এক্সপ্লেইনার
যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে নৌ-অবরোধ ও ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ পরিচালনা করছে

যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে নৌ-অবরোধ ও ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ পরিচালনা করছে
মোসাদ্দেকুর রহমান
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ১৯: ৪৭

ছবি: সিটিজেন গ্রাফিক্স
পৃথিবীর মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দূরত্ব প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার। মাঝখানে শুধু আটলান্টিক নয়, পুরো ইউরেশীয় ভূখণ্ড, আরব সাগর ও পারস্য উপসাগরের জটিল ভূরাজনীতি। কিন্তু সেই দূরত্বও ওয়াশিংটনের সামরিক ক্ষমতার সামনে কার্যত বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
সাম্প্রতিক উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইরানের ওপর নৌ-অবরোধই আরোপ করেনি, বরং হরমুজ প্রণালিতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে বহুজাতিক নৌ-অভিযানও পরিচালনা করছে। প্রশ্ন হচ্ছে—ভৌগোলিকভাবে এত দূরে থেকেও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এই সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে?
উত্তরটি লুকিয়ে আছে আমেরিকার বৈশ্বিক সামরিক অবকাঠামো, নৌবাহিনীর দীর্ঘ-পাল্লার সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা কৌশলগত উপস্থিতির মধ্যে।

হরমুজ প্রণালি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ‘চোকপয়েন্ট’গুলোর একটি। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা মানেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা। সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান কার্যত এই প্রণালির ওপর চাপ সৃষ্টি করলে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা কৌশল নেয়—ইরানের বন্দরগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিজেদের সামরিক ছাতার নিচে নিয়ে আসা।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার ‘ফরওয়ার্ড ডিপ্লয়মেন্ট’ বা অগ্রবর্তী সামরিক উপস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর (ফিফ্থ ফ্লিট) স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে বাহরাইনে। এখান থেকেই পারস্য উপসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির সামরিক তদারকি পরিচালিত হয়। অর্থাৎ, যুদ্ধজাহাজগুলোকে প্রতিবার আমেরিকা থেকে পাঠাতে হয় না; বহু জাহাজ ও সেনা আগেই এই অঞ্চলে মোতায়েন থাকে।

এ ছাড়া কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটি, অস্ত্রের মজুত ও সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এসব ঘাঁটি যুদ্ধজাহাজে জ্বালানি, অস্ত্র, ড্রোন ও গোয়েন্দা সহায়তা সরবরাহ করে। ফলে ভৌগোলিক দূরত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক মার্কিন নৌবাহিনী নিজেই এক ধরনের ভাসমান সামরিক ঘাঁটি। একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী কয়েক হাজার সেনা, যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে। এর সঙ্গে থাকে ডেস্ট্রয়ার, সাবমেরিন, সরবরাহ জাহাজ এবং নজরদারি প্ল্যাটফর্ম। সাম্প্রতিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষম ডেস্ট্রয়ার, ড্রোন এবং বহু-মাত্রিক নজরদারি ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সামরিক কাঠামোর ফলে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত সমুদ্রপথে ‘মোবাইল কন্ট্রোল জোন’ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, কোনো দেশের সীমান্তে স্থায়ীভাবে না থেকেও তারা নির্দিষ্ট সামুদ্রিক অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে না; তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাকেও কাজে লাগাচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনী সন্দেহভাজন জাহাজ থামিয়ে তল্লাশি করছে, ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারের গতিপথ বদলে দিচ্ছে এবং বীমা ও শিপিং কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছে। ফলে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ স্বেচ্ছায় ইরানি বন্দরে যাওয়া এড়িয়ে চলছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি পূর্ণাঙ্গ নৌ-অবরোধ নয়। আন্তর্জাতিক আইনে পূর্ণাঙ্গ অবরোধ সাধারণত যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য। তাই ওয়াশিংটন কৌশলে এটিকে ‘ম্যারিটাইম সিকিউরিটি অপারেশন’ বা ‘নৌ নিরাপত্তা অভিযান’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে চলাচলে সহায়তা করা। কিন্তু বাস্তবে এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে এবং ইরানের অর্থনৈতিক প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক প্রাধান্য সত্ত্বেও ইরান পুরোপুরি কোণঠাসা হয়নি। কারণ, হরমুজ প্রণালি এমন একটি ভৌগোলিক এলাকা, যেখানে ছোট শক্তিও বড় শক্তিকে বিপদে ফেলতে পারে। ইরান দ্রুতগতির ছোট নৌকা, সামুদ্রিক মাইন, ড্রোন এবং উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধ’ কৌশল নিচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরান জানে যে সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীকে হারানো সম্ভব নয়; তাই তারা সমুদ্রপথকে অনিরাপদ করে তোলার মাধ্যমে বৈশ্বিক চাপ তৈরি করতে চায়।

এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হরমুজে উপস্থিতি বজায় রাখা ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন হাজার হাজার সেনা, যুদ্ধজাহাজ ও বিমান পরিচালনা করতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। একইসঙ্গে সামান্য ভুল হিসাবও বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ইতোমধ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও জাহাজ জব্দের ঘটনা ঘটেছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির মূল রহস্য শুধু তার নিজস্ব ভূখণ্ড নয়; বরং পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সামরিক ঘাঁটি, নৌবহর, মিত্ররাষ্ট্র এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধক্ষমতা। ওয়াশিংটন আসলে আমেরিকার মূল ভূখন্ড থেকে যুদ্ধ করছে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরেই বহু দশক ধরে গড়ে তোলা সামরিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে।
কিন্তু ইতিহাস বলছে, সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ করা আর রাজনৈতিকভাবে বিজয়ী হওয়া এক জিনিস নয়। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের বন্দর অবরুদ্ধ করতে পারে, জাহাজ থামাতে পারে কিংবা হরমুজে সামরিক করিডোর তৈরি করতে পারে; কিন্তু ইরানও জানে, এই সরু জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি করতে পারলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—তার অভিঘাত গিয়ে পড়বে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
হরমুজ তাই এখন শুধু একটি প্রণালি নয়; এটি পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক শক্তির পরীক্ষাগারে, যেখানে দূরত্ব নয়, সামরিক উপস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক ধৈর্যই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কার প্রভাব বেশি স্থায়ী হবে।

পৃথিবীর মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দূরত্ব প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার। মাঝখানে শুধু আটলান্টিক নয়, পুরো ইউরেশীয় ভূখণ্ড, আরব সাগর ও পারস্য উপসাগরের জটিল ভূরাজনীতি। কিন্তু সেই দূরত্বও ওয়াশিংটনের সামরিক ক্ষমতার সামনে কার্যত বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
সাম্প্রতিক উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইরানের ওপর নৌ-অবরোধই আরোপ করেনি, বরং হরমুজ প্রণালিতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে বহুজাতিক নৌ-অভিযানও পরিচালনা করছে। প্রশ্ন হচ্ছে—ভৌগোলিকভাবে এত দূরে থেকেও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এই সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে?
উত্তরটি লুকিয়ে আছে আমেরিকার বৈশ্বিক সামরিক অবকাঠামো, নৌবাহিনীর দীর্ঘ-পাল্লার সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা কৌশলগত উপস্থিতির মধ্যে।

হরমুজ প্রণালি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ‘চোকপয়েন্ট’গুলোর একটি। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা মানেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা। সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান কার্যত এই প্রণালির ওপর চাপ সৃষ্টি করলে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা কৌশল নেয়—ইরানের বন্দরগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিজেদের সামরিক ছাতার নিচে নিয়ে আসা।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার ‘ফরওয়ার্ড ডিপ্লয়মেন্ট’ বা অগ্রবর্তী সামরিক উপস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর (ফিফ্থ ফ্লিট) স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে বাহরাইনে। এখান থেকেই পারস্য উপসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির সামরিক তদারকি পরিচালিত হয়। অর্থাৎ, যুদ্ধজাহাজগুলোকে প্রতিবার আমেরিকা থেকে পাঠাতে হয় না; বহু জাহাজ ও সেনা আগেই এই অঞ্চলে মোতায়েন থাকে।

এ ছাড়া কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটি, অস্ত্রের মজুত ও সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এসব ঘাঁটি যুদ্ধজাহাজে জ্বালানি, অস্ত্র, ড্রোন ও গোয়েন্দা সহায়তা সরবরাহ করে। ফলে ভৌগোলিক দূরত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক মার্কিন নৌবাহিনী নিজেই এক ধরনের ভাসমান সামরিক ঘাঁটি। একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী কয়েক হাজার সেনা, যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে। এর সঙ্গে থাকে ডেস্ট্রয়ার, সাবমেরিন, সরবরাহ জাহাজ এবং নজরদারি প্ল্যাটফর্ম। সাম্প্রতিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষম ডেস্ট্রয়ার, ড্রোন এবং বহু-মাত্রিক নজরদারি ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সামরিক কাঠামোর ফলে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত সমুদ্রপথে ‘মোবাইল কন্ট্রোল জোন’ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, কোনো দেশের সীমান্তে স্থায়ীভাবে না থেকেও তারা নির্দিষ্ট সামুদ্রিক অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে না; তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাকেও কাজে লাগাচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনী সন্দেহভাজন জাহাজ থামিয়ে তল্লাশি করছে, ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারের গতিপথ বদলে দিচ্ছে এবং বীমা ও শিপিং কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছে। ফলে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ স্বেচ্ছায় ইরানি বন্দরে যাওয়া এড়িয়ে চলছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি পূর্ণাঙ্গ নৌ-অবরোধ নয়। আন্তর্জাতিক আইনে পূর্ণাঙ্গ অবরোধ সাধারণত যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য। তাই ওয়াশিংটন কৌশলে এটিকে ‘ম্যারিটাইম সিকিউরিটি অপারেশন’ বা ‘নৌ নিরাপত্তা অভিযান’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে চলাচলে সহায়তা করা। কিন্তু বাস্তবে এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে এবং ইরানের অর্থনৈতিক প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক প্রাধান্য সত্ত্বেও ইরান পুরোপুরি কোণঠাসা হয়নি। কারণ, হরমুজ প্রণালি এমন একটি ভৌগোলিক এলাকা, যেখানে ছোট শক্তিও বড় শক্তিকে বিপদে ফেলতে পারে। ইরান দ্রুতগতির ছোট নৌকা, সামুদ্রিক মাইন, ড্রোন এবং উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধ’ কৌশল নিচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরান জানে যে সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীকে হারানো সম্ভব নয়; তাই তারা সমুদ্রপথকে অনিরাপদ করে তোলার মাধ্যমে বৈশ্বিক চাপ তৈরি করতে চায়।

এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হরমুজে উপস্থিতি বজায় রাখা ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন হাজার হাজার সেনা, যুদ্ধজাহাজ ও বিমান পরিচালনা করতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। একইসঙ্গে সামান্য ভুল হিসাবও বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ইতোমধ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও জাহাজ জব্দের ঘটনা ঘটেছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির মূল রহস্য শুধু তার নিজস্ব ভূখণ্ড নয়; বরং পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সামরিক ঘাঁটি, নৌবহর, মিত্ররাষ্ট্র এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধক্ষমতা। ওয়াশিংটন আসলে আমেরিকার মূল ভূখন্ড থেকে যুদ্ধ করছে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরেই বহু দশক ধরে গড়ে তোলা সামরিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে।
কিন্তু ইতিহাস বলছে, সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ করা আর রাজনৈতিকভাবে বিজয়ী হওয়া এক জিনিস নয়। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের বন্দর অবরুদ্ধ করতে পারে, জাহাজ থামাতে পারে কিংবা হরমুজে সামরিক করিডোর তৈরি করতে পারে; কিন্তু ইরানও জানে, এই সরু জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি করতে পারলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—তার অভিঘাত গিয়ে পড়বে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
হরমুজ তাই এখন শুধু একটি প্রণালি নয়; এটি পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক শক্তির পরীক্ষাগারে, যেখানে দূরত্ব নয়, সামরিক উপস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক ধৈর্যই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কার প্রভাব বেশি স্থায়ী হবে।

যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে নৌ-অবরোধ ও ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ পরিচালনা করছে
মোসাদ্দেকুর রহমান
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ১৯: ৪৭

ছবি: সিটিজেন গ্রাফিক্স
পৃথিবীর মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দূরত্ব প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার। মাঝখানে শুধু আটলান্টিক নয়, পুরো ইউরেশীয় ভূখণ্ড, আরব সাগর ও পারস্য উপসাগরের জটিল ভূরাজনীতি। কিন্তু সেই দূরত্বও ওয়াশিংটনের সামরিক ক্ষমতার সামনে কার্যত বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
সাম্প্রতিক উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইরানের ওপর নৌ-অবরোধই আরোপ করেনি, বরং হরমুজ প্রণালিতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে বহুজাতিক নৌ-অভিযানও পরিচালনা করছে। প্রশ্ন হচ্ছে—ভৌগোলিকভাবে এত দূরে থেকেও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এই সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে?
উত্তরটি লুকিয়ে আছে আমেরিকার বৈশ্বিক সামরিক অবকাঠামো, নৌবাহিনীর দীর্ঘ-পাল্লার সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা কৌশলগত উপস্থিতির মধ্যে।

হরমুজ প্রণালি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ‘চোকপয়েন্ট’গুলোর একটি। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা মানেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা। সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান কার্যত এই প্রণালির ওপর চাপ সৃষ্টি করলে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা কৌশল নেয়—ইরানের বন্দরগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিজেদের সামরিক ছাতার নিচে নিয়ে আসা।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার ‘ফরওয়ার্ড ডিপ্লয়মেন্ট’ বা অগ্রবর্তী সামরিক উপস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর (ফিফ্থ ফ্লিট) স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে বাহরাইনে। এখান থেকেই পারস্য উপসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির সামরিক তদারকি পরিচালিত হয়। অর্থাৎ, যুদ্ধজাহাজগুলোকে প্রতিবার আমেরিকা থেকে পাঠাতে হয় না; বহু জাহাজ ও সেনা আগেই এই অঞ্চলে মোতায়েন থাকে।

এ ছাড়া কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটি, অস্ত্রের মজুত ও সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এসব ঘাঁটি যুদ্ধজাহাজে জ্বালানি, অস্ত্র, ড্রোন ও গোয়েন্দা সহায়তা সরবরাহ করে। ফলে ভৌগোলিক দূরত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক মার্কিন নৌবাহিনী নিজেই এক ধরনের ভাসমান সামরিক ঘাঁটি। একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী কয়েক হাজার সেনা, যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে। এর সঙ্গে থাকে ডেস্ট্রয়ার, সাবমেরিন, সরবরাহ জাহাজ এবং নজরদারি প্ল্যাটফর্ম। সাম্প্রতিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষম ডেস্ট্রয়ার, ড্রোন এবং বহু-মাত্রিক নজরদারি ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সামরিক কাঠামোর ফলে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত সমুদ্রপথে ‘মোবাইল কন্ট্রোল জোন’ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, কোনো দেশের সীমান্তে স্থায়ীভাবে না থেকেও তারা নির্দিষ্ট সামুদ্রিক অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে না; তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাকেও কাজে লাগাচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনী সন্দেহভাজন জাহাজ থামিয়ে তল্লাশি করছে, ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারের গতিপথ বদলে দিচ্ছে এবং বীমা ও শিপিং কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছে। ফলে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ স্বেচ্ছায় ইরানি বন্দরে যাওয়া এড়িয়ে চলছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি পূর্ণাঙ্গ নৌ-অবরোধ নয়। আন্তর্জাতিক আইনে পূর্ণাঙ্গ অবরোধ সাধারণত যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য। তাই ওয়াশিংটন কৌশলে এটিকে ‘ম্যারিটাইম সিকিউরিটি অপারেশন’ বা ‘নৌ নিরাপত্তা অভিযান’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে চলাচলে সহায়তা করা। কিন্তু বাস্তবে এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে এবং ইরানের অর্থনৈতিক প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক প্রাধান্য সত্ত্বেও ইরান পুরোপুরি কোণঠাসা হয়নি। কারণ, হরমুজ প্রণালি এমন একটি ভৌগোলিক এলাকা, যেখানে ছোট শক্তিও বড় শক্তিকে বিপদে ফেলতে পারে। ইরান দ্রুতগতির ছোট নৌকা, সামুদ্রিক মাইন, ড্রোন এবং উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধ’ কৌশল নিচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরান জানে যে সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীকে হারানো সম্ভব নয়; তাই তারা সমুদ্রপথকে অনিরাপদ করে তোলার মাধ্যমে বৈশ্বিক চাপ তৈরি করতে চায়।

এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হরমুজে উপস্থিতি বজায় রাখা ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন হাজার হাজার সেনা, যুদ্ধজাহাজ ও বিমান পরিচালনা করতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। একইসঙ্গে সামান্য ভুল হিসাবও বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ইতোমধ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও জাহাজ জব্দের ঘটনা ঘটেছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির মূল রহস্য শুধু তার নিজস্ব ভূখণ্ড নয়; বরং পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সামরিক ঘাঁটি, নৌবহর, মিত্ররাষ্ট্র এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধক্ষমতা। ওয়াশিংটন আসলে আমেরিকার মূল ভূখন্ড থেকে যুদ্ধ করছে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরেই বহু দশক ধরে গড়ে তোলা সামরিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে।
কিন্তু ইতিহাস বলছে, সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ করা আর রাজনৈতিকভাবে বিজয়ী হওয়া এক জিনিস নয়। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের বন্দর অবরুদ্ধ করতে পারে, জাহাজ থামাতে পারে কিংবা হরমুজে সামরিক করিডোর তৈরি করতে পারে; কিন্তু ইরানও জানে, এই সরু জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি করতে পারলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—তার অভিঘাত গিয়ে পড়বে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
হরমুজ তাই এখন শুধু একটি প্রণালি নয়; এটি পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক শক্তির পরীক্ষাগারে, যেখানে দূরত্ব নয়, সামরিক উপস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক ধৈর্যই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কার প্রভাব বেশি স্থায়ী হবে।
/এমআর/




