শিরোনাম

হরমুজে অবরোধ প্রত্যাহারে যুক্তরাষ্ট্রকে সৌদির চাপ

সিটিজেন ডেস্ক
হরমুজে অবরোধ প্রত্যাহারে যুক্তরাষ্ট্রকে সৌদির চাপ
হরমুজ প্রণালি। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ থেকে সরে আসার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়িয়েছে সৌদি আরব। রিয়াদ চাইছে, এই পরিস্থিতিতে সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে দ্রুত আলোচনায় ফিরে আসুক সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের (ডব্লিউএসজে) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি নেতৃত্ব আশঙ্কা করছে—এই অবরোধের জবাবে ইরান লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে, যা পুরো অঞ্চলের জন্য নতুন সংকট তৈরি করবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে যে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করলে তেহরান উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।

বাব আল-মান্দেব নিয়ে উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ মূলত ইরানের দুর্বল অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে নেওয়া হয়েছে। তবে রিয়াদের বড় আশঙ্কা, এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে।

লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই নৌপথটি সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এটি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

গত ছয় সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাতে ইরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক অবকাঠামোয় আঘাত হানার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি তেল ও গ্যাস কৌশল এখন চাপে পড়েছে।

বিকল্প পথও ঝুঁকিতে

হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে পড়লে সৌদি আরব অতীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে তেল লোহিত সাগরে পৌঁছে দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল রপ্তানি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু বাব আল-মান্দেব বন্ধ হয়ে গেলে সেই বিকল্প ব্যবস্থাও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়বে।

বর্তমানে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা এই নৌপথের উপকূলীয় বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। গাজায় যুদ্ধ চলাকালে তারাই এই রুটে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন সৃষ্টি করেছিল।

আরব কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান এখন হুতিদের ওপর চাপ দিচ্ছে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করার জন্য।

নিউ আমেরিকা পলিসি ইনস্টিটিউটের ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম ব্যারন মনে করেন, বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করতে চাইলে হুতিরাই ইরানের জন্য সবচেয়ে কার্যকর অংশীদার হতে পারে। কারণ, অতীত অভিজ্ঞতায় তারা এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে।

ইরানের হুঁশিয়ারি

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের ঘনিষ্ঠ বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, হরমুজে বন্দর অবরোধ অব্যাহত থাকলে ইরান লোহিত সাগরের প্রবেশপথেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা আলি আকবর বেলায়েতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় বলেছেন, তেহরান বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে হরমুজের মতোই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, হোয়াইট হাউস যদি একই ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত পুনরায় নেয়, তবে অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিতে পারে।

সোমবার ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে ইরানের বন্দরগুলো যদি অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তবে এই অঞ্চলের অন্য কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান হরমুজ প্রণালি সব সময় উন্মুক্ত থাকুক।

তার দাবি, উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে ইরান কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশগুলোকে চাপের মুখে ফেলতে না পারে।

তবে ছয় সপ্তাহ ধরে চলা ইরান-সংক্রান্ত সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের অঘোষিত সমঝোতাকে ভেঙে দিয়েছে। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো এখন চাইছে, ইরান যেন হরমুজ প্রণালির ওপর একক প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।

এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তারা সামরিক সংঘাত নয়, বরং দ্রুত ও কার্যকর কূটনৈতিক সমাধানের ওপরই জোর দিচ্ছে।

/এমআর/