বিতর্কিত তালিকা থেকে গুলশানের আরেকটি প্লট ছাড়ছে রাজউক

বিতর্কিত তালিকা থেকে গুলশানের আরেকটি প্লট ছাড়ছে রাজউক
সেলিনা আক্তার

রাজধানীর গুলশান আবাসিক এলাকার এসডব্লিউ(সি) ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কের ২ নম্বর প্লটটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ‘বিতর্কিত’ প্লটগুলোর একটি। অভিযোগ উঠেছে, এবার সেই প্লট অবমুক্ত করে ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে প্লটের বরাদ্দপ্রাপ্ত চট্টগ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জব্বারের উত্তরাধিকারীদের খুঁজে বের করতে বিমানে চট্টগ্রামে গেছেন রাজউকের তিন কর্মকর্তা। তারা বলছেন, প্লটের দাবিদারদের ভাষ্য মতে, মূল বরাদ্দগ্রহীতার কবর দুটি। তাই তারা কবর শনাক্তের কাজটি করতে সরেজমিন পরিদর্শন করেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ১৯৮৩ সালের পর ‘ডিপ ফ্রিজে’ থাকা এই ফাইলটি ‘নয়-ছয়’ করে নিজেদের করে নিতে কখনো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), কখনো পুলিশের ইউনিট, আবার কখনো আদালতকে ব্যবহার করেছে একাধিক চক্র। কিন্তু দীর্ঘ তিন যুগ ধরে রাজউকের মালিকানাধীন কমবেশি ১৬০ কোটি টাকার এই প্লটটি হাতিয়ে নিতে না পারলেও এবারের তৎপরতা বেশ জোরালো বলে দাবি করেছেন রাজউকের একাধিক সূত্র। মূল নথি গায়েব করে ফটোকপি দিয়ে মূলত ২০১০ সালের পর থেকে প্লটটি হাতিয়ে নিতে তৎপরতা শুরু করেছে রাজউক ও প্রভাবশালীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ওই চক্র। শুরুতে ফাইলের কার্যক্রম কঠোর গোপনীয়তায় চালোনো হলেও বিষয়টি এখন রাজউক ভবনে সবার মুখে মুখে।
মালিকানার ফিরিস্তি
রাজউকের নথি অনুযায়ী, ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামের পাথরঘাটার বাসিন্দা আব্দুল জব্বারের নামে গুলশানে এক বিঘা চার কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই ফাইলে দীর্ঘ সময় প্লটটি নিয়ে আর কোনো তথ্য নেই। ১৯৯৯ সালে আব্দুল জব্বারের তিন ছেলে মো. জহুরুল আলম, মো. জয়নাল আবেদীন ও মো. জাহাঙ্গীর আলম নিজেদের উত্তরাধিকারী দাবি করে ওই প্লটের নামজারির আবেদন করেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই শেষে ২০০৭ সালে তাদের নামে ওয়ারিশসূত্রে নামজারি হয়। কিন্তু এরপরই শুরু হয় পাল্টাপাল্টি দাবি।
ওই প্লটের নামজারির জন্য সামছুন নাহার নামে একজন আবেদন করেন। তিনি দাবি করেন, তিনি ২০০১ সালে দলিলের মাধ্যমে প্লটটি কিনেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে রয়েছেন। তবে তাকে প্লটটি হস্তান্তরের আগে রাজউকের অনুমোদনের কোনো তথ্য নথিতে পাওয়া যায়নি। পরে একই প্লটের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি সার্ভিস চার্জ, হস্তান্তর ও আমমোক্তারনামা অনুমোদনের আবেদন করেন। তদন্তে এসব কাগজপত্রের কিছু জাল এবং কিছু সন্দেহজনক বলে উল্লেখ করা হয়।
সরেজমিনে রাজউকের কানুনগো প্লটের সামনে দুটি সাইনবোর্ড দেখতে পান। এর মধ্যে একটিতে আব্দুল জব্বারের উত্তরাধিকারীদের নাম, অন্যটিতে ‘রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. লিয়াকত আলী খান মুকুল বায়নাসূত্রে এই জমির মালিক’ লেখা আছে। অথচ রাজউকের নথি অনুযায়ী মালিকানা সংক্রান্ত দাপ্তরিক কোনো চিঠি বা দালিলিক প্রমাণাদি নেই।
দুদকের সেই ডিডি রফিকের হস্তক্ষেপ
বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে রাজউকের বড় বড় ফাইল পার করতেন দুদকের একজন উপপরিচালক। পুলিশ ক্যাডার থেকে প্রেষণে দুদকে আসা ওই আলোচিত কর্মকর্তার নাম শেখ রফিকুল ইসলাম। রাজউক থেকে সরকারি প্লট নিজেদের কব্জায় নিতে চুক্তিতে ব্যবহার করা হতো শেখ রফিকুল ইসলামকে। অনেকটাই প্রকাশ্যে এ কর্মকর্তা ভয়ভীতি দেখিয়ে গুলশান-বনানী এলাকায় বিতর্কিত তালিকায় থাকা বেশ কয়েকটি প্লট ও বড় আকারের খণ্ড জমি প্রভাবশালী মহলের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছে।
গুলশান এলাকার ১৩ নম্বর রোডের লেকপাড়ের ২ নম্বর প্লটটিও শেখ রফিক রাজউক থেকে অবমুক্ত করে দিতে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছিল। সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের হাতে আসা নথি ঘেঁটে একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে প্লটটি হস্তান্তর করার এমন নানা অপতৎপরতার চিত্র উঠে এসেছে।
১৯৬০ সালে বরাদ্দ, হঠাৎ ২০১০ সালে ওয়ারিশদের আবির্ভাব
২০১০ সালে রওশন আরা বেগম রাজউকে দাখিল করা আবেদনে দাবি করেন, আব্দুল জব্বারের দুই স্ত্রী, তিন ছেলে ও সাত কন্যাসহ মোট ১১ জন বৈধ উত্তরাধিকারী রয়েছেন। প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের তথ্য গোপন করে নামজারি করা হয়েছে। এভাবে একের পর এক নতুন ওয়ারিশ সনদ, পরিচয়পত্র ও আবেদনপত্রের সঙ্গে নানা ধরনের কাগজ জমা পড়তে থাকে।
নানা নাটকীয়তায় ভরপুর এই ফাইল নিয়ে তদন্তে নেমে রাজউক দেখতে পায়, নথিতে উত্তরাধিকারীদের তালিকা, নাম ও পরিচয়ে অসংগতি রয়েছে। কোথাও দুই স্ত্রীর তথ্য নেই, কোথাও কন্যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে ওয়ারিশ সনদের মিলও পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ২০০৭ সালের নামজারির আদেশ ও সার্ভিস চার্জ পরিশোধের অনুমতিপত্রের অনুরূপ জাল কাগজ তৈরি করে পরবর্তী সময়ে হস্তান্তরের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও সংস্থাটির তদন্তে উঠে আসে।
রাজউকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে, যারা টাকার বিনিময়ে তথাকথিত ছায়া নথি তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে প্লট ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এ কারণে শুধু একটি প্লট নয়, এ ধরনের সব বিতর্কিত প্লট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তদন্তে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও সরকারি সম্পদ যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে ড. আদিল মুহাম্মদ খান সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)
রাজউক সূত্রে জানা যায়, সংস্থাটির তালিকাভুক্ত বিতর্কিত কোনো প্লট হাতিয়ে নেওয়ার প্রথম ধাপই হচ্ছে মূল নথি সরিয়ে ফেলা। এরপর নিজেদের তৈরি করা নানা কাগজপত্র দিয়ে নতুন করে ‘ছায়া নথি’ খুলে ফাইল সচল করা হয়। পরে ধাপে ধাপে বরাদ্দপত্র, নামজারি, সার্ভিস চার্জ, হস্তান্তর কিংবা অন্য প্রশাসনিক অনুমোদনের চেষ্টা চলে।
গুলশানের এই প্লটের নথিতেও একই ধরণের কায়দা-কানুন করা হয়েছে। আবেদনকারীরা মূল কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়ার দাবি করে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কপিও জমা দেন। একই নথিতে আবার উল্লেখ রয়েছে, যে অনুমতিপত্রের ভিত্তিতে সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করা হয়েছিল, সেই মূল চিঠিটিও নথিতে অনুপস্থিত।
উত্তরাধিকার খোঁজার নামে তিন সদস্যের চট্টগ্রাম সফর
প্লটটির প্রকৃত উত্তরাধিকারী নির্ধারণে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি রাজউক। ২০২২ সালের একটি কমিটি নতুন করে ওয়ারিশ সনদ, সাকসেশন সনদ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের সুপারিশ করে। একইভাবে চলতি মাসের ২ তারিখের অফিস আদেশে পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, আইন কর্মকর্তা-১ মো. সাইদ ইবনে জায়েদ এবং সহকারী পরিচালক তৌহিদুল ইসলামকে ৮ ও ৯ জুলাই চট্টগ্রামে গিয়ে তথ্য যাচাইয়ের অনুমতি দেওয়া হয়। তারপর এই তিন কর্মকর্তা গত ৮ জুলাই বিমানে চট্টগ্রাম গিয়েছেন বলে জানা যায়।
এই প্লটের মালিকানা দাবি করা ব্যক্তিরা বরাদ্দকৃত ব্যক্তির দুই স্থানে কবর দেওয়ার তথ্য দাবি করেছে। সেখানে আমাদের তিন সদস্যের দল গিয়েছে তাদের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে। প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্ট করা হবে, সিআইডির তদন্ত, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখানে আমার নূন্যতম ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম চেয়ারম্যান, রাজউক
রাজউকের একাধিক সূত্র বলছে, এ প্লটটি বাগিয়ে নিতে গত ৮ থেকে ১০ বছর ধরে একটি প্রভাবশালী মহলের হয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট সদস্য, পরিচালক, উপপরিচালকের রুমে নিয়মিত যাতায়াত করেন এক ব্যক্তি। তিনি কিছুক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ করেন আবার ক্ষেত্র আর্থিক সুবিধা দিয়ে সবাইকে বাগে আনার চেষ্টা করছেন। জনৈক এই ব্যক্তির তদবিরে সংস্থার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা অনেকটাই নমনীয় বলে জানা যায়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমরা নিজ উদ্যোগে চট্টগ্রাম আসিনি। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তথ্য যাচাই করতে এসেছি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।’
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘এই প্লটের মালিকানা দাবি করা ব্যক্তিরা বরাদ্দকৃত ব্যক্তির দুই স্থানে কবর দেওয়ার তথ্য দাবি করেছে। সেখানে আমাদের তিন সদস্যের দল গিয়েছে তাদের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে। প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্ট করা হবে, সিআইডির তদন্ত, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখানে আমার নূন্যতম ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘রাজউকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে, যারা টাকার বিনিময়ে তথাকথিত ছায়া নথি তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে প্লট ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এ কারণে শুধু একটি প্লট নয়, এ ধরনের সব বিতর্কিত প্লট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তদন্তে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও সরকারি সম্পদ যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’

রাজধানীর গুলশান আবাসিক এলাকার এসডব্লিউ(সি) ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কের ২ নম্বর প্লটটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ‘বিতর্কিত’ প্লটগুলোর একটি। অভিযোগ উঠেছে, এবার সেই প্লট অবমুক্ত করে ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে প্লটের বরাদ্দপ্রাপ্ত চট্টগ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জব্বারের উত্তরাধিকারীদের খুঁজে বের করতে বিমানে চট্টগ্রামে গেছেন রাজউকের তিন কর্মকর্তা। তারা বলছেন, প্লটের দাবিদারদের ভাষ্য মতে, মূল বরাদ্দগ্রহীতার কবর দুটি। তাই তারা কবর শনাক্তের কাজটি করতে সরেজমিন পরিদর্শন করেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ১৯৮৩ সালের পর ‘ডিপ ফ্রিজে’ থাকা এই ফাইলটি ‘নয়-ছয়’ করে নিজেদের করে নিতে কখনো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), কখনো পুলিশের ইউনিট, আবার কখনো আদালতকে ব্যবহার করেছে একাধিক চক্র। কিন্তু দীর্ঘ তিন যুগ ধরে রাজউকের মালিকানাধীন কমবেশি ১৬০ কোটি টাকার এই প্লটটি হাতিয়ে নিতে না পারলেও এবারের তৎপরতা বেশ জোরালো বলে দাবি করেছেন রাজউকের একাধিক সূত্র। মূল নথি গায়েব করে ফটোকপি দিয়ে মূলত ২০১০ সালের পর থেকে প্লটটি হাতিয়ে নিতে তৎপরতা শুরু করেছে রাজউক ও প্রভাবশালীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ওই চক্র। শুরুতে ফাইলের কার্যক্রম কঠোর গোপনীয়তায় চালোনো হলেও বিষয়টি এখন রাজউক ভবনে সবার মুখে মুখে।
মালিকানার ফিরিস্তি
রাজউকের নথি অনুযায়ী, ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামের পাথরঘাটার বাসিন্দা আব্দুল জব্বারের নামে গুলশানে এক বিঘা চার কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই ফাইলে দীর্ঘ সময় প্লটটি নিয়ে আর কোনো তথ্য নেই। ১৯৯৯ সালে আব্দুল জব্বারের তিন ছেলে মো. জহুরুল আলম, মো. জয়নাল আবেদীন ও মো. জাহাঙ্গীর আলম নিজেদের উত্তরাধিকারী দাবি করে ওই প্লটের নামজারির আবেদন করেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই শেষে ২০০৭ সালে তাদের নামে ওয়ারিশসূত্রে নামজারি হয়। কিন্তু এরপরই শুরু হয় পাল্টাপাল্টি দাবি।
ওই প্লটের নামজারির জন্য সামছুন নাহার নামে একজন আবেদন করেন। তিনি দাবি করেন, তিনি ২০০১ সালে দলিলের মাধ্যমে প্লটটি কিনেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে রয়েছেন। তবে তাকে প্লটটি হস্তান্তরের আগে রাজউকের অনুমোদনের কোনো তথ্য নথিতে পাওয়া যায়নি। পরে একই প্লটের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি সার্ভিস চার্জ, হস্তান্তর ও আমমোক্তারনামা অনুমোদনের আবেদন করেন। তদন্তে এসব কাগজপত্রের কিছু জাল এবং কিছু সন্দেহজনক বলে উল্লেখ করা হয়।
সরেজমিনে রাজউকের কানুনগো প্লটের সামনে দুটি সাইনবোর্ড দেখতে পান। এর মধ্যে একটিতে আব্দুল জব্বারের উত্তরাধিকারীদের নাম, অন্যটিতে ‘রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. লিয়াকত আলী খান মুকুল বায়নাসূত্রে এই জমির মালিক’ লেখা আছে। অথচ রাজউকের নথি অনুযায়ী মালিকানা সংক্রান্ত দাপ্তরিক কোনো চিঠি বা দালিলিক প্রমাণাদি নেই।
দুদকের সেই ডিডি রফিকের হস্তক্ষেপ
বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে রাজউকের বড় বড় ফাইল পার করতেন দুদকের একজন উপপরিচালক। পুলিশ ক্যাডার থেকে প্রেষণে দুদকে আসা ওই আলোচিত কর্মকর্তার নাম শেখ রফিকুল ইসলাম। রাজউক থেকে সরকারি প্লট নিজেদের কব্জায় নিতে চুক্তিতে ব্যবহার করা হতো শেখ রফিকুল ইসলামকে। অনেকটাই প্রকাশ্যে এ কর্মকর্তা ভয়ভীতি দেখিয়ে গুলশান-বনানী এলাকায় বিতর্কিত তালিকায় থাকা বেশ কয়েকটি প্লট ও বড় আকারের খণ্ড জমি প্রভাবশালী মহলের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছে।
গুলশান এলাকার ১৩ নম্বর রোডের লেকপাড়ের ২ নম্বর প্লটটিও শেখ রফিক রাজউক থেকে অবমুক্ত করে দিতে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছিল। সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের হাতে আসা নথি ঘেঁটে একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে প্লটটি হস্তান্তর করার এমন নানা অপতৎপরতার চিত্র উঠে এসেছে।
১৯৬০ সালে বরাদ্দ, হঠাৎ ২০১০ সালে ওয়ারিশদের আবির্ভাব
২০১০ সালে রওশন আরা বেগম রাজউকে দাখিল করা আবেদনে দাবি করেন, আব্দুল জব্বারের দুই স্ত্রী, তিন ছেলে ও সাত কন্যাসহ মোট ১১ জন বৈধ উত্তরাধিকারী রয়েছেন। প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের তথ্য গোপন করে নামজারি করা হয়েছে। এভাবে একের পর এক নতুন ওয়ারিশ সনদ, পরিচয়পত্র ও আবেদনপত্রের সঙ্গে নানা ধরনের কাগজ জমা পড়তে থাকে।
নানা নাটকীয়তায় ভরপুর এই ফাইল নিয়ে তদন্তে নেমে রাজউক দেখতে পায়, নথিতে উত্তরাধিকারীদের তালিকা, নাম ও পরিচয়ে অসংগতি রয়েছে। কোথাও দুই স্ত্রীর তথ্য নেই, কোথাও কন্যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে ওয়ারিশ সনদের মিলও পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ২০০৭ সালের নামজারির আদেশ ও সার্ভিস চার্জ পরিশোধের অনুমতিপত্রের অনুরূপ জাল কাগজ তৈরি করে পরবর্তী সময়ে হস্তান্তরের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও সংস্থাটির তদন্তে উঠে আসে।
রাজউকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে, যারা টাকার বিনিময়ে তথাকথিত ছায়া নথি তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে প্লট ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এ কারণে শুধু একটি প্লট নয়, এ ধরনের সব বিতর্কিত প্লট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তদন্তে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও সরকারি সম্পদ যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে ড. আদিল মুহাম্মদ খান সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)
রাজউক সূত্রে জানা যায়, সংস্থাটির তালিকাভুক্ত বিতর্কিত কোনো প্লট হাতিয়ে নেওয়ার প্রথম ধাপই হচ্ছে মূল নথি সরিয়ে ফেলা। এরপর নিজেদের তৈরি করা নানা কাগজপত্র দিয়ে নতুন করে ‘ছায়া নথি’ খুলে ফাইল সচল করা হয়। পরে ধাপে ধাপে বরাদ্দপত্র, নামজারি, সার্ভিস চার্জ, হস্তান্তর কিংবা অন্য প্রশাসনিক অনুমোদনের চেষ্টা চলে।
গুলশানের এই প্লটের নথিতেও একই ধরণের কায়দা-কানুন করা হয়েছে। আবেদনকারীরা মূল কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়ার দাবি করে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কপিও জমা দেন। একই নথিতে আবার উল্লেখ রয়েছে, যে অনুমতিপত্রের ভিত্তিতে সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করা হয়েছিল, সেই মূল চিঠিটিও নথিতে অনুপস্থিত।
উত্তরাধিকার খোঁজার নামে তিন সদস্যের চট্টগ্রাম সফর
প্লটটির প্রকৃত উত্তরাধিকারী নির্ধারণে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি রাজউক। ২০২২ সালের একটি কমিটি নতুন করে ওয়ারিশ সনদ, সাকসেশন সনদ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের সুপারিশ করে। একইভাবে চলতি মাসের ২ তারিখের অফিস আদেশে পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, আইন কর্মকর্তা-১ মো. সাইদ ইবনে জায়েদ এবং সহকারী পরিচালক তৌহিদুল ইসলামকে ৮ ও ৯ জুলাই চট্টগ্রামে গিয়ে তথ্য যাচাইয়ের অনুমতি দেওয়া হয়। তারপর এই তিন কর্মকর্তা গত ৮ জুলাই বিমানে চট্টগ্রাম গিয়েছেন বলে জানা যায়।
এই প্লটের মালিকানা দাবি করা ব্যক্তিরা বরাদ্দকৃত ব্যক্তির দুই স্থানে কবর দেওয়ার তথ্য দাবি করেছে। সেখানে আমাদের তিন সদস্যের দল গিয়েছে তাদের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে। প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্ট করা হবে, সিআইডির তদন্ত, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখানে আমার নূন্যতম ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম চেয়ারম্যান, রাজউক
রাজউকের একাধিক সূত্র বলছে, এ প্লটটি বাগিয়ে নিতে গত ৮ থেকে ১০ বছর ধরে একটি প্রভাবশালী মহলের হয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট সদস্য, পরিচালক, উপপরিচালকের রুমে নিয়মিত যাতায়াত করেন এক ব্যক্তি। তিনি কিছুক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ করেন আবার ক্ষেত্র আর্থিক সুবিধা দিয়ে সবাইকে বাগে আনার চেষ্টা করছেন। জনৈক এই ব্যক্তির তদবিরে সংস্থার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা অনেকটাই নমনীয় বলে জানা যায়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমরা নিজ উদ্যোগে চট্টগ্রাম আসিনি। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তথ্য যাচাই করতে এসেছি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।’
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘এই প্লটের মালিকানা দাবি করা ব্যক্তিরা বরাদ্দকৃত ব্যক্তির দুই স্থানে কবর দেওয়ার তথ্য দাবি করেছে। সেখানে আমাদের তিন সদস্যের দল গিয়েছে তাদের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে। প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্ট করা হবে, সিআইডির তদন্ত, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখানে আমার নূন্যতম ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘রাজউকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে, যারা টাকার বিনিময়ে তথাকথিত ছায়া নথি তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে প্লট ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এ কারণে শুধু একটি প্লট নয়, এ ধরনের সব বিতর্কিত প্লট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তদন্তে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও সরকারি সম্পদ যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’

বিতর্কিত তালিকা থেকে গুলশানের আরেকটি প্লট ছাড়ছে রাজউক
সেলিনা আক্তার

রাজধানীর গুলশান আবাসিক এলাকার এসডব্লিউ(সি) ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কের ২ নম্বর প্লটটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ‘বিতর্কিত’ প্লটগুলোর একটি। অভিযোগ উঠেছে, এবার সেই প্লট অবমুক্ত করে ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে প্লটের বরাদ্দপ্রাপ্ত চট্টগ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জব্বারের উত্তরাধিকারীদের খুঁজে বের করতে বিমানে চট্টগ্রামে গেছেন রাজউকের তিন কর্মকর্তা। তারা বলছেন, প্লটের দাবিদারদের ভাষ্য মতে, মূল বরাদ্দগ্রহীতার কবর দুটি। তাই তারা কবর শনাক্তের কাজটি করতে সরেজমিন পরিদর্শন করেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ১৯৮৩ সালের পর ‘ডিপ ফ্রিজে’ থাকা এই ফাইলটি ‘নয়-ছয়’ করে নিজেদের করে নিতে কখনো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), কখনো পুলিশের ইউনিট, আবার কখনো আদালতকে ব্যবহার করেছে একাধিক চক্র। কিন্তু দীর্ঘ তিন যুগ ধরে রাজউকের মালিকানাধীন কমবেশি ১৬০ কোটি টাকার এই প্লটটি হাতিয়ে নিতে না পারলেও এবারের তৎপরতা বেশ জোরালো বলে দাবি করেছেন রাজউকের একাধিক সূত্র। মূল নথি গায়েব করে ফটোকপি দিয়ে মূলত ২০১০ সালের পর থেকে প্লটটি হাতিয়ে নিতে তৎপরতা শুরু করেছে রাজউক ও প্রভাবশালীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ওই চক্র। শুরুতে ফাইলের কার্যক্রম কঠোর গোপনীয়তায় চালোনো হলেও বিষয়টি এখন রাজউক ভবনে সবার মুখে মুখে।
মালিকানার ফিরিস্তি
রাজউকের নথি অনুযায়ী, ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামের পাথরঘাটার বাসিন্দা আব্দুল জব্বারের নামে গুলশানে এক বিঘা চার কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই ফাইলে দীর্ঘ সময় প্লটটি নিয়ে আর কোনো তথ্য নেই। ১৯৯৯ সালে আব্দুল জব্বারের তিন ছেলে মো. জহুরুল আলম, মো. জয়নাল আবেদীন ও মো. জাহাঙ্গীর আলম নিজেদের উত্তরাধিকারী দাবি করে ওই প্লটের নামজারির আবেদন করেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই শেষে ২০০৭ সালে তাদের নামে ওয়ারিশসূত্রে নামজারি হয়। কিন্তু এরপরই শুরু হয় পাল্টাপাল্টি দাবি।
ওই প্লটের নামজারির জন্য সামছুন নাহার নামে একজন আবেদন করেন। তিনি দাবি করেন, তিনি ২০০১ সালে দলিলের মাধ্যমে প্লটটি কিনেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে রয়েছেন। তবে তাকে প্লটটি হস্তান্তরের আগে রাজউকের অনুমোদনের কোনো তথ্য নথিতে পাওয়া যায়নি। পরে একই প্লটের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি সার্ভিস চার্জ, হস্তান্তর ও আমমোক্তারনামা অনুমোদনের আবেদন করেন। তদন্তে এসব কাগজপত্রের কিছু জাল এবং কিছু সন্দেহজনক বলে উল্লেখ করা হয়।
সরেজমিনে রাজউকের কানুনগো প্লটের সামনে দুটি সাইনবোর্ড দেখতে পান। এর মধ্যে একটিতে আব্দুল জব্বারের উত্তরাধিকারীদের নাম, অন্যটিতে ‘রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. লিয়াকত আলী খান মুকুল বায়নাসূত্রে এই জমির মালিক’ লেখা আছে। অথচ রাজউকের নথি অনুযায়ী মালিকানা সংক্রান্ত দাপ্তরিক কোনো চিঠি বা দালিলিক প্রমাণাদি নেই।
দুদকের সেই ডিডি রফিকের হস্তক্ষেপ
বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে রাজউকের বড় বড় ফাইল পার করতেন দুদকের একজন উপপরিচালক। পুলিশ ক্যাডার থেকে প্রেষণে দুদকে আসা ওই আলোচিত কর্মকর্তার নাম শেখ রফিকুল ইসলাম। রাজউক থেকে সরকারি প্লট নিজেদের কব্জায় নিতে চুক্তিতে ব্যবহার করা হতো শেখ রফিকুল ইসলামকে। অনেকটাই প্রকাশ্যে এ কর্মকর্তা ভয়ভীতি দেখিয়ে গুলশান-বনানী এলাকায় বিতর্কিত তালিকায় থাকা বেশ কয়েকটি প্লট ও বড় আকারের খণ্ড জমি প্রভাবশালী মহলের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছে।
গুলশান এলাকার ১৩ নম্বর রোডের লেকপাড়ের ২ নম্বর প্লটটিও শেখ রফিক রাজউক থেকে অবমুক্ত করে দিতে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছিল। সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের হাতে আসা নথি ঘেঁটে একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে প্লটটি হস্তান্তর করার এমন নানা অপতৎপরতার চিত্র উঠে এসেছে।
১৯৬০ সালে বরাদ্দ, হঠাৎ ২০১০ সালে ওয়ারিশদের আবির্ভাব
২০১০ সালে রওশন আরা বেগম রাজউকে দাখিল করা আবেদনে দাবি করেন, আব্দুল জব্বারের দুই স্ত্রী, তিন ছেলে ও সাত কন্যাসহ মোট ১১ জন বৈধ উত্তরাধিকারী রয়েছেন। প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের তথ্য গোপন করে নামজারি করা হয়েছে। এভাবে একের পর এক নতুন ওয়ারিশ সনদ, পরিচয়পত্র ও আবেদনপত্রের সঙ্গে নানা ধরনের কাগজ জমা পড়তে থাকে।
নানা নাটকীয়তায় ভরপুর এই ফাইল নিয়ে তদন্তে নেমে রাজউক দেখতে পায়, নথিতে উত্তরাধিকারীদের তালিকা, নাম ও পরিচয়ে অসংগতি রয়েছে। কোথাও দুই স্ত্রীর তথ্য নেই, কোথাও কন্যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে ওয়ারিশ সনদের মিলও পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ২০০৭ সালের নামজারির আদেশ ও সার্ভিস চার্জ পরিশোধের অনুমতিপত্রের অনুরূপ জাল কাগজ তৈরি করে পরবর্তী সময়ে হস্তান্তরের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও সংস্থাটির তদন্তে উঠে আসে।
রাজউকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে, যারা টাকার বিনিময়ে তথাকথিত ছায়া নথি তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে প্লট ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এ কারণে শুধু একটি প্লট নয়, এ ধরনের সব বিতর্কিত প্লট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তদন্তে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও সরকারি সম্পদ যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে ড. আদিল মুহাম্মদ খান সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)
রাজউক সূত্রে জানা যায়, সংস্থাটির তালিকাভুক্ত বিতর্কিত কোনো প্লট হাতিয়ে নেওয়ার প্রথম ধাপই হচ্ছে মূল নথি সরিয়ে ফেলা। এরপর নিজেদের তৈরি করা নানা কাগজপত্র দিয়ে নতুন করে ‘ছায়া নথি’ খুলে ফাইল সচল করা হয়। পরে ধাপে ধাপে বরাদ্দপত্র, নামজারি, সার্ভিস চার্জ, হস্তান্তর কিংবা অন্য প্রশাসনিক অনুমোদনের চেষ্টা চলে।
গুলশানের এই প্লটের নথিতেও একই ধরণের কায়দা-কানুন করা হয়েছে। আবেদনকারীরা মূল কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়ার দাবি করে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কপিও জমা দেন। একই নথিতে আবার উল্লেখ রয়েছে, যে অনুমতিপত্রের ভিত্তিতে সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করা হয়েছিল, সেই মূল চিঠিটিও নথিতে অনুপস্থিত।
উত্তরাধিকার খোঁজার নামে তিন সদস্যের চট্টগ্রাম সফর
প্লটটির প্রকৃত উত্তরাধিকারী নির্ধারণে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি রাজউক। ২০২২ সালের একটি কমিটি নতুন করে ওয়ারিশ সনদ, সাকসেশন সনদ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের সুপারিশ করে। একইভাবে চলতি মাসের ২ তারিখের অফিস আদেশে পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, আইন কর্মকর্তা-১ মো. সাইদ ইবনে জায়েদ এবং সহকারী পরিচালক তৌহিদুল ইসলামকে ৮ ও ৯ জুলাই চট্টগ্রামে গিয়ে তথ্য যাচাইয়ের অনুমতি দেওয়া হয়। তারপর এই তিন কর্মকর্তা গত ৮ জুলাই বিমানে চট্টগ্রাম গিয়েছেন বলে জানা যায়।
এই প্লটের মালিকানা দাবি করা ব্যক্তিরা বরাদ্দকৃত ব্যক্তির দুই স্থানে কবর দেওয়ার তথ্য দাবি করেছে। সেখানে আমাদের তিন সদস্যের দল গিয়েছে তাদের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে। প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্ট করা হবে, সিআইডির তদন্ত, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখানে আমার নূন্যতম ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম চেয়ারম্যান, রাজউক
রাজউকের একাধিক সূত্র বলছে, এ প্লটটি বাগিয়ে নিতে গত ৮ থেকে ১০ বছর ধরে একটি প্রভাবশালী মহলের হয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট সদস্য, পরিচালক, উপপরিচালকের রুমে নিয়মিত যাতায়াত করেন এক ব্যক্তি। তিনি কিছুক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ করেন আবার ক্ষেত্র আর্থিক সুবিধা দিয়ে সবাইকে বাগে আনার চেষ্টা করছেন। জনৈক এই ব্যক্তির তদবিরে সংস্থার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা অনেকটাই নমনীয় বলে জানা যায়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমরা নিজ উদ্যোগে চট্টগ্রাম আসিনি। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তথ্য যাচাই করতে এসেছি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।’
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘এই প্লটের মালিকানা দাবি করা ব্যক্তিরা বরাদ্দকৃত ব্যক্তির দুই স্থানে কবর দেওয়ার তথ্য দাবি করেছে। সেখানে আমাদের তিন সদস্যের দল গিয়েছে তাদের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে। প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্ট করা হবে, সিআইডির তদন্ত, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখানে আমার নূন্যতম ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘রাজউকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে, যারা টাকার বিনিময়ে তথাকথিত ছায়া নথি তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে প্লট ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এ কারণে শুধু একটি প্লট নয়, এ ধরনের সব বিতর্কিত প্লট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তদন্তে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও সরকারি সম্পদ যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’

রাজউকের ‘বিতর্কিত’ প্লটে এসইএল-এর বহুতল ভবন
ঝুঁকিপূর্ণ দেয়ালে জোড়াতালি দিয়ে ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার বিল!
ড্যাপের নিয়ম ভেঙে প্রথমে হোটেল, এবার হচ্ছে বাণিজ্যিক ভবন
বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে বাড়ছে ব্যয়, থাকছেনা জবাবদিহি
রূপপুর গ্রিন সিটি: আধুনিক ও পরিকল্পিত আঞ্চলিক শহর
১২ পথে গুলশান লেকে ঢুকছে বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য 

