ইরান যুদ্ধের ফলে ৪ দফায় বড় ধাক্কার মুখোমুখি হবে বিশ্ব অর্থনীতি

ইরান যুদ্ধের ফলে ৪ দফায় বড় ধাক্কার মুখোমুখি হবে বিশ্ব অর্থনীতি
সিটিজেন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম উত্তেজনা ও সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আগামীকালই কোনো ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি ঘোষণা করে, তবুও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত সহজে মুছে যাবে না। যুদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবর্ষণ বন্ধের মাধ্যমেই শেষ হয় না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা, পণ্যের মূল্য, দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এর গভীর কাঠামোগত প্রভাব পড়ে এবং তা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংঘাতের প্রকৃত মূল্য শেষ পর্যন্ত চোকাতে হবে বিশ্বের এমন সব দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশকে, যাদের এই যুদ্ধ শুরু করার পেছনে কোনো ভূমিকাই ছিল না। এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি গভীরতা বুঝতে অতীতের উদাহরণগুলো বিবেচনা করা জরুরি। ১৯৯০ সালের মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে উঠে ইরাকের তেলের উৎপাদন প্রাক-যুদ্ধ অবস্থায় ফিরতে প্রায় এক দশক সময় লেগেছিল। কুয়েতকে জাতিসংঘের নির্দেশিত ক্ষতিপূরণ দিতে ইরাকি রাষ্ট্রকে লড়তে হয়েছে ২০২২ সাল পর্যন্ত। একইভাবে ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা প্রথম বছরে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হলেও, এর অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব এখনো বিশ্বজুড়ে বহাল রয়েছে। চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবও একইভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে মোট চারটি ধাপে আঘাত হানবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে সংকটের যে রূপটি সবার চোখে পড়ে, তা হলো জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়া। তবে এটি কেবল সংকটের প্রবেশদ্বার মাত্র। যেহেতু জ্বালানি প্রায় প্রতিটি বাণিজ্য পণ্যের অন্যতম প্রধান উপাদান, তাই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় বিশ্ববাজারে সার ও অ্যামোনিয়ার দাম নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলটি বিশ্বের মোট অ্যামোনিয়া রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ইউরিয়া রপ্তানির ৩৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যার বড় অংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ বা বিঘ্নিত হলে পরবর্তী কয়েক মৌসুমের মধ্যে খাদ্যশস্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে, যার চূড়ান্ত আঘাত গিয়ে পৌঁছায় কায়রোর রুটির দোকানে কিংবা ঢাকার চালের বাজারে।
দ্বিতীয় ধাপটি হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় ক্ষতি। ২০২৩ সালের শেষে লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর যেভাবে কন্টেইনারবাহী জাহাজগুলো আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যাতায়াত শুরু করেছিল, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পরও কিন্তু সেই রুট পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফেরেনি। কারণ বিমা কোম্পানি, পরিবহন সংস্থা এবং ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে দীর্ঘ রুটের বাড়তি সময়ের ক্ষতি ও জ্বালানি খরচের সঙ্গে নিজেদের ব্যবসায়িক কাঠামো খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এ ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন সংকটের অবসানের পরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের জায়গায় ফিরে আসে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সংকটের তৃতীয় ধাপটি, যা মূলত গ্লোবাল সাউথ বা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর এক নির্মম অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দেয়। উন্নত দেশগুলো তাদের শক্তিশালী রিজার্ভ ও আর্থিক সুরক্ষার মাধ্যমে এই ধাক্কা সামলে নিলেও, দরিদ্র দেশগুলোকে আমদানি হ্রাস, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। অনুন্নত দেশগুলোতে একটি সাধারণ পরিবারের আয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশই ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে, যেখানে উন্নত দেশে এ হার মাত্র ১৬ শতাংশ। এটি কোনো সাধারণ বাজার পরিস্থিতি নয়, বরং গরিবের কল্যাণ ও সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু পণ্য রপ্তানিকারক ও আর্থিক মধ্যস্থতাকারীদের পকেটে চলে যাওয়ার এক বৈশ্বিক পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা, যা কোনো যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক চুক্তি দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।
এ অর্থনৈতিক ধাক্কা পরবর্তীতে চতুর্থ ধাপে গিয়ে মারাত্মক রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। অতীতেও দেখা গেছে, গমের দাম বৃদ্ধি আরব বসন্তের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনেও ছিল বৈশ্বিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট। বর্তমান সংকটের জেরে গ্লোবাল সাউথের অনেক দুর্বল সরকারের পতন ঘটা তাই অসম্ভব কিছু নয়; যাকে পরবর্তীতে প্রচলিত ধারায় কেবল অভ্যন্তরীণ সুশাসনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হবে, বাহ্যিক যুদ্ধের প্রভাব হিসেবে নয়।
এই সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে এখনই তিনটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি) বা জি-৭৭ জোটের অধীনে আঞ্চলিক খাদ্য ও সার ব্যাংক গড়ে তোলা, যা অন্তত ১২ মাসের আমদানি সংকট মোকাবিলা করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, গ্লোবাল সাউথের জন্য নিজস্ব যুদ্ধ-ঝুঁকি পুনর্বীমা ব্যবস্থা তৈরি করা এবং তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাঠামোগত সংস্কার করা, যাতে তারা যুদ্ধজনিত বাহ্যিক সংকটকে সংশ্লিষ্ট দেশের ভুল নীতি হিসেবে বিবেচনা না করে দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, শান্তি আলোচনার টেবিলে বসা কোনো পক্ষই এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছে না। ফলে তথাকথিত শান্তি চুক্তি হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রের অবসান ঘটাবে, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির প্রান্তে থাকা দেশগুলোর জন্য যুদ্ধের প্রকৃত ভোগান্তি তখন কেবল শুরু হবে।
সূত্র: আল জাজিরা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম উত্তেজনা ও সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আগামীকালই কোনো ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি ঘোষণা করে, তবুও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত সহজে মুছে যাবে না। যুদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবর্ষণ বন্ধের মাধ্যমেই শেষ হয় না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা, পণ্যের মূল্য, দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এর গভীর কাঠামোগত প্রভাব পড়ে এবং তা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংঘাতের প্রকৃত মূল্য শেষ পর্যন্ত চোকাতে হবে বিশ্বের এমন সব দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশকে, যাদের এই যুদ্ধ শুরু করার পেছনে কোনো ভূমিকাই ছিল না। এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি গভীরতা বুঝতে অতীতের উদাহরণগুলো বিবেচনা করা জরুরি। ১৯৯০ সালের মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে উঠে ইরাকের তেলের উৎপাদন প্রাক-যুদ্ধ অবস্থায় ফিরতে প্রায় এক দশক সময় লেগেছিল। কুয়েতকে জাতিসংঘের নির্দেশিত ক্ষতিপূরণ দিতে ইরাকি রাষ্ট্রকে লড়তে হয়েছে ২০২২ সাল পর্যন্ত। একইভাবে ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা প্রথম বছরে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হলেও, এর অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব এখনো বিশ্বজুড়ে বহাল রয়েছে। চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবও একইভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে মোট চারটি ধাপে আঘাত হানবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে সংকটের যে রূপটি সবার চোখে পড়ে, তা হলো জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়া। তবে এটি কেবল সংকটের প্রবেশদ্বার মাত্র। যেহেতু জ্বালানি প্রায় প্রতিটি বাণিজ্য পণ্যের অন্যতম প্রধান উপাদান, তাই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় বিশ্ববাজারে সার ও অ্যামোনিয়ার দাম নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলটি বিশ্বের মোট অ্যামোনিয়া রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ইউরিয়া রপ্তানির ৩৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যার বড় অংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ বা বিঘ্নিত হলে পরবর্তী কয়েক মৌসুমের মধ্যে খাদ্যশস্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে, যার চূড়ান্ত আঘাত গিয়ে পৌঁছায় কায়রোর রুটির দোকানে কিংবা ঢাকার চালের বাজারে।
দ্বিতীয় ধাপটি হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় ক্ষতি। ২০২৩ সালের শেষে লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর যেভাবে কন্টেইনারবাহী জাহাজগুলো আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যাতায়াত শুরু করেছিল, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পরও কিন্তু সেই রুট পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফেরেনি। কারণ বিমা কোম্পানি, পরিবহন সংস্থা এবং ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে দীর্ঘ রুটের বাড়তি সময়ের ক্ষতি ও জ্বালানি খরচের সঙ্গে নিজেদের ব্যবসায়িক কাঠামো খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এ ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন সংকটের অবসানের পরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের জায়গায় ফিরে আসে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সংকটের তৃতীয় ধাপটি, যা মূলত গ্লোবাল সাউথ বা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর এক নির্মম অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দেয়। উন্নত দেশগুলো তাদের শক্তিশালী রিজার্ভ ও আর্থিক সুরক্ষার মাধ্যমে এই ধাক্কা সামলে নিলেও, দরিদ্র দেশগুলোকে আমদানি হ্রাস, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। অনুন্নত দেশগুলোতে একটি সাধারণ পরিবারের আয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশই ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে, যেখানে উন্নত দেশে এ হার মাত্র ১৬ শতাংশ। এটি কোনো সাধারণ বাজার পরিস্থিতি নয়, বরং গরিবের কল্যাণ ও সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু পণ্য রপ্তানিকারক ও আর্থিক মধ্যস্থতাকারীদের পকেটে চলে যাওয়ার এক বৈশ্বিক পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা, যা কোনো যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক চুক্তি দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।
এ অর্থনৈতিক ধাক্কা পরবর্তীতে চতুর্থ ধাপে গিয়ে মারাত্মক রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। অতীতেও দেখা গেছে, গমের দাম বৃদ্ধি আরব বসন্তের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনেও ছিল বৈশ্বিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট। বর্তমান সংকটের জেরে গ্লোবাল সাউথের অনেক দুর্বল সরকারের পতন ঘটা তাই অসম্ভব কিছু নয়; যাকে পরবর্তীতে প্রচলিত ধারায় কেবল অভ্যন্তরীণ সুশাসনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হবে, বাহ্যিক যুদ্ধের প্রভাব হিসেবে নয়।
এই সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে এখনই তিনটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি) বা জি-৭৭ জোটের অধীনে আঞ্চলিক খাদ্য ও সার ব্যাংক গড়ে তোলা, যা অন্তত ১২ মাসের আমদানি সংকট মোকাবিলা করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, গ্লোবাল সাউথের জন্য নিজস্ব যুদ্ধ-ঝুঁকি পুনর্বীমা ব্যবস্থা তৈরি করা এবং তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাঠামোগত সংস্কার করা, যাতে তারা যুদ্ধজনিত বাহ্যিক সংকটকে সংশ্লিষ্ট দেশের ভুল নীতি হিসেবে বিবেচনা না করে দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, শান্তি আলোচনার টেবিলে বসা কোনো পক্ষই এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছে না। ফলে তথাকথিত শান্তি চুক্তি হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রের অবসান ঘটাবে, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির প্রান্তে থাকা দেশগুলোর জন্য যুদ্ধের প্রকৃত ভোগান্তি তখন কেবল শুরু হবে।
সূত্র: আল জাজিরা

ইরান যুদ্ধের ফলে ৪ দফায় বড় ধাক্কার মুখোমুখি হবে বিশ্ব অর্থনীতি
সিটিজেন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম উত্তেজনা ও সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আগামীকালই কোনো ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি ঘোষণা করে, তবুও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত সহজে মুছে যাবে না। যুদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবর্ষণ বন্ধের মাধ্যমেই শেষ হয় না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা, পণ্যের মূল্য, দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এর গভীর কাঠামোগত প্রভাব পড়ে এবং তা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংঘাতের প্রকৃত মূল্য শেষ পর্যন্ত চোকাতে হবে বিশ্বের এমন সব দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশকে, যাদের এই যুদ্ধ শুরু করার পেছনে কোনো ভূমিকাই ছিল না। এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি গভীরতা বুঝতে অতীতের উদাহরণগুলো বিবেচনা করা জরুরি। ১৯৯০ সালের মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে উঠে ইরাকের তেলের উৎপাদন প্রাক-যুদ্ধ অবস্থায় ফিরতে প্রায় এক দশক সময় লেগেছিল। কুয়েতকে জাতিসংঘের নির্দেশিত ক্ষতিপূরণ দিতে ইরাকি রাষ্ট্রকে লড়তে হয়েছে ২০২২ সাল পর্যন্ত। একইভাবে ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা প্রথম বছরে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হলেও, এর অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব এখনো বিশ্বজুড়ে বহাল রয়েছে। চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবও একইভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে মোট চারটি ধাপে আঘাত হানবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে সংকটের যে রূপটি সবার চোখে পড়ে, তা হলো জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়া। তবে এটি কেবল সংকটের প্রবেশদ্বার মাত্র। যেহেতু জ্বালানি প্রায় প্রতিটি বাণিজ্য পণ্যের অন্যতম প্রধান উপাদান, তাই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় বিশ্ববাজারে সার ও অ্যামোনিয়ার দাম নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলটি বিশ্বের মোট অ্যামোনিয়া রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ইউরিয়া রপ্তানির ৩৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যার বড় অংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ বা বিঘ্নিত হলে পরবর্তী কয়েক মৌসুমের মধ্যে খাদ্যশস্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে, যার চূড়ান্ত আঘাত গিয়ে পৌঁছায় কায়রোর রুটির দোকানে কিংবা ঢাকার চালের বাজারে।
দ্বিতীয় ধাপটি হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় ক্ষতি। ২০২৩ সালের শেষে লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর যেভাবে কন্টেইনারবাহী জাহাজগুলো আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যাতায়াত শুরু করেছিল, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পরও কিন্তু সেই রুট পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফেরেনি। কারণ বিমা কোম্পানি, পরিবহন সংস্থা এবং ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে দীর্ঘ রুটের বাড়তি সময়ের ক্ষতি ও জ্বালানি খরচের সঙ্গে নিজেদের ব্যবসায়িক কাঠামো খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এ ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন সংকটের অবসানের পরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের জায়গায় ফিরে আসে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সংকটের তৃতীয় ধাপটি, যা মূলত গ্লোবাল সাউথ বা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর এক নির্মম অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দেয়। উন্নত দেশগুলো তাদের শক্তিশালী রিজার্ভ ও আর্থিক সুরক্ষার মাধ্যমে এই ধাক্কা সামলে নিলেও, দরিদ্র দেশগুলোকে আমদানি হ্রাস, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। অনুন্নত দেশগুলোতে একটি সাধারণ পরিবারের আয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশই ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে, যেখানে উন্নত দেশে এ হার মাত্র ১৬ শতাংশ। এটি কোনো সাধারণ বাজার পরিস্থিতি নয়, বরং গরিবের কল্যাণ ও সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু পণ্য রপ্তানিকারক ও আর্থিক মধ্যস্থতাকারীদের পকেটে চলে যাওয়ার এক বৈশ্বিক পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা, যা কোনো যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক চুক্তি দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।
এ অর্থনৈতিক ধাক্কা পরবর্তীতে চতুর্থ ধাপে গিয়ে মারাত্মক রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। অতীতেও দেখা গেছে, গমের দাম বৃদ্ধি আরব বসন্তের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনেও ছিল বৈশ্বিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট। বর্তমান সংকটের জেরে গ্লোবাল সাউথের অনেক দুর্বল সরকারের পতন ঘটা তাই অসম্ভব কিছু নয়; যাকে পরবর্তীতে প্রচলিত ধারায় কেবল অভ্যন্তরীণ সুশাসনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হবে, বাহ্যিক যুদ্ধের প্রভাব হিসেবে নয়।
এই সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে এখনই তিনটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (ওআইসি) বা জি-৭৭ জোটের অধীনে আঞ্চলিক খাদ্য ও সার ব্যাংক গড়ে তোলা, যা অন্তত ১২ মাসের আমদানি সংকট মোকাবিলা করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, গ্লোবাল সাউথের জন্য নিজস্ব যুদ্ধ-ঝুঁকি পুনর্বীমা ব্যবস্থা তৈরি করা এবং তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাঠামোগত সংস্কার করা, যাতে তারা যুদ্ধজনিত বাহ্যিক সংকটকে সংশ্লিষ্ট দেশের ভুল নীতি হিসেবে বিবেচনা না করে দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, শান্তি আলোচনার টেবিলে বসা কোনো পক্ষই এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছে না। ফলে তথাকথিত শান্তি চুক্তি হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রের অবসান ঘটাবে, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির প্রান্তে থাকা দেশগুলোর জন্য যুদ্ধের প্রকৃত ভোগান্তি তখন কেবল শুরু হবে।
সূত্র: আল জাজিরা

মধ্যপ্রাচ্যে লেজার প্রযুক্তির যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের


