শিরোনাম

বন্যায় দুর্বিষহ জীবন, মিলছে না ত্রাণ

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
বন্যায় দুর্বিষহ জীবন, মিলছে না ত্রাণ
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে কোমরসমান পানি। এই পানি ডিঙিয়ে সেবা নিতে আসছেন রোগীরা।

টানা সাত দিনের বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি ঢল। নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করছে। সড়ক-মহাসড়ক, বসতঘর, বাজার, হাসপাতাল, থানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোমরসমান আবার কোথাও গলাসমান পানি। রান্না-বান্না, ব্যবসাসহ দিনের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ বন্ধ। বন্যা পরিস্থিতির কারণে দেশের সাত জেলায় মানুষ এভাবে সীমাহীন কষ্টে দিন পার করছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বন্যার কারণে দেশের কয়েকটি জেলার ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বন্যা ও পাহাড় ধসের ঘটনায় এ পর্যন্ত দেশের ছয় জেলায় ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। বন্যায় অনেকের ঘরবাড়ি ও জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে এখনও পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে কাগজে–কলমে চাহিদা অনুযায়ী ত্রাণ বিতরণের দাবি করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এসব এলাকায় শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকার জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে কক্সবাজার, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে কিছু নগদ টাকা, চাল ও খাদ্যসামগ্রী বরাদ্দ করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান শুক্রবার চট্টগ্রামের বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় ত্রাণ বিতরণ করেন। এই সময় তিনি সরকারের প্রতি বন্যাকবলিত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

বন্যায় রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও মৌলভীবাজারে ৪৪ জন মারা গেছে। এর মধ্যে রাঙামাটিতে তিনজন, বান্দরবানে ছয়জন, কক্সবাজারে ২৩ জন (স্থানীয় ১০ ও রোহিঙ্গা ১৩ জন), চট্টগ্রামে ১১ জন ও মৌলভীবাজারের একজন রয়েছে।

এসব জেলার ৫৮টি উপজেলার দুই লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবারের ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন পানিবন্দী রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম জেলার সাত লাখ ৫৯ হাজার ৫৩০ জন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের সাত জেলায় ৮৬০ টন চাল ও নগদ এক কোটি ৪৫ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। আর দেশের ৫৮টি উপজেলায় ৬ হাজার ৯০০ টন চাল ও তিন কোটি ৪৫ লাখ নগদ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় এক হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ অবস্থান করছে।

বন্যাকবলিত সাতটি জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারিভাবে চাহিদার তুলনায় অনেক কম ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। ফলে অনেক বন্যাদুর্গত মানুষ ত্রাণ না পেয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।

তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সঠিকভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন। এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় দুর্গতদের মাঝে পর্যাপ্ত পরিমাণে শুকনা খাবার ও চাল বিতরণ করা হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১১০ টন চাল বিতরণ করা হবে।

বন্যাকবলিত এলাকায় মানুষকে উদ্ধার, খাদ্যসামগ্রী ও নগদ টাকা বিতরণ এবং সার্বক্ষণিক তথ্য আদান–প্রদানে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের ওই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ভারতের পূর্ব মধ্য প্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে উঠেছে। আবহাওয়ার এই বৈরী আচরণের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বর্ষণের ফলে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে ।

দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্যোগ

এই সম্ভাব্য দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলা, উপদ্রুত অঞ্চলের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ অফিস আদেশ জারি করেছে। মন্ত্রণালয়ের ‘জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় কেন্দ্রকে (সার্বক্ষণিকভাবে সক্রিয় রাখতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তিন পালায় ২৪ ঘণ্টা বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ৯ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ দায়িত্ব ১৩ জুলাই পর্যন্ত পালন করতে হবে।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জেলা প্রশাসকদের দপ্তর, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র, এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও দুর্যোগ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ধসে প্রাণহানির পাশাপাশি প্রায় ৯ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বান্দরবানের সাঙ্গু নদীসহ কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নিরাপত্তাজনতি ঝুঁকিতে বান্দরবানের পর্যটনকেন্দ্রগুলো ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

সিলেটে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সুরমা, কুশিয়ারা ও মনু নদীর পানি সতর্কসীমা বা বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে পানি থৈ থৈ করছে এবং কিছু সড়ক ডুবে গেছে।

দেশের উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর ( তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার) পানি কিছুটা কমলেও উজানে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, বুড়িগঙ্গা, তুরাগসহ ঢাকা শহরের চারপাশের নদ-নদীর পানটা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে তা বিপৎসীমার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ।

/বিবি/