শিরোনাম

পুরান ঢাকায় ১০ টাকায় ‘নবাবি’ গোসল

জবি প্রতিনিধি
পুরান ঢাকায় ১০ টাকায় ‘নবাবি’ গোসল
পুরান ঢাকার ইসলামপুরের নবাববাড়ি মার্কেট রোডসংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী পুকুর। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

গরমে ক্লান্ত শরীর নিয়ে পুরান ঢাকার মানুষ যখন একটু স্বস্তির খোঁজে ছুটছেন, তখন ইসলামপুরের নবাববাড়ি পুকুরে মাত্র ১০ টাকায় মিলছে গোসলের সুযোগ। শতবর্ষী এক পুকুরের শীতল পানিতে নেমে কেউ ক্লান্তি দূর করছেন, কেউ সাঁতার কাটছেন, আবার কেউ পুরান ঢাকার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের স্বাদ খুঁজছেন।

স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি পুকুর নয়, যেন কোলাহলভরা শহরের মাঝখানে লুকিয়ে থাকা এক ‘নবাবি গোসলখানা’। ইসলামপুরের ঐতিহ্যবাহী এই নবাববাড়ি পুকুর, যেটি ‘গোল তালাব’ নামেও পরিচিত, এখন ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ ও স্থানীয়দের প্রতিদিনই টানছে।

ইসলামপুরের নবাববাড়ি মার্কেট রোডসংলগ্ন প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা আয়তনের এই পুকুরটি দীর্ঘদিন ধরেই পুরান ঢাকার মানুষের কাছে পরিচিত। নবাব পরিবারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পুকুরটিতে বর্তমানে গোসল ও সাঁতার কাটতে জনপ্রতি ১০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ জানায়, গত বছর থেকে প্রবেশমূল্য ৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হয়েছে।

পুকুরের চারপাশ গ্রিল দিয়ে ঘেরা। পানিতে ভেসে ওঠা নারকেলগাছের প্রতিচ্ছবি আর শীতল বাতাস যেন ব্যস্ত নগরজীবনে একটু স্বস্তির অনুভূতি এনে দেয়। পুকুরে রুই, কাতল, মৃগেল, কালবাউশ ও চিতলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময় পরপর টিকেট কেটে ছিপ দিয়ে মাছ ধরার আয়োজনও করা হয়। মাছ ধরার এই আয়োজনকে ঘিরে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে শৌখিন মৎস্যশিকারিরা অংশ নেন। এ আয়োজনে অংশ নিতে টিকেটের মূল্য সাধারণত ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

জানা যায়, ১৬১০ সালে নবাব আব্দুল বারির উদ্যোগে এই জলাশয়টির খনন কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে পুরান ঢাকার কামার-কুমার ও মৃৎশিল্পীরা এখান থেকে মাটি সংগ্রহ করতে করতে পুকুরটিকে আরও গভীর করে তোলেন। পরে ১৮৩০ সালে নবাব খাজা আলিম উল্লাহ কুঠিসহ পুরো জলাশয়টি কিনে নেন। তার উদ্যোগেই জলাশয়টি সংস্কার করে আধুনিক রূপে একটি পুকুরে পরিণত করা হয়। প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা জমির ওপর বৃত্তাকার আকৃতিতে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক এই পুকুরটি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধীরে ধীরে পুকুরটির সৌন্দর্য নষ্ট হতে শুরু করে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের পাশাপাশি নবাব পরিবারের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন মামলা ও বিরোধ চলায় এটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। পরে ২০০৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনার মাধ্যমে ‘মৌলভী খাজা আব্দুল্লাহ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’ পুকুরটির বৈধ মালিকানা লাভ করে।

সরকারি গেজেটে পুকুরটির নাম উল্লেখ রয়েছে ‘ইসলামপুরের গোল তালাব’ হিসেবে। তবে স্থানীয়দের কাছে এটি বেশি পরিচিত ‘নবাববাড়ি পুশকুনি’ নামে। বর্তমানে এটি পরিচালনা করছেন নবাব পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘নবাববাড়ি ট্যাংক কমিটি।' এই পুকুরে বেশিরভাগ শাঁখারীবাজার, ইসলামপুর, বাংলাবাজার, বাদামতলী, বাবুবাজার, পাটুয়াটুলী, তাঁতীবাজার, নয়াবাজার এলাকায় বিভিন্ন দোকান বা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত লোকজন গোসল করেন।

পুকুরঘাটে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী মানুষ গোসল ও সাঁতার কাটছেন। কেউ পানিতে নেমে শরীর ঠান্ডা করছেন, কেউ আবার সাঁতার শিখছেন। পুকুরের পরিচ্ছন্নতা ধরে রাখতে সাবান ও শ্যাম্পু ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি কাপড় ধোয়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বাদামতলীর একটি ফলের আড়তের কর্মী সোহেল মিয়া বলেন, ‘সারাদিন দোকানে কাজ করার পর এই পুকুরে এসে গোসল করলে অনেক স্বস্তি লাগে। বুড়িগঙ্গার পানি এখন এতটাই নোংরা যে সেখানে নামার কথা চিন্তাও করা যায় না। কিন্তু এখানে পানি অনেক পরিষ্কার। ছোটবেলা থেকেই এই পুকুরে সাঁতার কাটি। এখনো সময় পেলেই চলে আসি।’

ইসলামপুরের ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পুরান ঢাকায় খোলা পরিবেশ খুব কম। এখানে এসে কিছুক্ষণ বসে থাকলেও মন ভালো হয়ে যায়। বিশেষ করে গরমের দিনে ঠান্ডা পানিতে গোসল করলে ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। আমাদের এলাকার অনেক ব্যবসায়ী নিয়মিত এখানে আসে। এটা শুধু পুকুর নয়, পুরান ঢাকার মানুষের জন্য একটা আলাদা অনুভূতির জায়গা।’

স্থানীয়রা জানান, ইসলামপুর, বাদামতলী, বাবুবাজার, তাঁতীবাজার ও শাঁখারীবাজার এলাকার দোকান ও আড়তে কর্মরত অনেক মানুষ নিয়মিত এখানে গোসল করতে আসেন। বিশেষ করে পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় এখন আর বড় কোনো উন্মুক্ত জলাধার না থাকায় এই পুকুরটি স্থানীয়দের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নবাব পরিবারের এক সদস্য বলেন, ‘পুকুরটির বয়স কয়েকশো বছর। একসময় এর মালিকানা নিয়ে সরকারের সঙ্গে মামলাও হয়েছিল। পরে আদালত আমাদের পক্ষে রায় দেয়। আশপাশে কর্মরত ব্যবসায়ীরাই এখানে বেশি আসে। পুরান ঢাকার পরিবেশে এমন খোলামেলা ও পরিচ্ছন্ন জলাধার এখন খুব কমই আছে। তাই এটিকে সংরক্ষণ করা খুব জরুরি।’

নবাববাড়ি ট্যাংক কমিটির কোষাধ্যক্ষ খাজা জিয়াউল হক ইভান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘এই পুকুরটি শুধু নবাব পরিবারের ঐতিহ্য নয়, এটি পুরান ঢাকার মানুষেরও একটি আবেগের জায়গা। আমরা চেষ্টা করছি পুকুরটির পরিচ্ছন্নতা ও পুরোনো পরিবেশ ধরে রাখতে। প্রতিদিন অনেক মানুষ এখানে গোসল ও সাঁতার কাটতে আসে। তাই পানির মান ঠিক রাখতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হয়। আমরা বাইরে থেকে কোনো অর্থ পাই না। তাই কমিটির সবার সিদ্ধান্তে প্রবেশমূল্য ৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুকুর থেকে যে আয় হয়, তার অর্ধেক ট্রাস্টে জমা দিতে হয়। বাকি অর্থ দিয়ে স্টাফদের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য খরচ চালানো হয়। পুরান ঢাকার পরিবেশে এমন খোলামেলা ও পরিচ্ছন্ন জলাধার এখন খুব কমই আছে। ভবিষ্যতেও আমরা চাই ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরটি মানুষের জন্য সংরক্ষিত থাকুক।’

/এফসি/