শিরোনাম
সরকারি নির্মাণে বিশৃঙ্খলা

বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে বাড়ছে ব্যয়, থাকছেনা জবাবদিহি

বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে বাড়ছে ব্যয়, থাকছেনা জবাবদিহি
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

দীর্ঘ সময় ধরে চলছে রাজধানী তেজগাঁওয়ের বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) স্থাপনা নির্মাণ কাজ। চলচ্চিত্রশিল্পের আধুনিকায়নে ২০১৮ সালে শুরু হয় ‘বিএফডিসি কমপ্লেক্স’ নির্মাণের এই প্রকল্প। যার ব্যয় ৩৬৫ কোটি ৫১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে সরকারের এই প্রকল্পটি হয়েছে ‘ব্যক্তি ইচ্ছার প্রতিফলন’। সরকারি চাকরিতে যুক্ত নয় এমন একজন পরামর্শক দিয়ে মূলত এ কাজটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। সেই সূত্রে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি হাতিয়ে নিচ্ছে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। আর সরকার পাচ্ছে না গুণগত মানের নিশ্চয়তা।

অথচ তেজগাঁও এলাকার সরকারি স্থাপনা নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভাগ-৩। এর অধীনে বছর তিনেক আগে হয়েছে আরেকটি সরকারি স্থাপনা ‘ভূমি ভবন’। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের একক ইচ্ছায় গণপূর্ত বিভাগকে পাশ কাটিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন ক্যাডারের এক কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক করা হয়। প্রকল্পের তদারকির জন্য একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলীকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যার ফলে পরিবর্তন হয়েছে পরিকল্পনা, অর্থ ব্যয়ে হয়েছে বিধিলঙ্ঘন এবং বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে কাজ। এতে যেমন ব্যয় বেড়েছে, তেমনি প্রশ্ন উঠেছে কাজের মান নিয়েও।

বিএফডিসি প্রকল্পের ঘটনা এ বিচ্ছিন্ন নয়। সরকারি নির্মাণ খাতে এখন এমন এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যেখানে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তরকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা নিজেদের মতো করে নির্মাণকাজ পরিচালনা করছে। গড়ে তুলছে ছোট ছোট নির্মাণ সংক্রান্ত উইং। ফলে সমন্বয়হীনতা, ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল অবকাঠামো, তদারকি ও জবাবদিহির অভাব দৃশ্যমান।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি)
চলচ্চিত্রশিল্পের আধুনিকায়নে ২০১৮ সালে শুরু হয় ‘বিএফডিসি কমপ্লেক্স’ নির্মাণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

নেই কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল, ইচ্ছেমত নিচ্ছে প্রকল্প

২০২৩ সালের ১০ মার্চ সাভারে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নির্মাণাধীন একটি ভবনের ছাদ ধসে পড়ে। পরমাণু শক্তি কমিশনের একটি প্রকল্পের আওতায় নিজেদের নকশায় ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছিল। দুর্ঘটনায় প্রায় ১৫ জন শ্রমিক আহত হন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় একটি স্থাপনা নির্মাণে নেওয়া হয়নি বিশেষায়িত প্রতিঠানের মতামত। এরপর রাজউক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিছুটা তৎপর হলেও পরে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) এবং স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এইচইডি) অধীনে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি অফিস, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানহীন নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা প্রায়ই সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজ না করেই ভুয়া বিল উত্তোলন এবং ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে ঘন ঘন নকশা পরিবর্তনের অভিযোগও রয়েছে সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) এবং স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এইচইডি) অধীনে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি অফিস, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানহীন নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা প্রায়ই সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজ না করেই ভুয়া বিল উত্তোলন এবং ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে ঘন ঘন নকশা পরিবর্তনের অভিযোগও রয়েছে সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, প্রায় প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠান এখন আলাদা করে নির্মাণ ইউনিট গড়ে তুলছে। এতে একই ধরনের কাজের জন্য বারবার প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে হচ্ছে, বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। একই সঙ্গে নির্মাণ মান ও জবাবদিহির ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে বৈষম্য।


‘রুলস অব বিজনেস’ উপেক্ষিত

জানা যায়, ‘অ্যালোকেশন অব বিজনেস’ বা ‘রুলস অব বিজনেস’ অনুযায়ী সরকারি ভবন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্ব গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত অধিদপ্তরের। সারা দেশে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ ও সংরক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে।

রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদপ্তরের। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে এসব কাজ করছে। নির্মাণকাজের জন্য একের পর এক আলাদা অধিদপ্তর তৈরি করা হচ্ছে। এতে নতুন করে জনবল, অফিস ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হচ্ছে। অথচ গণপূর্তের পুরো সেটআপ আগে থেকেই রয়েছেআব্দুল্লাহ মুহাম্মদ জুবাইর নির্বাহী প্রকৌশলী, গণপূর্ত প্রকল্প বিভাগ-২

গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ে রয়েছে ১০টি সিভিল ও তিনটি ই/এম জোন, সদর দপ্তরে রয়েছে আরও চারটি জোন। প্রতিটি জোনের অধীনে রয়েছে একাধিক সার্কেল, বিভাগ ও উপবিভাগ। ফলে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে নির্মাণকাজ তদারকির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। এ সংস্থার ক্যাডার প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলীর সংখ্যা ২৪০৩ জন।

গণপূর্ত প্রকল্প বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ জুবাইর সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমে বলেন, ‘রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদপ্তরের। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে এসব কাজ করছে। নির্মাণকাজের জন্য একের পর এক আলাদা অধিদপ্তর তৈরি করা হচ্ছে। এতে নতুন করে জনবল, অফিস ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হচ্ছে। অথচ গণপূর্তের পুরো সেটআপ আগে থেকেই রয়েছে।

মনিটরিং ও জবাবদিহির ঘাটতি

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রতিটি প্রকল্পে ধাপে ধাপে তদারকির ব্যবস্থা রয়েছে। উপ-সহকারী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে সহকারী প্রকৌশলী, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হয়ে প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে প্রকল্প মনিটরিং করা হয়। ফলে কাজের গুণগত মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হয়। কিন্তু বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের উদ্যোগে নির্মাণকাজ পরিচালনা করলে অনেক ক্ষেত্রে এই প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিং ব্যবস্থা থাকে না। এর ফলে সিদ্ধান্তহীনতা, সময়ক্ষেপণ এবং ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়।

এটাকে আসলে ফ্রাগমেন্টেড পাবলিক ওয়ার্কস বলা হয়। আমি মনে করি এর অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এতে অর্থের অপচয় হয়। সবচেয়ে বড় কথা, নির্মাণের মান বা স্ট্যান্ডার্ড নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকেমো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী প্রধান প্রকৌশলী, গণপূর্ত অধিদপ্তর

সংশ্লিষ্টদের মতে, গণপূর্ত অধিদপ্তর ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নকশা প্রণয়নের জন্য পরামর্শক নিয়োগ করে, যা সরকারের আর্থিক ব্যয় বাড়ায়। অন্যদিকে ডেলিগেটেড কাজগুলোও নানা জটিলতার মধ্যে দিয়ে পার করতে হয়। বিশেষ করে মন্ত্রণালয় বা দপ্তরগুলোর নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তারা দায়িত্বে থাকায় অনেক সময় জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে ব্যয় বাড়ে আর বদনাম হয় বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের।

‘ফ্রাগমেন্টেড পাবলিক ওয়ার্কস’ নিয়ে উদ্বেগ

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘এটাকে আসলে ফ্রাগমেন্টেড পাবলিক ওয়ার্কস বলা হয়। আমি মনে করি এর অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এতে অর্থের অপচয় হয়। সবচেয়ে বড় কথা, নির্মাণের মান বা স্ট্যান্ডার্ড নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

তিনি বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিতে পারে। অন্য বিভাগগুলো কিছু অংশে কাজ করতে পারে। কিন্তু অবশ্যই একটি নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ থাকতে হবে। বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেই ভূমিকা গণপূর্ত অধিদপ্তরই পালন করতে পারে।’

‘বিএনবিসি অনুসরণে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে’

নগরবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘প্রকৌশল একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র। গবেষণাভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামো এবং কার্যকর ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে কম খরচে উন্নতমানের কাজ নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে নির্মাণকাজ পরিচালনা করায় গুণগত উৎকর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

প্রকৌশল একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র। গবেষণাভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামো এবং কার্যকর ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে কম খরচে উন্নতমানের কাজ নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে নির্মাণকাজ পরিচালনা করায় গুণগত উৎকর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থপতি ইকবাল হাবিব নগরবিদ

তিনি বলেন, ‘সরকারি নির্মাণকাজ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। ফলে জবাবদিহিতা দুর্বল হচ্ছে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে।’

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ জুবাইর বলেন, ‘আমরা নির্মাণকাজে স্বয়ংসম্পূর্ণ। নকশা, প্রাক্কলন, তদারকি সবই নিজস্ব জনবল দিয়ে করতে পারি। এজন্য আলাদা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না। ফলে ব্যয়ও কম হয়। সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পে এলজিইডির প্রস্তাবিত ব্যয়ের তুলনায় আমাদের প্রাক্কলন প্রায় ১২০ কোটি টাকা কম ছিল।’

/এসএ/