শিরোনাম

ভুয়া কিস্তির রশিদে প্লট ছাড়লো রাজউক

ভুয়া কিস্তির রশিদে প্লট ছাড়লো রাজউক
ছবি: সিটিজেডএন টোয়েন্টিফোর

চার দশক আগে বরাদ্দ পাওয়া নিকুঞ্জ-২ আবাসিক এলাকার একটি প্লটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তির টাকা কখনোই জমা হয়নি। অথচ অন্য একটি প্লটের ব্যাংক রশিদ ওই নথিতে সংযুক্ত করে সব কিস্তি পরিশোধ হয়েছে দেখিয়ে প্লটটি উত্তরাধিকারীদের নামে নামজারি, আমমোক্তার নিয়োগ, দখল হস্তান্তর, লিজ দলিল নিবন্ধন ও বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। শুধু তা-ই নয়, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে একই পরিবারের নামে গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকায় পৃথকভাবে বরাদ্দ থাকা আরও দুটি প্লটও বহাল রাখা হয়েছে। তবে সংস্থাটির দাবি, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

রাজউকের নথি অনুযায়ী, নিকুঞ্জ-২ আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর (২ কাঠা ৮ ছটাক আয়তন) প্লটটি ১৯৮৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আব্দুস সাত্তারের নামে চূড়ান্তভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দপত্রের তথ্যমতে প্রথম কিস্তি ১৯৮৫ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে এবং পরবর্তী তিন কিস্তি যথাক্রমে ১৯৮৬, ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে পরিশোধ করার কথা ছিল।

নথিতে প্রথম কিস্তি নির্ধারিত সময়ে পরিশোধের তথ্য থাকলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তি সময় মতো জমা দেওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপর চতুর্থ কিস্তি জমা হয় ২০২২ সালের ১৮ মে, অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের ৩৪ বছর পর। অথচ আইন অনুযায়ী বরাদ্দপত্র পাওয়া পর সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত অতিরিক্ত সুদসহ বকেয়া কিস্তি পরিশোধের সুযোগ থাকে। এরপরও নথিতে সব কিস্তি পরিশোধ হয়েছে উল্লেখ করে প্লটটির সব ধরনের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়।

নথি ঘেঁটে দেখা যায়, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তির বিপরীতে সংযুক্ত দুটি ব্যাংক রশিদ প্রকৃতপক্ষে ওই প্লটের নয়। রশিদ দুটি নিকুঞ্জ-২ আবাসিক এলাকার কবি ফারুক স্মরণী সড়কের ৩ নম্বর প্লটের বরাদ্দগ্রহীতা মঞ্জুরুল হকের নথিতে সংরক্ষিত রশিদের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। দুই নথির রশিদ নম্বর, তারিখ ও জমার পরিমাণ একই। শুধু বরাদ্দগ্রহীতার নাম ও প্লট নম্বর পরিবর্তন করে রশিদ দুটি ১৪ নম্বর প্লটের নথিতে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে বিশ্লেষণে দেখা গেছে।

আরও দেখা যায়, উত্তরাধিকারীদের আবেদনে শুধু প্রথম কিস্তি পরিশোধের কথা উল্লেখ করা হলেও পরবর্তী সারসংক্ষেপে সব কিস্তি পরিশোধ হয়েছে বলে নোট দেওয়া হয়। একই নথির ভিন্ন ভিন্ন অংশে কিস্তি পরিশোধ নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্যও রয়েছে।

আমরা এই বিষয়ে তদন্ত করেছি। তদন্তে অনিয়ম ধরা পড়লে বিধি মোতাবেক যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং যেসকল কর্মকর্তা বা কর্মচারি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম চেয়ারম্যান, রাজউক

আমমোক্তার দলিলেও মিলেছে অসঙ্গতি। সেখানে প্রথম কিস্তির পরিমাণ ৩০ হাজার টাকা এবং তা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডে জমা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ মূল বরাদ্দপত্রে প্রথম কিস্তির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৬৬৭ টাকা এবং সেই অর্থ সোনালী ব্যাংকের ডিআইটি শাখার নির্ধারিত হিসাবে জমা দেওয়ার শর্ত ছিল।

নথির হাজিরা শিটে মো. আলাউদ্দীন নামের এক উত্তরাধিকারীর স্বাক্ষরের তারিখ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওই তারিখের আগেই মারা গেছেন বলে অন্য সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া ওয়ারিশান সনদ, এমআইএস শাখার মতামত, ভূমি অধিগ্রহণের একটি অ্যাওয়ার্ড সনদ এবং ব্যাংক স্টেটমেন্টের বিভিন্ন অংশেও অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। ব্যাংক স্টেটমেন্টে জমার অঙ্ক ও মোট হিসাবের মধ্যেও রয়েছে গরমিল।

রাজউকের নোটশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পরিবারের নামে গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকায় আরেকটি প্লট বরাদ্দ থাকায় বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং নিকুঞ্জের প্লটটি বহাল রাখার পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রীর নামে পৃথকভাবে বরাদ্দ থাকা আরও দুটি প্লটও বহাল রাখা হয়।

নথি অনুযায়ী, এস্টেট ও ভূমি-১ শাখার তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত এক পরিচালক প্লটটি নিয়ে বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মো. মিজানুর রহমান সব তথ্য সঠিক রয়েছে বলে মত দেন। তার মতামতের ভিত্তিতেই উত্তরাধিকারীদের নামে নামজারি, আমমোক্তার নিয়োগ, দখল হস্তান্তর, লিজ দলিল নিবন্ধন এবং বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়।

নথি অনুযায়ী, এস্টেট ও ভূমি-১ শাখার তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত এক পরিচালক প্লটটি নিয়ে বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মো. মিজানুর রহমান সব তথ্য সঠিক রয়েছে বলে মত দেন। তার মতামতের ভিত্তিতেই উত্তরাধিকারীদের নামে নামজারি, আমমোক্তার নিয়োগ, দখল হস্তান্তর, লিজ দলিল নিবন্ধন এবং বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়।

এদিকে রাজউকের ২৫তম সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্লটটির বিভিন্ন অসঙ্গতি তদন্তে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে কমিটির মতামত বা তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়াই প্লট-সংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

যা বললেন কর্মকর্তারা

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের সাবেক পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. মিজানুর রহমান শনিবার (১৮ জুলাই) রাতে বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি এখন বলতে পারবো না। আপনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলুন।’

বর্তমান পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ফাইলে তথ্যের যে অসঙ্গতি রয়েছে তা খুবই অস্বাভাবিক। আজ (১৯ জুলাই) সকালে এই নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।’

সার্বিক বিষয় জানতে চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘আমরা এই বিষয়ে তদন্ত করেছি। তদন্তে অনিয়ম ধরা পড়লে বিধি মোতাবেক যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং যেসকল কর্মকর্তা বা কর্মচারি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

/এসএ/