শিরোনাম

চীনের স্টেলথ যুদ্ধবিমান নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
চীনের স্টেলথ যুদ্ধবিমান নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত
চীনের জে-২০ মাইটি ড্রাগন স্টেলথ যুদ্ধবিমান

দ্রুত বদলে যাচ্ছে আধুনিক যুদ্ধের ধরন। যেখানে একসময় যুদ্ধবিমান মানেই ছিল গতি, অস্ত্রশক্তি ও কৌশল, সেখানে এখন সবচেয়ে বড় নির্ধারক হয়ে উঠেছে স্টেলথ প্রযুক্তি। রাডারের চোখ ফাঁকি দিয়ে শত্রুপক্ষের আকাশসীমায় প্রবেশ, গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা এবং নিরাপদে ফিরে আসার সক্ষমতাই এখন একটি দেশের বিমানবাহিনীর শক্তিমত্তা নির্ধারণ করছে। এই বাস্তবতায় চীন ও ভারতের সামরিক সক্ষমতার তুলনায় নতুন করে সামনে এসেছে উদ্বেগজনক এক চিত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ওয়ার জোনে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে চীনের সামরিক বিমান সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস রুপরেখ্ট জানিয়েছেন, চীনের বিমানবাহিনীর হাতে বর্তমানে পঞ্চম প্রজন্মের প্রায় ৫০০টি কার্যকর জে-২০ ‘মাইটি ড্রাগন’ স্টেলথ যুদ্ধবিমান রয়েছে। এই সংখ্যা সঠিক হলে এটি পূর্ববর্তী বিভিন্ন অনুমানের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি এবং বিশ্বের অন্যতম উন্নত যুদ্ধবিমান উৎপাদনে চীনের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ইঙ্গিত বহন করে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জে-২০ শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও চীনের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধবিমান এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে এটি রাডারে সহজে ধরা না পড়ে, শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং শত্রুর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দ্রুত ও কার্যকর হামলা চালাতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে এটি আকাশযুদ্ধে টিকে থাকার সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।

অন্যদিকে, একই সময়ে ভারতের সামনে ভিন্ন এক বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে। দেশটির বিমানবাহিনীর হাতে বর্তমানে কার্যকর কোন স্টেলথ যুদ্ধবিমান নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, এই শূন্যতা শুধু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়; ভবিষ্যৎ যুদ্ধের কৌশলগত প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও এটি বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের উন্নয়নাধীন অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এএমসিএ) প্রকল্প ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি বিমানবাহিনীতে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে অন্তত আরও এক দশক সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ নিকট ভবিষ্যতে ভারতের নিজস্ব স্টেলথ যুদ্ধবিমান পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত।

এদিকে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির একটি প্রতিবেদনের বলা হয়েছে, চীন ইতোমধ্যে তাদের কিছু জে-২০ যুদ্ধবিমান তিব্বতে মোতায়েন করেছে। ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চল ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় বিষয়টি নয়াদিল্লির জন্য বাড়তি কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে স্টেলথ যুদ্ধবিমান সবচেয়ে আগে শত্রুপক্ষের আকাশসীমায় প্রবেশ করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দেয়। এরপর অন্যান্য যুদ্ধবিমান ও সামরিক প্ল্যাটফর্ম তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশে অভিযান পরিচালনার সুযোগ পায়। ফলে স্টেলথ সক্ষমতা এখন শুধু একটি যুদ্ধবিমানের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং পুরো বিমান অভিযানের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষণে ভারতের সাম্প্রতিক সামরিক পরিকল্পনার প্রসঙ্গও এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাতে ভারত বিমানশক্তিকে কেন্দ্রীয় কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছে। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় স্টেলথ প্রযুক্তিতে দেশটি এখনো অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।

রাশিয়ার সু-৫৭ যুদ্ধবিমানকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে আলোচনা করা হলেও বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি আদর্শ স্টেলথ প্ল্যাটফর্ম নয় এবং ভারতের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্যও সবচেয়ে কার্যকর সমাধান নাও হতে পারে। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে এটিই ভারতের জন্য বাস্তবসম্মত আমদানিযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপের ৬ষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কর্মসূচি ‘এফসিএএস’-এ ভারতের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও সেটি আগামী দশকের পরিকল্পনা।

বিশ্লেষকদের ধারণা, যখন ভারতের এএমসিএ যুদ্ধবিমান বাস্তবে বিমানবাহিনীতে যুক্ত হবে, তখন চীনের হাতে প্রায় এক হাজার জে-২০ থাকতে পারে। শুধু তাই নয়, এরই মধ্যে চীন ৬ষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানও বহরে যুক্ত করার পথে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

তাদের মতে, শুধু স্টেলথ যুদ্ধবিমানের সংখ্যা দিয়েই সামরিক শক্তি বিচার করা যায় না। ভারত ইতোমধ্যে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, স্টেলথ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, উন্নত সেন্সর এবং সমন্বিত নজরদারি নেটওয়ার্ক তৈরিতে বিনিয়োগ করছে। এসব সক্ষমতা স্টেলথ যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা কিছুটা কমিয়ে আনতে এবং নিজস্ব সীমাবদ্ধতার প্রভাব আংশিকভাবে মোকাবিলা করতে সহায়তা করতে পারে। তারপরও বাস্তবতা বলছে, সংখ্যাগত ও প্রযুক্তিগত ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে।

/এসবি/