শিরোনাম

ইরানের তেল স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা, নিহত অন্তত ৪১

সিটিজেন ডেস্ক
ইরানের তেল স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা, নিহত অন্তত ৪১
ইরানের রাজধানী তেহরানে জ্বালানি ডিপোতে হামলার পর নালায় ছড়িয়ে পড়া তেলে আগুন জ্বলছে। ছবি: এএফপি

ইরানের তেল ও জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। যুদ্ধের নবম দিনে রবিবার (৮ মার্চ) রাজধানী তেহরান ও এর পশ্চিমাঞ্চলে কয়েকটি তেলের ডিপো ও শোধনাগারে দফায় দফায় হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলায় অন্তত ৪১ জন নিহত হয়েছেন।

হামলার পর তেহরানজুড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কুণ্ডলী পাকানো আগুনে রাতের আকাশ লালচে আভা ধারণ করে। ক্ষতিগ্রস্ত ডিপো থেকে তেল নালায় ছড়িয়ে পড়ায় সড়কের পাশে ‘আগুনের নদী’ তৈরি হয়। আর দিনের বেলায় শহরের আকাশ ছিল ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর প্রথম দিকে তেহরানের সামরিক স্থাপনা ও শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেসামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হামলা চালানো হচ্ছে। গতকাল প্রথমবারের মতো ইরানের জ্বালানি খাতকে বড় পরিসরে নিশানা করা হয়।

পাল্টা হামলা ইরানের

তেল স্থাপনায় হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। সৌদি আরব, কুয়েত ও জর্ডানে মার্কিন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।

সৌদি আরবের আল-খার্জ গভর্নরেটের একটি কম্পাউন্ডে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে এক বাংলাদেশি ও এক ভারতীয় নিহত হন। কুয়েতে বিমানবন্দর, জ্বালানি ডিপো ও নিরাপত্তা ভবনে হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে তেল উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে কুয়েত।

এ ছাড়া ইসরায়েলের তেল আবিব ও হাইফাসহ কয়েকটি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এসব হামলায় ইসরায়েলে তিনজন আহত হয়েছেন। বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করার সময় ধ্বংসাবশেষ পড়ে তিনজন আহত হয়েছেন। ইরাকের এরবিলে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধ

চলমান সংঘাত ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত সংঘাত ১২টি দেশে বিস্তৃত হয়েছে। ইরান ছাড়া এসব দেশে অন্তত ৩৩ জন নিহত হয়েছেন।

ইরানে নিহতের সংখ্যা দুই দিন ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো না হলেও গত শুক্রবার (৬ মার্চ) দেশটির রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছিল, দেশটিতে ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন। রবিবারের ৪১ জনকে যোগ করলে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ১ হাজার ৩৭৩।

‘মনে হচ্ছিল কিয়ামত শুরু হয়েছে’

তেহরান ও পাশের আলবোরজ প্রদেশের কারাজ শহরে কয়েকটি তেল স্থাপনায় হামলার কথা জানিয়েছে ইরানের তেল মন্ত্রণালয়। হামলার পর বিশাল আগুনে চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তেহরানের শাহরান তেলের ডিপোতে হামলার পর নালা দিয়ে তেল প্রবাহিত হয়ে আগুন ধরে যায়। এতে সড়কের পাশে ‘আগুনের নদীর’ মতো দৃশ্য তৈরি হয়।

তেহরানের এক বাসিন্দা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, গত রাতে এমন বিস্ফোরণ দেখেছি, যা আগে কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল যেন কিয়ামত শুরু হয়েছে।

তেলের স্থাপনায় হামলার ফলে বিষাক্ত বৃষ্টি ঝরতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট। এতে ত্বক ও ফুসফুসের ক্ষতি হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষকে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি সরবরাহে সীমা

হামলার পর তেহরানে জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে। শহরের প্রশাসন জানিয়েছে, একজন ব্যক্তি দিনে সর্বোচ্চ ২০ লিটার তেল নিতে পারবেন। আগে এই সীমা ছিল ৩০ লিটার।

তেহরানের গভর্নর মোহাম্মদ সাদেক মোতামেদিয়ান জনগণকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা হবে।

নতুন মোড় নিচ্ছে যুদ্ধ

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফুয়াদ ইজাদি আল-জাজিরাকে বলেন, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা এ যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তার ভাষায়, এখন স্থানীয় সময় দুপুর, কিন্তু ধোঁয়ার কারণে মনে হচ্ছে যেন রাত নেমে এসেছে।

ইসরায়েলের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানে প্রায় ৩ হাজার ৪০০টি হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির ১৫০টির বেশি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রই প্রধান লক্ষ্য

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা ২৭তম দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সংস্থাটির দাবি, তাদের হামলার ৬০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও স্বার্থকে লক্ষ্য করে।

আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নায়েনি বলেন, আমরা এ যুদ্ধে আমেরিকানদের প্রধান শত্রু মনে করি। তাই তাদের শাস্তি দেওয়া আমাদের অগ্রাধিকার।

তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকলে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি স্বার্থকেও লক্ষ্য করা হবে। তার ভাষায়, তেলের দাম যদি প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলার দেখতে চাও, তাহলে এই খেলা চালিয়ে যেতে পারো।

লেবাননেও হামলা

ইরানের পাশাপাশি লেবাননেও হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত ৮৩ শিশুসহ ৩৯৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজারের বেশি মানুষ।

যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান চীনের

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চালানো উচিত হয়নি। তিনি অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানান।

ওয়াং ই বলেন, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বর্তমান সংকটের সমাধান হবে না। বিশ্ব আবার জোর যার মুল্লুক তার যুগে ফিরে যেতে পারে না।

/এসএ/