শিরোনাম

অস্তিত্ব সংকটে ‘বাংলা পঞ্জিকা’

সিটিজেন ডেস্ক
অস্তিত্ব সংকটে ‘বাংলা পঞ্জিকা’
প্রতীকী ছবি

এক সময় বাঙালির ঘরের দেয়ালে শোভা পেত ১২ মাসের বাংলা পঞ্জিকা। সকালে ঘুম থেকে উঠে কোন তারিখ, আজ কী তিথি, কিংবা শুভকাজের মাহেন্দ্রক্ষণ—সবকিছুর জন্যই ভরসা ছিল কাগজের সেই দিনপঞ্জি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই পরিচিত পঞ্জিকা আজ বাঙালির অন্দরমহল থেকে প্রায় নির্বাসিত।

বাংলা নববর্ষের আগমনে চারদিকে যে প্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠে, তা সত্যিই অনন্য। পহেলা বৈশাখ মানেই বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা, লোকজ মেলা, নতুন পোশাকের ঘ্রাণ আর পান্তা-ইলিশের চিরাচরিত উৎসব। এই একটি দিন আমরা যেন নতুন করে নিজেদের বাঙালি পরিচয়ে সিক্ত হই, শিকড়ের টানে মেতে উঠি উৎসবে।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো, এই একদিনের প্রবল আবেগ বছরের বাকি সময়টাতে অনেকটা ম্লান হয়ে যায়। ঘটা করে নববর্ষ উদযাপন করলেও দৈনন্দিন জীবনে বাংলা সনের ব্যবহার নেই বললেই চলে। উৎসবের রেশ কাটতেই আমরা আবার ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। ফলে পঞ্জিকার পাতা উল্টে নিয়মিত বাংলা তারিখের খোঁজ রাখেন, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের এই একদিনের বাঙালিয়ানা কি তবে কেবলই আনুষ্ঠানিকতা?

ইংরেজি ক্যালেন্ডার নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ার আগে একসময় বাংলা বর্ষপঞ্জিও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। বিশেষ করে কৃষকরা বাংলা মাসের হিসাব করে চাষাবাদ করতো। গ্রামেগঞ্জে এখনও এটি করা হয়। যেমন, কোন ফসল কখন লাগাতে হবে– তা অনেক কৃষক এখনো বৈশাখ, আষাঢ়, কার্তিক ইত্যাদি মাস ধরে ঠিক করেন। ফসল তোলার সময়ও বাংলা মাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।

বাংলা মাসগুলো সরাসরি ঋতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই আবহাওয়ার হিসাবনিকাশে কৃষকরা বাংলা বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করেন। যেমন, কোন মাসে বৃষ্টি হবে বা জমি শুকনো থাকবে – এই ধারণা থেকে সেচ দেওয়া বা সার প্রয়োগের সময় ঠিক করা হয়। গ্রামে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে কৃষি সম্পর্কিত দেনা-পাওনার হিসাব অনেক সময় বাংলা নববর্ষে (পহেলা বৈশাখে) নতুন করে শুরু করা হয়। তবে কৃষি ছাড়া অন্যান্য পেশায় বিশেষ করে আধুনিক পেশায় বাংলা বর্ষপঞ্জির উপর নির্ভরতা নেই বললেই চলে।

বাংলা সনের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। মোগল সম্রাট আকবর কৃষিজমি থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে যে ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ চালু করেছিলেন, তারই বিবর্তিত রূপ আজকের বাংলা ক্যালেন্ডার। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে এর সংস্কার হয়েছে। ১৯৫২ সালে ভারতে ড. মেঘনাদ সাহা এবং ১৯৬৬ সালে বাংলাদেশে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ১৪ এপ্রিলকে নববর্ষের স্থায়ী দিন হিসেবে নির্ধারণ করে পঞ্জিকা পুনর্বিন্যাস করে। তবে এই সংস্কার নিয়ে এখনো অনেক বিশেষজ্ঞের মধ্যে তাত্ত্বিক মতভেদ রয়েছে।

এক সময় বাংলা নববর্ষের আগে পঞ্জিকা বিক্রির ধুম পড়তো। ঢাকার বাংলাবাজার বা নিউমার্কেট এলাকায় এখন আর সেই উৎসবমুখর পরিবেশ নেই।

বঙ্গবাজার বই মার্কেটের দীর্ঘদিনের পঞ্জিকা বিক্রেতা অরুন দাস আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে বছরে হাজারখানেক পঞ্জিকা বিক্রি করতাম, এখন সারা দিনে ১০-১২টা বিক্রি হওয়াই কঠিন।’

এদিকে, ব্যবসায়িক প্রচারের অংশ হিসেবে ‘হালখাতা’য় ক্যালেন্ডার উপহার দেওয়ার যে রীতি ছিল, সেটিও এখন নামমাত্র টিকে আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যান্ত্রিকতা আর বিশ্বায়নের যুগে পঞ্জিকার রূপ হয়তো বদলাবে, কিন্তু এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অপরিসীম। পহেলা বৈশাখ বা বিশেষ দিনগুলোতে বাঙালিয়ানা ফুটে উঠলেও বছরের বাকি সময় বাংলা তারিখের ব্যবহার নগণ্য।

ঐতিহ্যবিদদের মতে, কেবল একদিনের উৎসব নয়, বরং শিক্ষা ও প্রাত্যহিক জীবনে বাংলা ক্যালেন্ডারের চর্চা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। কাগজের পঞ্জিকা যদি বিলুপ্তও হয়, ডিজিটাল মাধ্যমে এর সঠিক তথ্য ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

/এসবি/