শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

যে কারণে ইরানে গোপন হামলা চালায় সৌদি আরব ও আমিরাত

সিটিজেন ডেস্ক
যে কারণে ইরানে গোপন হামলা চালায় সৌদি আরব ও আমিরাত

ওয়াশিংটন-তেহরান সংঘাতের মধ্যেই ইরানে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের গোপন বিমান হামলার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে এপ্রিলে পাল্টা আক্রমণ চালায় রিয়াদ ও আবুধাবি। যদিও সংশ্লিষ্ট কোনো দেশই এখন পর্যন্ত এ অভিযানের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। বিশ্লেষকরা একে তেহরানের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর একটি সুনির্দিষ্ট এবং সুপরিকল্পিত গোপন প্রতিরোধ হিসেবে দেখছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এপ্রিলের শুরুতে পারস্য উপসাগরের লাভান দ্বীপের একটি তেল শোধনাগারসহ ইরানের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। অন্যদিকে, রয়টার্স দুজন ইরানি ও দুজন পশ্চিমা কর্মকর্তার সূত্রে জানিয়েছে, মার্চের শেষের দিকে সৌদি আরবও ইরানের বিরুদ্ধে অসংখ্য বিমান হামলা চালিয়েছিল। এ সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা ছড়ালেও ওয়াশিংটন, তেহরান, রিয়াদ বা আবুধাবির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি। যদি এ হামলাগুলোর সত্যতা নিশ্চিত হয়, তবে এটিই হবে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইসলামী প্রজাতন্ত্রের মাটিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরাসরি সামরিক আঘাত।

সামরিক বিশ্লেষকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইরানের আকাশে ফরাসি মিরাজ যুদ্ধবিমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যবহৃত চীনা উইং লুং ড্রোনের উপস্থিতির ছবি শনাক্ত করেছেন, যা এ অভিযানের সত্যতাকে জোরালো করে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরব ও আমিরাতের কাছে এ অঞ্চলের সবচেয়ে আধুনিক ও সুসজ্জিত বিমান বাহিনী রয়েছে, যা ইরানের অভ্যন্তরে নিখুঁত হামলা চালাতে পুরোপুরি সক্ষম। যদিও রাজনৈতিকভাবে উভয় দেশই যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছিল এবং মার্কিন বাহিনীকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয়নি। সংঘাতের সময় ইরানের উপুর্যপরি হামলা তাদের সেই অবস্থান ধরে রাখতে দেয়নি। বিশেষ করে যুদ্ধ চলাকালে ইরান ২,৮০০টিরও বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করে, যা ছিল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও বেশি। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও নিরাপদ ভাবমূর্তি ভেঙে দেওয়া।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ গোপন হামলার মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের জন্য একটি কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করা, যাতে তারা বুঝতে পারে যে উপসাগরীয় অবকাঠামোতে আঘাত করলে ইরানের অভ্যন্তরেও পাল্টা আঘাত আসবে। এই সংঘাতের মাঝে সংযুক্ত আরব আমিরাত আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে। ইরানকে প্রতিহত করতে ইসরায়েল আমিরাতে আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। এমনকি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর গোপনে আমিরাত সফরের খবরও তার কার্যালয় প্রকাশ করেছে, যদিও আবুধাবি তা অস্বীকার করেছে। এদিকে ভারতের ব্রিকস সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তীব্র সমালোচনা করে আবুধাবিকে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন।

অন্যদিকে, সৌদি আরব অনেক বেশি সতর্ক কূটনীতি বজায় রেখে পাকিস্তান, ওমান ও কাতারের মাধ্যমে তেহরানকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে যে তারা ইসরায়েলের পক্ষে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলাগুলো অত্যন্ত গোপন রাখার মূল কারণ ছিল যেন তেহরান জনসমক্ষে অপমানিত বোধ না করে। একই সঙ্গে আমিরাতও নিজেকে ইসরায়েলের আরব অংশীদার হিসেবে প্রচার হওয়া থেকে বাঁচাতে এ হামলার বিষয়ে এক ধরনের বিশ্বাসযোগ্য অস্বীকৃতি বজায় রাখতে চেয়েছে। তবে এ ঘটনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে গেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষকে এখন যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরাসরি সামরিক প্রতিশোধের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। এ ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, মার্কিন সমর্থনের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিজেরাই নিতে শুরু করেছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে।

সূত্র: ফ্রান্স২৪ ডটকম

/এমএকে/