গুলশান-বনানী-বারিধারার ৬৪ শতাংশ ভবনে নেই সেপটিক ট্যাংক

গুলশান-বনানী-বারিধারার ৬৪ শতাংশ ভবনে নেই সেপটিক ট্যাংক
আয়নাল হোসেন

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়েছে। এসব এলাকার প্রায় ৬৪ শতাংশ ভবনেই কোনো সেপটিক ট্যাংক নেই। সম্প্রতি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা ওয়াসা এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন যৌথভাবে এক বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী, যেখানে কেন্দ্রীয় পয়ঃনিষ্কাশন (স্যুয়ারেজ) ব্যবস্থা নেই, সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত সেপটিক ট্যাংক বা সমমানের অনুমোদিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। এই বিধান অমান্য করে ভবন নির্মাণ বা ব্যবহার করলে বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিধান রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের সভার সিদ্ধান্তের আলোকে এই বিশেষ তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। রাজউকের আওতাধীন গুলশান-বনানী অঞ্চলের বিদ্যমান ভবনগুলোর ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ লাইনের বাস্তব অবস্থা সশরীরে পরিদর্শনের জন্য ১০টি বিশেষ টিম গঠন করা হয়। এসব টিম ওই এলাকার মোট ৪ হাজার ৪০৯টি ভবন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে একটি সার-সংক্ষেপ প্রতিবেদনটি তৈরি করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিদর্শনকৃত ভবনগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৮২২টি ভবনে কোনো সেপটিক ট্যাংক নেই। এটি মোট ভবনের ৬৪ শতাংশ। তবে মাত্র ১ হাজার ৫৪০টি ভবনে সেপটিক ট্যাংক পাওয়া গেছে, যা শতকরা ৩৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
শুধু তা-ই নয়, সোকওয়েল বা শোষককূপের অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক। এলাকার ৯২ দশমিক ২৭ শতাংশ অর্থাৎ ৪ হাজার ৬৮টি ভবনেই কোনো শোষককূপ নেই। আর মাত্র ২৯৪টি বা শতকরা মাত্র ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ ভবনে শোষককূপের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সিংহভাগ ভবনই সরকারি লাইনের সঙ্গে যুক্ত। মোট ৪ হাজার ১২৫টি বা শতকরা ৯৩ দশমিক ৬২ শতাংশ ঢাকা ওয়াসা বা ডিএনসিসির স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ লাইনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সরকারি লাইনে কোনো সংযোগ নেই মাত্র ২৮৪টি বা শতকরা ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভবনের।
জরিপ অনুযায়ী, পরিদর্শিত এলাকার মধ্যে ৪৫৪টি বা ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ ভবন লেকের পাশে অবস্থিত। তবে স্বস্তির খবর হলো, কোনো ভবনই সরাসরি লেকের পানিতে বর্জ্য ফেলছে না।
প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, বারিধারা কূটনৈতিক এলাকার ৪২টি ভবনে নিরাপত্তার কারণে পরিদর্শন দল প্রবেশের অনুমতি পায়নি। এছাড়া টিম-১ এর আওতাধীন এলাকায় পাঁচটি ভবনে আধুনিক এসটিপি ব্যবস্থা সচল পাওয়া গেছে।
ভবনে সেপটিক ট্যাংক না থাকলে কী শাস্তি
অনুমোদিত ভবন নকশা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসম্মত সেপটিক ট্যাংক বা সমমানের অনুমোদিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকলে নানা ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, অনুমোদিত ভবন নকশা (প্ল্যান) অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক নির্মাণ না করলে বা ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) লঙ্ঘন করলে ভবন মালিককে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অভাব এবং জবাবদিহিতার কারণে এই পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান সভাপতি, বিআইপি
এ ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক নির্মাণ না করার কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হতে পারে। এছাড়া অবৈধ বা ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ সংশোধনের নির্দেশও দিতে পারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনে আদালতের নির্দেশে ভবনের অবৈধ অংশ বা নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত সেপটিক ট্যাংক অপসারণ, ভেঙে ফেলা কিংবা ভরাট করার আদেশ দেওয়া হতে পারে। আদালতের নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে কাজ সম্পন্ন করে এর ব্যয় ভবন মালিকের কাছ থেকে আদায় করার ক্ষমতা রাখে।
১৯৫২ সালের বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-এর ধারা ১২ অনুযায়ী, কোড লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ, নকশা অনুমোদন বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আদালত সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড, ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দিতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবনে সেপটিক ট্যাংক না থাকলে বা মানববর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে নিষ্কাশন করা হলে ভূগর্ভস্থ পানিদূষণ, ড্রেন, খাল ও নদী দূষণ, দুর্গন্ধ, সংক্রামক রোগের ঝুঁকি এবং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির মতো গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে জনস্বার্থে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি কর্পোরেশন বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকম-কে বলেন, ‘গুলশান-বনানী-বারিধারার মতো সুপরিকল্পিত ও অভিজাত এলাকার সেপটিক ট্যাংক এবং সোকওয়েল না থাকার কোনো সুযোগ নেই। অথচ ভবন মালিকেরা নকশা লঙ্ঘন করে মানববর্জ্য সরাসরি উন্মুক্ত ড্রেন ও লেকে নিষ্কাশন করার মাধ্যমে চরম পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটাচ্ছেন। দেশের প্রচলিত ইমারত ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী, নিজস্ব জায়গায় সেপটিক ট্যাংক না রাখা নকশা বহির্ভূত অবৈধ নির্মাণ, যার শাস্তি হিসেবে ভবন ভাঙার নির্দেশ বা কারাদণ্ড হতে পারে। আর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, অপরিশোধিত বর্জ্য জলাশয়ে ফেলে পরিবেশ দূষণের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন আইন অনুযায়ী বৃষ্টির পানির ড্রেনে পয়ঃবর্জ্যের সংযোগ দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ, যার ফলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা ও লাইন কেটে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অভিজাত এলাকায় এমন পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অভাব এবং জবাবদিহিতার কারণে এই পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। এর স্থায়ী সমাধানে ভবন মালিকদের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে আধুনিক সেপটিক ট্যাংক নির্মাণে বাধ্য করা এবং ব্যর্থতায় গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি বিচ্ছিন্ন করাসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়েছে। এসব এলাকার প্রায় ৬৪ শতাংশ ভবনেই কোনো সেপটিক ট্যাংক নেই। সম্প্রতি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা ওয়াসা এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন যৌথভাবে এক বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী, যেখানে কেন্দ্রীয় পয়ঃনিষ্কাশন (স্যুয়ারেজ) ব্যবস্থা নেই, সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত সেপটিক ট্যাংক বা সমমানের অনুমোদিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। এই বিধান অমান্য করে ভবন নির্মাণ বা ব্যবহার করলে বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিধান রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের সভার সিদ্ধান্তের আলোকে এই বিশেষ তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। রাজউকের আওতাধীন গুলশান-বনানী অঞ্চলের বিদ্যমান ভবনগুলোর ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ লাইনের বাস্তব অবস্থা সশরীরে পরিদর্শনের জন্য ১০টি বিশেষ টিম গঠন করা হয়। এসব টিম ওই এলাকার মোট ৪ হাজার ৪০৯টি ভবন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে একটি সার-সংক্ষেপ প্রতিবেদনটি তৈরি করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিদর্শনকৃত ভবনগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৮২২টি ভবনে কোনো সেপটিক ট্যাংক নেই। এটি মোট ভবনের ৬৪ শতাংশ। তবে মাত্র ১ হাজার ৫৪০টি ভবনে সেপটিক ট্যাংক পাওয়া গেছে, যা শতকরা ৩৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
শুধু তা-ই নয়, সোকওয়েল বা শোষককূপের অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক। এলাকার ৯২ দশমিক ২৭ শতাংশ অর্থাৎ ৪ হাজার ৬৮টি ভবনেই কোনো শোষককূপ নেই। আর মাত্র ২৯৪টি বা শতকরা মাত্র ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ ভবনে শোষককূপের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সিংহভাগ ভবনই সরকারি লাইনের সঙ্গে যুক্ত। মোট ৪ হাজার ১২৫টি বা শতকরা ৯৩ দশমিক ৬২ শতাংশ ঢাকা ওয়াসা বা ডিএনসিসির স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ লাইনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সরকারি লাইনে কোনো সংযোগ নেই মাত্র ২৮৪টি বা শতকরা ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভবনের।
জরিপ অনুযায়ী, পরিদর্শিত এলাকার মধ্যে ৪৫৪টি বা ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ ভবন লেকের পাশে অবস্থিত। তবে স্বস্তির খবর হলো, কোনো ভবনই সরাসরি লেকের পানিতে বর্জ্য ফেলছে না।
প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, বারিধারা কূটনৈতিক এলাকার ৪২টি ভবনে নিরাপত্তার কারণে পরিদর্শন দল প্রবেশের অনুমতি পায়নি। এছাড়া টিম-১ এর আওতাধীন এলাকায় পাঁচটি ভবনে আধুনিক এসটিপি ব্যবস্থা সচল পাওয়া গেছে।
ভবনে সেপটিক ট্যাংক না থাকলে কী শাস্তি
অনুমোদিত ভবন নকশা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসম্মত সেপটিক ট্যাংক বা সমমানের অনুমোদিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকলে নানা ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, অনুমোদিত ভবন নকশা (প্ল্যান) অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক নির্মাণ না করলে বা ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) লঙ্ঘন করলে ভবন মালিককে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অভাব এবং জবাবদিহিতার কারণে এই পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান সভাপতি, বিআইপি
এ ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক নির্মাণ না করার কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হতে পারে। এছাড়া অবৈধ বা ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ সংশোধনের নির্দেশও দিতে পারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনে আদালতের নির্দেশে ভবনের অবৈধ অংশ বা নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত সেপটিক ট্যাংক অপসারণ, ভেঙে ফেলা কিংবা ভরাট করার আদেশ দেওয়া হতে পারে। আদালতের নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে কাজ সম্পন্ন করে এর ব্যয় ভবন মালিকের কাছ থেকে আদায় করার ক্ষমতা রাখে।
১৯৫২ সালের বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-এর ধারা ১২ অনুযায়ী, কোড লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ, নকশা অনুমোদন বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আদালত সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড, ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দিতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবনে সেপটিক ট্যাংক না থাকলে বা মানববর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে নিষ্কাশন করা হলে ভূগর্ভস্থ পানিদূষণ, ড্রেন, খাল ও নদী দূষণ, দুর্গন্ধ, সংক্রামক রোগের ঝুঁকি এবং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির মতো গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে জনস্বার্থে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি কর্পোরেশন বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকম-কে বলেন, ‘গুলশান-বনানী-বারিধারার মতো সুপরিকল্পিত ও অভিজাত এলাকার সেপটিক ট্যাংক এবং সোকওয়েল না থাকার কোনো সুযোগ নেই। অথচ ভবন মালিকেরা নকশা লঙ্ঘন করে মানববর্জ্য সরাসরি উন্মুক্ত ড্রেন ও লেকে নিষ্কাশন করার মাধ্যমে চরম পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটাচ্ছেন। দেশের প্রচলিত ইমারত ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী, নিজস্ব জায়গায় সেপটিক ট্যাংক না রাখা নকশা বহির্ভূত অবৈধ নির্মাণ, যার শাস্তি হিসেবে ভবন ভাঙার নির্দেশ বা কারাদণ্ড হতে পারে। আর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, অপরিশোধিত বর্জ্য জলাশয়ে ফেলে পরিবেশ দূষণের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন আইন অনুযায়ী বৃষ্টির পানির ড্রেনে পয়ঃবর্জ্যের সংযোগ দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ, যার ফলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা ও লাইন কেটে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অভিজাত এলাকায় এমন পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অভাব এবং জবাবদিহিতার কারণে এই পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। এর স্থায়ী সমাধানে ভবন মালিকদের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে আধুনিক সেপটিক ট্যাংক নির্মাণে বাধ্য করা এবং ব্যর্থতায় গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি বিচ্ছিন্ন করাসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’

গুলশান-বনানী-বারিধারার ৬৪ শতাংশ ভবনে নেই সেপটিক ট্যাংক
আয়নাল হোসেন

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়েছে। এসব এলাকার প্রায় ৬৪ শতাংশ ভবনেই কোনো সেপটিক ট্যাংক নেই। সম্প্রতি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা ওয়াসা এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন যৌথভাবে এক বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী, যেখানে কেন্দ্রীয় পয়ঃনিষ্কাশন (স্যুয়ারেজ) ব্যবস্থা নেই, সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত সেপটিক ট্যাংক বা সমমানের অনুমোদিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। এই বিধান অমান্য করে ভবন নির্মাণ বা ব্যবহার করলে বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিধান রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের সভার সিদ্ধান্তের আলোকে এই বিশেষ তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। রাজউকের আওতাধীন গুলশান-বনানী অঞ্চলের বিদ্যমান ভবনগুলোর ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ লাইনের বাস্তব অবস্থা সশরীরে পরিদর্শনের জন্য ১০টি বিশেষ টিম গঠন করা হয়। এসব টিম ওই এলাকার মোট ৪ হাজার ৪০৯টি ভবন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে একটি সার-সংক্ষেপ প্রতিবেদনটি তৈরি করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিদর্শনকৃত ভবনগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৮২২টি ভবনে কোনো সেপটিক ট্যাংক নেই। এটি মোট ভবনের ৬৪ শতাংশ। তবে মাত্র ১ হাজার ৫৪০টি ভবনে সেপটিক ট্যাংক পাওয়া গেছে, যা শতকরা ৩৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
শুধু তা-ই নয়, সোকওয়েল বা শোষককূপের অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক। এলাকার ৯২ দশমিক ২৭ শতাংশ অর্থাৎ ৪ হাজার ৬৮টি ভবনেই কোনো শোষককূপ নেই। আর মাত্র ২৯৪টি বা শতকরা মাত্র ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ ভবনে শোষককূপের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সিংহভাগ ভবনই সরকারি লাইনের সঙ্গে যুক্ত। মোট ৪ হাজার ১২৫টি বা শতকরা ৯৩ দশমিক ৬২ শতাংশ ঢাকা ওয়াসা বা ডিএনসিসির স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ লাইনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সরকারি লাইনে কোনো সংযোগ নেই মাত্র ২৮৪টি বা শতকরা ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভবনের।
জরিপ অনুযায়ী, পরিদর্শিত এলাকার মধ্যে ৪৫৪টি বা ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ ভবন লেকের পাশে অবস্থিত। তবে স্বস্তির খবর হলো, কোনো ভবনই সরাসরি লেকের পানিতে বর্জ্য ফেলছে না।
প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, বারিধারা কূটনৈতিক এলাকার ৪২টি ভবনে নিরাপত্তার কারণে পরিদর্শন দল প্রবেশের অনুমতি পায়নি। এছাড়া টিম-১ এর আওতাধীন এলাকায় পাঁচটি ভবনে আধুনিক এসটিপি ব্যবস্থা সচল পাওয়া গেছে।
ভবনে সেপটিক ট্যাংক না থাকলে কী শাস্তি
অনুমোদিত ভবন নকশা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসম্মত সেপটিক ট্যাংক বা সমমানের অনুমোদিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকলে নানা ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, অনুমোদিত ভবন নকশা (প্ল্যান) অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক নির্মাণ না করলে বা ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) লঙ্ঘন করলে ভবন মালিককে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অভাব এবং জবাবদিহিতার কারণে এই পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান সভাপতি, বিআইপি
এ ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক নির্মাণ না করার কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হতে পারে। এছাড়া অবৈধ বা ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ সংশোধনের নির্দেশও দিতে পারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনে আদালতের নির্দেশে ভবনের অবৈধ অংশ বা নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত সেপটিক ট্যাংক অপসারণ, ভেঙে ফেলা কিংবা ভরাট করার আদেশ দেওয়া হতে পারে। আদালতের নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে কাজ সম্পন্ন করে এর ব্যয় ভবন মালিকের কাছ থেকে আদায় করার ক্ষমতা রাখে।
১৯৫২ সালের বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-এর ধারা ১২ অনুযায়ী, কোড লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ, নকশা অনুমোদন বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আদালত সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড, ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দিতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবনে সেপটিক ট্যাংক না থাকলে বা মানববর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে নিষ্কাশন করা হলে ভূগর্ভস্থ পানিদূষণ, ড্রেন, খাল ও নদী দূষণ, দুর্গন্ধ, সংক্রামক রোগের ঝুঁকি এবং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির মতো গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে জনস্বার্থে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি কর্পোরেশন বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকম-কে বলেন, ‘গুলশান-বনানী-বারিধারার মতো সুপরিকল্পিত ও অভিজাত এলাকার সেপটিক ট্যাংক এবং সোকওয়েল না থাকার কোনো সুযোগ নেই। অথচ ভবন মালিকেরা নকশা লঙ্ঘন করে মানববর্জ্য সরাসরি উন্মুক্ত ড্রেন ও লেকে নিষ্কাশন করার মাধ্যমে চরম পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটাচ্ছেন। দেশের প্রচলিত ইমারত ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী, নিজস্ব জায়গায় সেপটিক ট্যাংক না রাখা নকশা বহির্ভূত অবৈধ নির্মাণ, যার শাস্তি হিসেবে ভবন ভাঙার নির্দেশ বা কারাদণ্ড হতে পারে। আর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, অপরিশোধিত বর্জ্য জলাশয়ে ফেলে পরিবেশ দূষণের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন আইন অনুযায়ী বৃষ্টির পানির ড্রেনে পয়ঃবর্জ্যের সংযোগ দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ, যার ফলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা ও লাইন কেটে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অভিজাত এলাকায় এমন পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অভাব এবং জবাবদিহিতার কারণে এই পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। এর স্থায়ী সমাধানে ভবন মালিকদের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে আধুনিক সেপটিক ট্যাংক নির্মাণে বাধ্য করা এবং ব্যর্থতায় গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি বিচ্ছিন্ন করাসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’

মাঝপথে বদলে গেল ৯০০ কোটির দরপত্রের ধরন


