিরাপত্তা দেওয়া, পরিবারের ভারসাম্য ধরে রাখা—এসব কাজের কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা হয় না। অথচ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে এই অদৃশ্য শ্রমের ওপরই।

আধুনিক বিশ্বে মায়ের ভূমিকা আরও বহুমাত্রিক হয়েছে। এখন অনেক মা একই সঙ্গে কর্মজীবী, গৃহকর্ত্রী, সন্তান পালনকারী এবং পরিবারের অর্থনৈতিক সহযোদ্ধা। অফিসের দায়িত্ব শেষ করে বাসায় ফিরে সন্তানকে পড়ানো, রান্না করা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখভাল করা—এই দ্বৈত চাপ প্রতিদিন বহন করছেন অসংখ্য নারী। কিন্তু সমাজ এখনও অনেক ক্ষেত্রে তাদের শ্রমকে ‘দায়িত্ব’ হিসেবেই দেখে, ‘অবদান’ হিসেবে নয়।

বিশ্ব মা দিবস তাই শুধু আবেগের দিন নয়; এটি সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে ভাবারও দিন। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাতৃত্বকে কেবল অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, মায়েদের প্রতি বাস্তব সম্মানও নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন, বৃদ্ধ বয়সে নিরাপদ জীবন—এসব প্রশ্নও মা দিবসের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের সমাজেও মা এক গভীর আবেগের নাম। গ্রামবাংলার উঠান থেকে শহরের বহুতল ভবন—সবখানেই মা পরিবারকে ধরে রাখার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখানেও সম্পর্কের ধরন বদলাচ্ছে। নগরজীবনের ব্যস্ততা, বিদেশমুখী জীবন, একক পরিবার ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে মায়েরা আজ নিঃসঙ্গতায় ভুগেন। কেউ অপেক্ষা করেন দূরে থাকা সন্তানের ফোনের জন্য, কেউবা একই বাড়িতে থেকেও সন্তানের ব্যস্ততার কাছে হারিয়ে যান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মা দিবস এখন অনেকটাই দৃশ্যমান উদযাপনের অংশ হয়ে উঠেছে। ফেসবুকে ছবি, আবেগঘন স্ট্যাটাস, ফুল বা উপহার—এসব দিনটির আনন্দ বাড়ায় ঠিকই, কিন্তু প্রশ্নও তৈরি করে: মাকে ভালোবাসা কি কেবল প্রকাশের বিষয়, নাকি অনুভবেরও? কারণ বহু মা আছেন, যাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া দামি উপহার নয়; বরং সন্তানের একটু সময়, একটু মনোযোগ, কিংবা আন্তরিকভাবে বলা—‘মা, তুমি কেমন আছ?’

মা দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—মায়ের প্রতি ভালোবাসা যেন আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। মায়ের সঙ্গে কথা বলা, তার ক্লান্তি বোঝা, তার একাকীত্ব উপলব্ধি করা কিংবা বার্ধক্যে তাকে সম্মান ও সঙ্গ দেওয়া—এসবই প্রকৃত শ্রদ্ধা।

বিশ্বের নানা সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পে মা এক অনন্য প্রতীক। বাংলা সাহিত্যেও মায়ের প্রতিচ্ছবি এসেছে গভীর মমতায়। কখনো তিনি সংগ্রামী, কখনো নির্যাতিত, কখনো নিঃস্বার্থ আশ্রয়। কিন্তু সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি এমন একজন মানুষ, যার ভালোবাসা সন্তানের জীবনে প্রথম এবং শেষ নিরাপত্তা।

পৃথিবীতে অনেক সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। স্বার্থ, দূরত্ব কিংবা বাস্তবতার চাপে সম্পর্কের রং ফিকে হয়ে আসে। কিন্তু একজন মা সন্তানের জন্য শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করে যান। হয়তো এ কারণেই পৃথিবীর সব ভাষায় ‘মা’ শব্দটির ভেতরে এক ধরনের চিরন্তন কোমলতা আছে।

বিশ্ব মা দিবস তাই মূলত মানুষের মানবিক হয়ে ওঠার দিন। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে মানুষটি নিঃশব্দে আমাদের জীবন গড়ে দিয়েছেন, তাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য কেবল একটি দিন যথেষ্ট নয়। মাকে ভালোবাসতে হয় প্রতিদিন, প্রতিটি আচরণে, প্রতিটি দায়িত্বে। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ শব্দটি আজও একই—মা।

/এমআর/