শিরোনাম

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের মুখে ইরান কতদিন টিকতে পারবে

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের মুখে ইরান কতদিন টিকতে পারবে
ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রতীকী চিত্র। ছবি: সংগৃহীত

চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ, বাণিজ্যিক জাহাজ আটক এবং এর প্রেক্ষিতে ইরানের সামরিক বাহিনী কর্তৃক হরমুজ প্রণালি আবারও পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা—এই পাল্টাপাল্টি রণকৌশলের মধ্যে ইরান-মার্কিন দ্বন্দ্ব এখন এক জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সরাসরি সংঘাত থেকে বিরত থাকলেও এই কৌশলের যুদ্ধে ইরান কতদিন টিকতে পারবে? একইসঙ্গে, এর প্রভাব থেকে যুক্তরাষ্ট্র কী মুক্ত থাকতে পারবে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইরান অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধের কারণে ইরান প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ হারাচ্ছে এবং দেশটির ভেতরে আর্থিক সংকট তীব্র হচ্ছে। তিনি এমনও বলেছেন, ইরানের সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যন্ত বেতন না পাওয়ার অভিযোগ করছে।

তবে বাস্তব চিত্র এতটা সরল নয়।

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের জব্দকৃত জাহাজ। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের জব্দকৃত জাহাজ। ছবি: রয়টার্স

অবরোধে কতটা চাপে ইরান

১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া মার্কিন নৌ অবরোধ মূলত ইরানের সমুদ্রপথে বাণিজ্য—বিশেষ করে তেল রপ্তানি থামিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে। কারণ ইরানের অর্থনীতির বড় অংশই নির্ভর করে তেল, গ্যাস এবং সংশ্লিষ্ট পণ্য রপ্তানির ওপর।

হরমুজ প্রণালি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ, যেখানে দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি পরিবহন হয়। এই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে।

কিন্তু চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই সংকটের মধ্যেও ইরান তাদের তেল রপ্তানি পুরোপুরি থামায়নি। বরং সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, যুদ্ধের আগে যেখানে তারা মাসে প্রায় ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার আয় করতো, সেখানে এখন সেই আয় বেড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অর্থাৎ দাম বৃদ্ধির কারণে আয়ের পরিমাণ উল্টো বেড়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই অবস্থা দীর্ঘদিন থাকবে না।

মজুত তেল: ইরানের বড় শক্তি

ইরানের হাতে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে—সমুদ্রে ভাসমান বিপুল পরিমাণ তেল মজুত। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ট্যাংকারে ১৬ থেকে ১৮ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল মজুত আছে।

এই মজুত থেকেই ইরান কয়েক মাস রাজস্ব আয় চালিয়ে যেতে পারবে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই সরবরাহ ধরে রাখলে আগস্ট পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবাহ বজায় রাখা সম্ভব।

অন্যদিকে, ইরান বিকল্প ব্যবস্থাও নিচ্ছে। পুরনো ট্যাংকার আবার ব্যবহার করা, সমুদ্রে তেল সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে উৎপাদন ধীরে ধীরে কমানো।

হরমুজ প্রণালিতে ভাসমান তেলবাহী ট্যাংকার। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালিতে ভাসমান তেলবাহী ট্যাংকার। ছবি: রয়টার্স

চাপ বাড়লেও মোকাবেলায় প্রস্তুত ইরান

অবরোধের ফলে ইরানের ওপর চাপ বাড়ছে—বিশেষ করে নতুন করে তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে মজুত সংকট দেখা দিতে পারে। অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণাগারও সীমিত, যা মাত্র ২০ দিনের উৎপাদন ধরে রাখতে পারে।

তবুও ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব বারবার বলছে, তারা এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল। তাদের মতে, এটি কেবল অর্থনৈতিক লড়াই নয়, বরং জাতীয় মর্যাদা ও টিকে থাকার প্রশ্ন।

ইরানের নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বার্তা স্পষ্ট—অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য থাকলেও সংকটের সময় তারা একতাবদ্ধ।

যুক্তরাষ্ট্র কি দীর্ঘদিন অবরোধ চালাতে পারবে

যুক্তরাষ্ট্রের এই নৌ অবরোধ শুধু সামরিক বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িত অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, কংগ্রেসের অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—বিশেষ করে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা।

আইনগতভাবে প্রেসিডেন্টের হাতে সীমিত সময় থাকে এমন সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য। সেই সময়সীমা শেষ হলে কংগ্রেসের অনুমোদন দরকার হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এই অবরোধ চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়।

তার ওপর, চীনের মতো বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ইতিমধ্যেই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে বাধা দেওয়াকে অগ্রহণযোগ্য বলেছে। যদি চীনা জাহাজ আটক অব্যাহত থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

হরমুজে পাল্টা চাপ

ইরানও বসে নেই। তারা হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করছে। বিদেশি জাহাজ আটক, টোল আরোপ এবং প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি—সব মিলিয়ে তারা দেখাচ্ছে, এই পথ তাদের হাতেই।

এমনকি কিছু জাহাজ থেকে মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত টোল আদায়ের কথাও জানা গেছে।

হরমুজ প্রণালিতে ৩ পণ্যবাহী জাহাজে ইরানের হামলা। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালিতে ৩ পণ্যবাহী জাহাজে ইরানের হামলা। ছবি: রয়টার্স

ইরানের সামরিক বাস্তবতা

সরাসরি যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী হলেও, ইরান ব্যবহার করছে অপ্রতিসম কৌশল—গেরিলা হামলা, সাইবার আক্রমণ, প্রক্সি বাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত।

এই ধরনের কৌশল দীর্ঘমেয়াদে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলে। আর এখানেই ইরানের বড় শক্তি হলো ধৈর্য।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরান এমন চাপ দীর্ঘদিন সহ্য করতে পারে। কারণ এই ধরনের বৈশ্বিক চাপ ইরান দীর্ঘদিন ধরেই মোকাবেলা করতে অভ্যস্ত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও জনমতের পক্ষে অনুরূপ চাপ বহন করা কঠিন।

কে কতদিন টিকবে

এক কথায় বরতে গেলে কোনো পক্ষই তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে পড়বে না।

ইরান অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকলেও তাদের কাছে বিকল্প ব্যবস্থা, মজুত সম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল রয়েছে। তারা কয়েক মাস থেকে আরও বেশি সময় টিকে থাকতে পারে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ সমর্থনের সীমাবদ্ধতা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে এটি দ্রুত শেষ হওয়ার মতো কোনো সংঘাত নয়। বরং এটি ধৈর্য, কৌশল এবং সময়ের লড়াই—যেখানে শেষ পর্যন্ত জিতবে সেই পক্ষ, যে বেশি দিন চাপ সহ্য করতে পারবে এবং রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে পারবে।

/এমআর/