শিরোনাম

জুন আসে জুন যায় ‘মাসুদরা’ ঢাকায় থেকে যায়

জুন আসে জুন যায় ‘মাসুদরা’ ঢাকায় থেকে যায়
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

‘যখনই ঢাকায় চাকরির জন্য স্যারদের কাছে অনুরোধ করি, তখনই জানান জুন ক্লোজিং পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। এভাবে জুন যায় জুন আসে আমার আর ঢাকায় চাকরি করা হয় না। অথচ, মাসুদ রানারা প্রতি জুনেই স্যারদের ম্যানেজ করে গত ছয় বছর ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে চাকরি করে যাচ্ছে।’

এভাবেই নিজের ক্ষোভের কথা বলছিলেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগে কর্মরত গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন প্রকৌশলী। তিনি বলেন, ঢাকা ডিভিশন-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানা গত ছয় বছর ধরে ঢাকায় কর্মরত। এর আগে তিনি চার বছরের মতো গণপূর্তের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চেয়ার শেরেবাংলা নগর-৩ এ কর্মরত ছিলেন। আগের সময়ে তিনি তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের নিকট আত্মীয় পরিচয় দিতেন, এখন তিনিই নাকি হর্তাকর্তা বনে গেছেন।

এ প্রকৌশলীর কথার সূত্র ধরে সিজেডএন টোয়েন্টিফোর থেকে আমরা ঢাকার বাইরে কর্মরত একাধিক প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলি। তাদের দেওয়া তথ্যমতে জানা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানা বর্তমান চেয়ারে থেকে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ প্রকল্প, ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বিএম ভবন এবং ২০ কোটি টাকা করে একাধিক থানা কমপ্লেক্স নির্মাণের দরপত্র আহ্বান ও নিষ্পত্তি করেন। সেই সঙ্গে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে নিজের এখতিয়ারে থাকা সাড়ে ৪ কোটি টাকার মেরামত কাজের খণ্ড খণ্ড দরপত্র নিষ্পত্তি করেন।

অভিযোগ রয়েছে, জুন ক্লোজিংয়ের নামে এসব অর্থ মূলত কাগজে-কলমে খরচ দেখানো হয়েছে। যার বাস্তব অস্তিত্ব খুব একটা খুঁজে পাওয়া যাবে না। মাসুদ রানার মতো এমন আরও বেশ কয়েকজন প্রকৌশলীর নাম বলেছেন তাদেরই সহকর্মীরা, যারা বদলি নীতির তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর ঢাকায় কর্মরত আছেন। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকার দুটি সিভিল জোনের অধীনে ১৮টি বিভাগ এবং ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল (ই/এম) একটি জোনে ১৩টি বিভাগ। সব মিলিয়ে ৩১টি বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলীর ৩১ চেয়ারের বিপরীতে প্রতিযোগী কমবেশি ১৬৪ জন। তবে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারগুলো যেন গুটিকয়েক প্রকৌশলীর জন্যই নির্ধারিত। কর্তৃপক্ষ চাইলেও তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করতে পারেন না। কারণ, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে দায়িত্বে থাকার কারণে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তাদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। আবার আর্থিক সক্ষমতা বাড়ার সুবাদে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের আশীর্বাদও পান তারা। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন তারা।

দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার চেয়ারগুলো কব্জায় রাখা প্রকৌশলীদের সরাতে নীতিমালা তৈরি করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এই নীতিমালা অনুযায়ী, দুই বছর ঢাকায় থাকার পর বাইরে বদলি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ নীতিমালার পরও মহাখালী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হয়েছেন রাজিবুল ইসলাম। তিনি এর আগে গণপূর্ত বিভাগ-১ ও নগর বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে থেকে রাজউকে অথরাইজড অফিসার হিসেবে ঢাকায় দায়িত্ব পালন শেষে আবার মহাখালী বিভাগের চেয়ার বাগিয়ে নেন। সেখানেও তিনি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ে তদবির করান। এ প্রকৌশলীর হয়ে বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আত্মীয় পরিচয়ে এক প্রকৌশলী নেতা চাপ প্রয়োগ করেন। ফলে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকায় রাজিবুল ইসলামকে পদায়ন করতে বাধ্য হয়।

ঢাকা বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীবও ঘুরে ফিরে ঢাকা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি গণপূর্ত সাভার বিভাগ ও নারায়ণগঞ্জ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়া এই দলে গণপূর্ত নগর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ, গণপূর্ত আজিমপুর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম, গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার, গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার কবির, নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম বিভাগ) নিয়াজ মো. তানভীরসহ বেশ কয়েকজন রয়েছেন।

একই বিষয়ে মহাখালী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিবুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘আমি তো গত চার বছর গণপূর্তে ছিলামই না। মাত্র দুই মাস হলো আমার গণপূর্তে আবার পোস্টিং হয়েছে এবং সেটা নিয়ম মেনেই হয়েছে।’

এ ছাড়া আরও কয়েকজন ই/এম বিভাগের প্রকৌশলী রয়েছেন, যারা অতীতে দীর্ঘ সময় ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আবারও পূর্বের কর্মস্থলে ফেরার চেষ্টা করছেন বলে জানা যায়। তাদের মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলী মহিবুল ইসলাম গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-৪ এ প্রায় সাড়ে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাহী প্রকৌশলী শরীফ আব্দুল্লাহ আল মামুন ই/এম সার্কেল-৮ এ দুই বছর এবং পরে বঙ্গভবনে চার বছর কর্মরত ছিলেন। নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ ইস্কান্দার আলী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গণপূর্তের ই/এম কারখানা বিভাগে প্রথমে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও পরে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে টানা আট বছর কর্মরত ছিলেন। একইভাবে সাজেদুল ইসলামও কাঠের কারখানা বিভাগে প্রায় আট থেকে নয় বছর দায়িত্ব পালন শেষে গত বছরের নভেম্বরে প্রধান কার্যালয়ের আসেন। এ প্রকৌশলীও সাত-আট মাস পার না হতেই আবার আগের চেয়ারে ফিরতে চান।

সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে আমরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে। তবে মুঠোফোনে তার ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

/এসএ/