শিরোনাম

পরিবারে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে যেসব বিষয়

পরিবারে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি 
সৃষ্টি করছে যেসব বিষয়
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার ও সাধারণ চুলা ব্যবহারসহ বেশকিছু কারণে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে দেশের অনেক পরিবার। পরিবারের সদস্যদের সুস্বাস্থ্যের বিষয়টি শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত রান্নাঘর ও শৌচাগার ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত পরিবারগুলোর সদস্যরা ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, জ্বর এবং সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পরিসংখ্যান বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর এক গবেষণায় স্বাস্থ্যঝুঁকির এই চিত্র ওঠে এসেছে।

গবেষকেরা প্রায় ২৪ হাজার পরিবারের ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখিয়েছেন বাংলাদেশে একটি পরিবারের সার্বিক সুস্থতা কেবল ভাগ্যের ওপর নয়, বরং জীবনযাত্রার নির্দিষ্ট কিছু অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে। এই গবেষণায় ‘ফ্যামিলি হেলথ স্কোর’ (এফএইচএস) তৈরির সময় বেশ কিছু নির্দিষ্ট রোগ ও উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে পরিবারগুলোর সদস্যদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি মূল্যায়ন করা হয়েছে।

গবেষণার আওতাধীন পরিবারগুলোর মধ্যে ২৬ দশমিত ৩৩ শতাংশ শহর এলাকার এবং ৭৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ গ্রাম এলাকার। এদের মধ্যে ৭৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ পরিবার রান্নাঘরে সাধারণ চুলা ব্যবহার করে এবং ২৫ দশমিক ৮১ শতাংশ পরিবারের হাত ধোয়ার সুযোগ পায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, দূষিত পানি এবং অস্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহারে কারণে ‘ সবচেয়ে নিম্নমানের স্বাস্থ্য সূচক’ শ্রেণিতে থাকা পরিবারগুলোতে ডায়রিয়ার প্রকোপ অনেক বেশি। এই শ্রেণির পরিবারগুলোর প্রায় ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। রান্নার ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণ শিশুদের মধ্যে তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। যেসব পরিবারে রান্নার ধোঁয়া নির্গত হওয়ার সঠিক ব্যবস্থা নেই, তাদের সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত কাশি এবং বুকের বা নাকের সমস্যার উপসর্গ দেখা যায়। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং পুষ্টির অভাবে কিছুসংখ্যক পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘন ঘন জ্বর হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

এই গবেষণায় ব্যবহৃত তথ্য বহুমাত্রিক নির্দেশক ক্লাস্টার সমীক্ষা (এমআইসিএস–৬) থেকে নেওয়া হয়েছে। এই সমীক্ষা ২০১৯ সালে পরিচালনা করা হয়। এই গবেষণাপত্র চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল গ্লোবাল হেলথ, এপিডেমিওলজি অ্যান্ড জিনোমিক্স নামের চিকিৎসা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। জাতিসংঘের শিশু তহবিল–ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর–বিবিএস থেকে নেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ‘ বাংলাদেশে পারিবারিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির নির্ধারকসমূহ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

এই গবেষণায় অংশ নেওয়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এনামুল হক সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, দেশের গ্রাম ও শহরের পরিবারগুলোর সদস্যদের স্বাস্থ্যের অবস্থা জানতে এই গবেষণা করা হয়েছে। এই গবেষণার সঙ্গে শিক্ষক ছাড়াও কয়েকজন শিক্ষার্থীও যুক্ত ছিলেন।

অসুস্থ হওয়ার কারণ

গবেষণায় পরিবারগুলোর অসুস্থ হওয়ার পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ৭৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ পরিবার এখনও সনাতন পদ্ধতিতে সাধারণ চুলায় রান্না করে। এই চুলা থেকে নির্গত ধোঁয়ার ৯০ শতাংশই বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড। যা মানুষের রক্তে ঢুকে অক্সিজেন চলাচলে বাধা দেয়। বিষয়টি বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা ধোঁয়াযুক্ত চুলা ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণ ধোঁয়ামুক্ত চুলা ব্যবহারকারীদের তুলনায় অনেক বেশি।

দেশের অধিকাংশ পরিবারের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে–নজীর আহমেদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ক্লিন এনার্জি ব্যবহার খুবই জরুরি। গ্রামের মানুষ যাতে স্বাস্থ্যসম্মত চুলা ব্যবহার করতে পারে সেজন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। অনেক স্থানে প্লাস্টিক পুড়িয়েও রান্না করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। লাকড়ির চুলা দীর্ঘদিন ব্যবহারে পরিবারের মধ্যে স্বাস্থ্যকষ্টজনিত সমস্যা হতে পারে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবহার করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এগুলো সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মানুষকেও সচেতন করে তুলতে হবে।

আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করা বাংলাদেশের পরিবারগুলোর জন্য একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নিরাপদ পানির অভাবে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে-এমন পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিদ্যুৎহীন পরিবারের চেয়ে ভালো। শহরের তুলনায় গ্রামের পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য সূচক অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক। এর কারণ হিসেবে গবেষকরা গ্রামে প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল এবং পরিবেশ দূষণ কম হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

অর্থনৈতিক অবস্থা বা পারিবারিক সম্পদ সরাসরি পুষ্টি এবং রোগের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর তুলনায় উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য সূচক ভালো।

পারিবারিক সম্পদ বা অর্থনৈতিক সচ্ছলতা সরাসরি শিশুদের পুষ্টির ওপর প্রভাব ফেলে। দরিদ্র পরিবারগুলোতে শিশুদের অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগার হার বেশি, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

গবেষকদের সুপারিশ

গবেষকরা মনে করেন, এই স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো কমিয়ে আনতে হলে পরিবারগুলোকে অবশ্যই স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহার ও নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসের ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানি নিশ্চিত এবং পরিবারের প্রধানের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে এসব রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

পারিবারিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়নে গবেষকরা সনাতন চুলার বদলে গ্যাস, বিদ্যুৎ বা আধুনিক চুলা ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছেন। তাদের মতে, রান্নাঘরে ধোঁয়ামুক্ত জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারলে পারিবারিক অসুস্থতা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব।

/বিবি/