শিরোনাম

অলস জীবন ডেকে আনছে অসংক্রামক রোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
অলস জীবন ডেকে আনছে অসংক্রামক রোগ
অলস জীবনযাপনে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

আধুনিক জীবনযাত্রায় কায়িক শ্রম কমে যাওয়ায় দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে বাংলাদেশে ৫ কোটির বেশি মানুষ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর অলস জীবনযাপন শুধু বড়দের নয়, শিশু-কিশোরদেরও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে। খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গার সংকটে তারা মাঠের খেলাধুলার বদলে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ট্যাব ও কম্পিউটারে বেশি সময় কাটাচ্ছে।

চলতি বছরের জুনে আইসিডিডিআর,বির প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে চারজন, অর্থাৎ প্রায় ৮৩ শতাংশ শিশু প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় ডিজিটাল স্ক্রিনে কাটায়। প্রতিটি শিশু গড়ে দিনে প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাব, কম্পিউটার ও গেমিং ডিভাইস ব্যবহার করে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় ভুগছে। প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু ঘনঘন মাথাব্যথার কথা জানিয়েছে। দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করা শিশুদের গড় ঘুমের সময় মাত্র ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা।

আরও দেখা গেছে, প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় ভুগছে। যারা বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে এই প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। একইসঙ্গে প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে প্রায় দুজন দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যাসহ এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।

বড়দের মধ্যেও শারীরিক কসরত ও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কমছে। লাঠিখেলা, কাবাডি, কুস্তি (বলি), নৌকাবাইচ ও ঘোড়দৌড়ের মতো খেলাগুলো থেকেও মানুষ দূরে সরে যাচ্ছে।

ডব্লিউএইচওর এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে কায়িক শ্রমের অভাবে ৫ কোটি ২০ লাখ মানুষ অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এটি দেশের মোট জনসংখ্যার ২৯ শতাংশ। এসব রোগের মধ্যে রয়েছে– হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, ক্যানসার, স্থূলতা ও ডায়াবেটিস।

২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশসহ ১৬৩টি দেশ ও এলাকার ৫০৭টি জনসংখ্যাভিত্তিক জরিপের তথ্য নিয়ে এই গবেষণা করে ডব্লিউএইচও। এতে ৫৭ লাখ মানুষের উপাত্ত ব্যবহার করা হয়। ২০২৩ সালের ২৫ জুন চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘ল্যানসেট’-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গা কমে যাওয়ায় শিশু-কিশোরদের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার সুযোগও কমে গেছে। দৌড় প্রতিযোগিতা, গোল্লাছুট, ইচিং-বিচিং, দাঁড়িয়াবন্ধা ও বউচির মতো খেলাগুলো এখন অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। নদী, পুকুর ও জলাশয় ভরাট হওয়ায় অনেক শিশু সাঁতারও শিখতে পারছে না।

বড়দের মধ্যেও শারীরিক কসরত ও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কমছে। লাঠিখেলা, কাবাডি, কুস্তি (বলি), নৌকাবাইচ ও ঘোড়দৌড়ের মতো খেলাগুলো থেকেও মানুষ দূরে সরে যাচ্ছে।

এর বিপরীতে টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ট্যাব ও কম্পিউটারে অনলাইন গেমের প্রতি আসক্তি বাড়ছে। অনলাইন গেমের নামে ভার্চুয়াল মাধ্যমে জুয়া, মাদকসংশ্লিষ্ট গ্রুপ ও ডার্ক ওয়েব সাইটে ঝুঁকছে। ফলে তারা নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের পরিচালক (মিরপুর) অধ্যাপক ড. খোরশেদ আলী মিয়া বলেন, কায়িক পরিশ্রম না করলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং ঘুমের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম না করলে মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ কমে যায়, যা স্মৃতিভ্রংশ, আলঝেইমারসসহ নানা নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের আশঙ্কা তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞ মহল বলছে, সুস্থতার জন্য কায়িক শ্রম ও নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই। দেশে খেলার মাঠ, বিদ্যালয়ে শরীরচর্চা বা খেলাধুলার সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি-লিফট-চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহারের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। মোবাইল ফোন, ইউটিউব, টিকটক, ইন্টারনেট, টেলিভিশন, কম্পিউটার গেম ও ফেসবুকের অপব্যবহার হচ্ছে। এগুলো ব্যবহারে শিশুসহ যে কোনো বয়সের মানুষের অলস জীবনযাপনের প্রবণতা বাড়ছে।

/এফসি/