শিরোনাম
দেখা থেকে লেখা

জলাবদ্ধতায় ঢাকার পথে পথে ভোগান্তি আর কতদিন

বাকি বিল্লাহ
বাকি বিল্লাহ
জলাবদ্ধতায় ঢাকার পথে পথে ভোগান্তি আর কতদিন
টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর কাজীপাড়ায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ছবি: সিজেডএন টুয়েন্টিফোর

সকাল থেকে বৃষ্টি। কখনো ভারী, আবার কখনো ঝিরি ঝিরি। বিকাল পর্যন্ত চলেছে অবিরাম। টানা বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। দুর্ভোগে পড়েন নগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন অফিসগামী মানুষ।

আমার অফিস মতিঝিলের দিলকুশায়। বাসা মিরপুর ২ নম্বরের বড়বাগে। অফিস শুরু ২টায়। বাসা থেকে প্রতিদিন দুপুর ১২টা বা সাড়ে ১২টায় রওনা দেই। কিন্তু বৃষ্টির কারণে আজ রওনা করি পৌনে ১টার দিকে। ১০ নম্বর বা কাজীপাড়া স্টেশন থেকে মেট্রোরেলে মতিঝিল যাই। আজ হাতে বেশি সময় না থাকায় কাজীপাড়া যাওয়ার জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশায় উঠে পড়ি। কিন্তু ৬০ ফুট সড়কের বারেক মোল্লার মোড় থেকে কাজীপাড়া যাওয়ার সড়কে ঢুকে কিছু দূর যাওয়ার পর রিকশাচালক হঠাৎ থেমে যান। আমি সামনে তাকিয়ে দেখি, বৃষ্টির পানি থই থই করছে। কোথাও হাটুসমান আবার কোথাও কোমরসমান পানি।

পানি ঢুকে ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাবে তাই রিকশাচালক আর কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনে যাবে না বলে বেঁকে বসল। অনেক অনুরোধের পরও সে কাজীপাড়া যেতে রাজি হলো না। অফিসে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। তবে আমার বরাত ভালো। একটু সামনেই দুজন ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভ্যানের ওপর স্টিলের বেঞ্চ। সেই বেঞ্চে দুই যাত্রী বসা।

ভ্যানের সামনে ও পেছনে পানির মধ্যে যে দুইজন দাঁড়িয়ে আছেন তারা আমার কাছে কাজীপাড়া যাব কি না জানতে চাইলেন। আমি আর দেরি না করে লাফ দিয়ে ভ্যানে উঠে পড়লাম। এরপর ভ্যানে উঠে সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকলাম।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমার খুব রাগ হচ্ছিল। যারা রাজধানী ঢাকার সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে তাদের গাফিলতির কারণে প্রধান সড়কের পাশাপাশি ছোট ছোট সড়কেও পানি জমছে। ভ্যানে কাজীপাড়ার দিকে যাওয়ার সময় দেখছিলাম পানি ওঠায় মুদি ও স্টেশনারি দোকানগুলো বন্ধ। ভ্যানে যারা সবজি বিক্রি করেন তাদেরও দেখা নেই। জরুরি প্রয়োজনে কিছু মানুষ হাঁটুপানি ডিঙিয়ে গন্তব্যে ছুটছেন। ঝুম বৃষ্টির মধ্যেও কেউ ছাতা মাথায় কেউবা ভিজেই চলাচল করছেন। হাঁটুপানির মধ্যে দিয়ে যেতে তাদের খুব ভোগান্তি হচ্ছে।

Untitled design (55)
রাজধানীর কাজীপাড়ায় জলাবদ্ধতার কারণে আটকে আছে যানবাহন। ছবি: সিজেডএন টুয়েন্টিফোর

সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় রফিকুল ইসলাম নামে এক পথচারী বলেন, ‘আমি গত দুই-তিন বছরে এই সড়কে এভাবে পানি জমে থাকতে দেখিনি। সিটি করপোরেশন ড্রেন ও ম্যানহোলগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ।’

বৃষ্টি কারও জন্য আনন্দের আর কারও জন্য যে খুব কষ্টের-তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। একবার ভেবেছিলাম অফিসে আসবো না। কিন্তু পরে ভাবলাম আমি না গেলেতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হবে না। তাই সব কষ্ট-বিপত্তি উপেক্ষা করে ছুটছি অফিসে যাওয়ার জন্য।

Untitled design (56)
রাজধানীর মতিঝিলের দিলকুশায় জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে মানুষ। ছবি: সিজেডএন টুয়েন্টিফোর

আমাদের নিয়ে যাওয়া সেই বিশেষ ভ্যান এক সময় কাজীপাড়া প্রধান সড়কে পৌঁছাল। ভাবছিলাম স্টেশনের লিফটে ওঠে দ্রুত ট্রেন ধরব। কিন্তু ভ্যানচালক জানালেন, পানি ঢোকার আশঙ্কায় লিফট বন্ধ। তাই সিঁড়ি বেয়েই স্টেশনে ওঠা ছাড়া আমার আর কোনো গতি নেই। ভ্যানচালক দ্রুত আমাদের মেট্রোরেলের কাজীপাড়া স্টেশনের দক্ষিণ দিকের সিঁড়ির কাছে নিয়ে গেলেন। কিন্তু সিঁড়ির কয়েকটি ধাপ ছিল পানির নিচে । এ কারণে পানির মধ্যে নেমেই সিঁড়িতে ওঠলাম। জলাবদ্ধতার কারণে মিরপুরের বড়বাগ থেকে আসতেই এক ঘণ্টা শেষ। অথচ আমার বাসা থেকে এখানে আসতে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট লাগার কথা। জলাবদ্ধতার কারণে জীবনের মূল্যবান সময়ও উৎসর্গ করতে হলো। এরপর স্টেশনের তিনতলায় ওঠে ট্রেন ধরলাম। দুইটা ১০ মিনিটে ট্রেন মতিঝিল স্টেশনে পৌঁছাল। মনে হচ্ছিল এখানেই সব কষ্ট শেষ। কিন্তু আমার জন্য যে আরও ভোগান্তি অপেক্ষা করছিল তা বুঝতে পারিনি। কাজীপাড়া স্টেশনের মতো এই স্টেশনের নিচের অংশ এবং সিঁড়ির কয়েকটি ধাপ পানিতে ডুবে ছিল। স্টেশনের কাছের সড়কেও হাটু পানি। সেই পানি ডিঙিয়ে আমাকে অফিসে আসতে হয়েছে। এখানেও আমার মতো শত শত মানুষকে জলাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এই মেগাসিটিতে অবর্ণনীয় কষ্টের এই দিনের কথা মনে থাকবে অনেক দিন। আমাদের এই কষ্টের পেছনে যারা দায়ী তাদের ধিক্কার জানানো ছাড়া আর কিইবা করার আছে। তবুও দায়িত্বশীলরা যদি জলাবদ্ধতা নিরসনের যথাযথ উদ্যোগ নিতেন তাহলে স্বস্তি পেতেন রাজধানীর লাখ লাখ মানুষ।

সড়ক দিয়ে বিশেষ ভ্যানে কাজীপাড়া যাওয়ার সময় মানুষের দুর্দশা দেখছিলাম আর ভাবছিলাম আমাদের নেতারা ও সরকারি কর্মকর্তারা দেশের উন্নয়ন নিয়ে অনেক কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবতা খুবই করুণ।

নির্বাচনের আগে রাজনীতিবিদরা অনেক প্রতিশ্রুতিই দেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের আর খোঁজ থাকে না। এটা সাধারণ মানুষের সঙ্গে তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। তা না হলে বৃষ্টিতে কেন রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে। কেন মানুষ ভোগান্তি পোহাবে। শুধু রাজনীতিবিদরাই নন, সরকার , সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকসহ প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

/বিবি/