শিরোনাম

দেশে এইডস আক্রান্ত ৭৫% বিদেশফেরত ব্যক্তি

দেশে এইডস আক্রান্ত ৭৫% বিদেশফেরত ব্যক্তি
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

দেশে এইডস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আক্রান্তদের অধিকাংশই বিদেশফেরত বাংলাদেশি। বিদেশে যাওয়ার আগে প্রত্যেকের জন্য এইচআইভি/এইডস পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। তবে দেশে ফেরত আসার সময় এই ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষার আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। এ কারণে যারা এইডস নিয়ে দেশে ফিরছেন তাদের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরাও এইডসে আক্রান্ত হচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট এইচআইভি/এইডস পজিটিভ ব্যক্তিদের প্রায় ৭৫ শতাংশ সরাসরি বিদেশফেরত ব্যক্তি অথবা তাদের স্ত্রী। বিমানবন্দরগুলোতে এইচআইভি/এইডস পরীক্ষা কিংবা অন্য কোনো রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থাও নেই। এতে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে এইচআইভির সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তবে বিমানবন্দরগুলোতে এইচআইভি সংক্রমণ পরীক্ষার ব্যবস্থা করার বিষয়টি সরকারের জন্য এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এইডসের বিস্তার রোধে করণীয়

বিদেশফেরত ব্যক্তিরা ইচ্ছা করলে দেশের ২৩ জেলায় সরকারি হাসপাতাল বা নির্দিষ্ট এইচটিসি (এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং) কেন্দ্রে বিনা মূল্যে পরীক্ষা ও পরামর্শ নিতে পারে।

বিদেশফেরত ব্যক্তিরা ইচ্ছা করলে দেশের ২৩ জেলায় সরকারি হাসপাতাল বা নির্দিষ্ট এইচটিসি (এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং) কেন্দ্রে বিনা মূল্যে পরীক্ষা ও পরামর্শ নিতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এইচআইভি/ এইডসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, যদি কোনো নারী বা পুরুষ কর্মী বিদেশ থেকে ফেরার পর মনে করেন তিনি ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের শিকার হয়েছেন, তবে তার দ্রুত নিকটস্থ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা এইচটিসি কেন্দ্রে পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত। এই কেন্দ্রে পরীক্ষার বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয় এবং চিকিৎসাও বিনা মূল্যে দেওয়া হয়।

দেশের বিমানবন্দরগুলোতে এইচআইভি/এইডস পরীক্ষার ব্যবস্থা কেন নেই-এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক ডা. মো. খায়রুজ্জামান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় রয়েছে। তবে দেশের চারটি বিমানবন্দরে একটি করে ক্লিনিক রয়েছে যেখানে যে কেউ ইচ্ছা করলে এ রোগ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারবে। তবে বিদেশে যারা চাকরি নিয়ে যাচ্ছেন এই রোগের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’

দেশে এইচআইভি/ এইডসের সর্বশেষ চিত্র

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৯৮৯ সালে প্রথম এইডস রোগী শনাক্ত হয় । সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার এখন শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশের নিচে। তবে মাদক গ্রহণকারী ও সমকামী পুরুষের মধ্যে সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। দেশ এখন পর্যন্ত এইডস রোগীর সংখ্যা ১৪ হাজার ৩১৩ এবং এই রোগে মারা গেছেন ২ হাজার ৬৬৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এইডসে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৮১ শতাংশ, নারী ১৮ শতাংশ এবং হিজড়া ১ শতাংশ। ২৫-৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে সংক্রমণের হার সবেচেয়ে বেশি-৬২ দশমিক ৬১ শতাংশ। এ ছাড়া ২০-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে সংক্রমণের হার ২১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে বিবাহিত ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ, অবিবাহিত ৪২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ও সাধারণ জনগোষ্ঠী ২২ শতাংশ ।

ঝুঁকিপূর্ণগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমকামী পুরুষ ৩৪ শতাংশ, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ৬ শতাংশ, অভিবাসী জনগোষ্ঠী ১২ শতাংশ এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১১ শতাংশ আক্রান্ত। ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত রোহিঙ্গা রোগী ২১৭ জন।

ঝুঁকিপূর্ণগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমকামী পুরুষ ৩৪ শতাংশ, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ৬ শতাংশ, অভিবাসী জনগোষ্ঠী ১২ শতাংশ এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১১ শতাংশ আক্রান্ত। ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত রোহিঙ্গা রোগী ২১৭ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ সালে ৭২৯ জন, ২০২২ সালে ৯৪৭ জন, ২০২৩ সালে এক হাজার ২৭৬ জন, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৪৩৮ জন ও ২০২৫ সালে সর্বোচ ১ হাজার ৮৯১ জনের এইচআইভির সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ২০২১ সালে ২০৫, ২০২২ সালে ২৩২, ২০২৩ সালে ২৬৬, ২০২৪ সালে ১৯৫ ও ২০২৫ সালে ২৫৪ জন মারা যান।

রাজধানীর মহাখালী সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতালে এইচআইভি/এইডস আক্রান্তদের জন্য ২৫টি শয্যা রয়েছে। গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সেখানে ২৩ জন এইচআইভি/এইডস পজিটিভ রোগী ভর্তি রয়েছে। ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই প্রবাসী বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশ এইচআইভি এইডসের সংক্রমণ বাড়লেও ইতিবাচক দিক আছে। সেটি হচ্ছে আক্রান্তদের চিকিৎসার আওতায় আসার হার বেড়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এইডস নির্মূলের বিশ্বব্যাপী ‘৯৫-৯৫-৯৫’ লক্ষ্যমাত্রার দিকে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে শনাক্ত হওয়া ৮২ শতাংশ তাদের অবস্থা সম্পর্কে জানেন, ৭৪ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছেন এবং চিকিৎসাধীনদের ৯১ শতাংশের শরীরে ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বিদেশফেরত ব্যক্তিদের কারণে এইডসের সংক্রণ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এ পরিস্থিতিতে এই রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে দেশের প্রতিটি বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে–নজীর আহমেদ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, প্রবাসীদের একটি স্বাস্থ্য কার্ড এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে একটি হটলাইন থাকা দরকার। বিদেশে এটির পরীক্ষা নিয়মিত হয়। এইচআইভি পজিটিভ হলে বিদেশ থেকে ওই কর্মীকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য।

/বিবি/