শিরোনাম

কাগজ, সিল আর স্বাক্ষরের গোলকধাঁধায় জাবি শিক্ষার্থীরা

মো. রহমাতুল্লাহ
মো. রহমাতুল্লাহ
কাগজ, সিল আর স্বাক্ষরের গোলকধাঁধায় জাবি শিক্ষার্থীরা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ভর্তি আবেদন, ভর্তি ফি পরিশোধসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা ধীরে ধীরে ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত হলেও বিভিন্ন বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফি পরিশোধের ক্ষেত্রে এখনও শিক্ষার্থীদের নির্ভর করতে হয় বহু বছর আগের কাগজনির্ভর ও জটিল প্রক্রিয়ার ওপর। একটি পরীক্ষার ফরম জমা দিতে শিক্ষার্থীদের বিভাগ, আবাসিক হল, হিসাবরক্ষণ অফিস, অগ্রণী ব্যাংক এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়—এভাবে একাধিক দপ্তরে বারবার যেতে হয়। প্রতিটি ধাপে স্বাক্ষর, সিল, অনুমোদন ও কাগজপত্র বহনের ঝামেলায় নষ্ট হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, অনেক ক্ষেত্রে পুরো একটি কর্মদিবস।

বর্তমান প্রক্রিয়ায় একজন শিক্ষার্থীকে প্রথমে নিজ হল থেকে পরীক্ষার ফরম সংগ্রহ ও পূরণ করে বিভাগে জমা দিতে হয়। বিভাগীয় কার্যালয় থেকে সেটি আবার হল অফিসে অনুমোদনের জন্য নিয়ে যেতে হয়। এরপর রেজিস্ট্রার ভবনের হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে নির্ধারিত ফি জেনে অগ্রণী ব্যাংকে গিয়ে ফি জমা দিতে হয়। ব্যাংক থেকে রসিদ সংগ্রহের পর পুনরায় হিসাবরক্ষণ অফিসে তা যাচাই করিয়ে, সবশেষে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে জমা দেওয়ার মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি শেষ হয়। অর্থাৎ একটি পরীক্ষার ফি পরিশোধ করতে একজন শিক্ষার্থীকে একাধিক ভবন ও দপ্তরে ঘুরতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ হওয়ার পাশাপাশি ভোগান্তিরও বড় কারণ।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দেশে যখন অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন পেমেন্ট, মোবাইল ব্যাংকিং কিংবা সমন্বিত ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে কয়েক মিনিটেই পরীক্ষার ফি পরিশোধ করা যায়, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও পুরোনো আমলের এই ম্যানুয়াল পদ্ধতি বহাল রয়েছে। ফলে ক্লাস, গবেষণা বা ব্যক্তিগত কাজ বাদ দিয়ে দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়াতে হয়, এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ছোটাছুটি করতে হয় এবং সামান্য প্রশাসনিক ত্রুটিতেও পুরো প্রক্রিয়া আবার শুরু করতে হয়। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক জটিলতা নয়; বরং ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি বাস্তবতা। তাদের প্রশ্ন, ভর্তি আবেদন ও ভর্তি ফি যখন অনলাইনে সফলভাবে নেওয়া সম্ভব হয়েছে, তখন নিয়মিত পরীক্ষা-সংক্রান্ত ফি পরিশোধের জন্য এখনও কেন কাগজ, সিল ও অফিস থেকে অফিসে ঘুরে বেড়ানোর ওপর নির্ভর করতে হবে? দীর্ঘদিন ধরে এমন ভোগান্তি চললেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ডিজিটাল উদ্যোগ না নেওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ফারিহা মাওয়া অভিযোগ করে বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও এখানে পরীক্ষার ফি পরিশোধের প্রক্রিয়া এখনও কাগজ, সিল ও স্বাক্ষরের গোলকধাঁধায় আটকে রয়েছে। পরীক্ষার সময় একজন শিক্ষার্থীর যেখানে পড়ার টেবিলে বসে প্রস্তুতিতে মনোযোগী থাকার কথা, সেখানে তাকে পরীক্ষার ফি জমা দেওয়ার জন্য আবাসিক হল, বিভাগ, রেজিস্ট্রার অফিস, ব্যাংক ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে বারবার ছুটে বেড়াতে হয়। স্বাক্ষর, সিল ও বিভিন্ন অনুমোদনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক হলে প্রভোস্টের স্বাক্ষর এবং ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘ ভোগান্তি পোহাতে হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা অযথা মানসিক চাপের পাশাপাশি মূল্যবান সময় ও শ্রমের অপচয়ের শিকার হন। পরীক্ষার ফি পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পন্ন করতে যেখানে কয়েক মিনিটই যথেষ্ট, সেখানে কাগজনির্ভর এই জটিল ব্যবস্থার কারণে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ছোটাছুটি করতে করতে দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

তিনি আরও বলেন, এই ডিজিটাল যুগে সেমিস্টার ও ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার ফি পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটালাইজেশন করা হলে শিক্ষার্থীদের অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপ অনেকাংশে কমবে, সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রম হবে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ, নির্ভুল ও জবাবদিহিমূলক।

মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী প্রত্যাশা রানী অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, প্রতি সেমিস্টার বা বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঠিক আগের সময়টিই একজন শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় আমাদের পুরো মনোযোগ থাকার কথা পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পরীক্ষার ফি পরিশোধ ও ফরম জমা দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ছুটে বেড়াতে হয়। এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা হলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে যাবে। অনলাইনে ফি পরিশোধ, ডিজিটাল অনুমোদন এবং অনলাইন ফরম জমার ব্যবস্থা চালু হলে সময়, শ্রম ও অর্থ সবকিছুরই সাশ্রয় হবে। আমরা আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক দাবির প্রতি গুরুত্ব দেবে এবং পরীক্ষা-সংক্রান্ত কার্যক্রমকে দ্রুত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় এনে শিক্ষার্থীদের অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির অবসান ঘটাবে।

সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সায়েম বলেন, প্রতিবার পরীক্ষার ফি দেওয়ার সময় বিভিন্ন অফিসের স্বাক্ষর-সিল জোগাড় করার জন্য কমপক্ষে ৩ দিন সময় লাগে। অফিস খোলার দিন ক্লাসের ফাঁকে সময় বের করে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে দৌড়ানো চরম ভোগান্তির। সাথে কর্মকর্তাদের ধীরগতি তো আছেই। সারাবিশ্বে যেখানে এআই এর দিকে আগাচ্ছে সেখানে জাবির অফিসসমূহে এখনও আদিম নথিপত্রের যুগে পড়ে থাকা হতাশাজনক। এই পিছিয়ে থাকা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মানের নিম্নমুখীতাও নির্দেশ করে।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, অটোমেশন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলমান আছে। আমি প্রশাসনে আসার আগেই অটোমেশন নিয়ে কমিটি গঠন হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান বলেন, সবমিলিয়ে এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আমাদের কমিটি এ ব্যাপারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ আমি এ ব্যাপারে আপডেট নিয়েছিলাম, তারা কাজ করে যাচ্ছেন।

/এমআর/