শিরোনাম

হরমুজে বাংলার জয়যাত্রার নাবিকদের দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়

সিটিজেন ডেস্ক
হরমুজে বাংলার জয়যাত্রার নাবিকদের দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়
হরমুজ প্রণালিতে ‘বাংলার জয়যাত্রা’। ছবি: সংগৃহীত

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রায় ২০ হাজার নাবিক এবং শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ ওই এলাকায় আটকা পড়ে আছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে একসময় বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। এখন সেই পথজুড়ে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সামরিক টহল এবং সমুদ্র-মাইনের ঝুঁকি।

এই পরিস্থিতির মধ্যেও নাবিকেরা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা তাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছে, তারা একটি যুদ্ধাঞ্চলে অবস্থান করছেন। তীরে নামার অনুমতি মিললেও অনেকেই আর নামতে চান না। জাহাজজুড়ে এখন আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই; নীরবতা ও দুশ্চিন্তাই যেন সবার সঙ্গী।

ক্যাপ্টেন হাসান খানের ভাষায়, সামান্য শব্দেও সবাই চমকে ওঠেন। এমনকি ঘুমের মধ্যেও আতঙ্ক তাড়া করে ফেরে। তিনি বলেন, ক্রমাগত মানসিক চাপের কারণে নাবিকেরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

বের হওয়ার পথ বন্ধ

নৌযান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএমওর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির বিপরীত পাশে প্রায় ১ হাজার ৬০০ জাহাজ আটকা পড়ে আছে। উপসাগর থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ হওয়ায় এই প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান প্রণালিটির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। তেহরান ঘোষণা দেয়, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পারবে না।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি এমন যে তাঁরা যেন একটি বন্ধ জলাশয়ে আটকা পড়েছেন। বের হওয়ার একমাত্র পথ হরমুজ, কিন্তু সেটিই কার্যত অচল।

প্রায় ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা ‘বাংলার জয়যাত্রা’ কয়েক মাস ধরে আটকে রয়েছে। জাহাজটি দুই দফা হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে বাধ্য হয়।

গত ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর একবার আশা তৈরি হয়েছিল। খবর আসে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) একটি জাহাজকে প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। সেই সুযোগে আরও কয়েকটি জাহাজের সঙ্গে এগোতে শুরু করে ‘বাংলার জয়যাত্রা’। কিন্তু মাঝপথেই সতর্কবার্তা পেয়ে যাত্রা বাতিল করতে হয়।

এর নয় দিন পর আবার চেষ্টা করা হয়। ইরান তখন জানিয়েছিল, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বহাল রাখায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তখন ‘বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ থেকে মাত্র ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল। রেডিওতে হামলার সতর্কতা ভেসে আসতে শুরু করলে জাহাজ ঘুরিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

খাবার-পানির সংকট

নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক জাহাজ বিভিন্ন বন্দরে আশ্রয় নিয়েছে অথবা উপকূলের কাছে নোঙর করে আছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে খাদ্য ও সুপেয় পানির সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো চালু থাকলেও সরবরাহের সময়সূচি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পানির দাম।

‘বাংলার জয়যাত্রা’র প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান জানান, সম্প্রতি ১৮০ টন পানি কিনতে তাঁদের ১১ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছে। অথচ একই পরিমাণ পানির জন্য আগে খরচ হতো সর্বোচ্চ দুই হাজার ডলার।

অন্য একটি জাহাজে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার এক নাবিকের অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু সরবরাহকারী অতিরিক্ত মুনাফা করছে।

সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মের তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। এতে পানির চাহিদাও বাড়বে।

মৃত্যুর ছায়া

শফিকুল ইসলাম জানান, সংঘাত শুরুর দ্বিতীয় দিনেই তাঁর জাহাজ জেবেল আলী বন্দরের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছিল, যখন ওই এলাকা হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। এরপর থেকে অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং বিস্ফোরণের ঘটনা তাঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন।

তিনি বলেন, অনেক সময় ক্ষেপণাস্ত্র জাহাজের ওপর দিয়ে উড়ে গেছে, কখনো আবার পাশের জাহাজে ধ্বংসাবশেষ আছড়ে পড়েছে।

প্রকৌশলী রাশেদুল হাসানের ভাষ্য, রাতভর হামলার শব্দে ঘুমানোর সুযোগ ছিল না। তাঁরা নিজের চোখে যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছেন।

আইএমও জানিয়েছে, এ পর্যন্ত অন্তত ৩৯টি হামলার ঘটনা যাচাই করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১১ জন নাবিক নিহত হয়েছেন এবং একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

যুদ্ধবিরতির পরও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। অনেক নাবিক এখনো নিয়মিত ড্রোন, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের উপস্থিতি দেখতে পাচ্ছেন।

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

দীর্ঘদিন আটকে থাকায় জাহাজ পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোও বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক নাবিকের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্মী পরিবর্তনও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তানি নাবিক কামিল (ছদ্মনাম) বলেন, এই সংকট সমুদ্রপেশার ঝুঁকি নতুন করে সামনে এনেছে। অনেক নাবিক ভবিষ্যতে এ পেশায় থাকার বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।

একই কথা বলেছেন বাবুর্চি সাজিদ মাসুদ (ছদ্মনাম)। তাঁর চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র এক মাস বাকি। তিনি দেশে ফিরে সন্তানদের জন্য উপহার নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। মেয়েদের জন্য বার্বি পুতুল আর ছেলের জন্য একটি খেলনা বিমান কেনার পরিকল্পনাও করে রেখেছেন।

কিন্তু কবে ফিরতে পারবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে নেই।

সাজিদ বলেন, প্রতিদিন পরিবারের সদস্যরা জানতে চান তিনি কবে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু তাদের দেওয়ার মতো কোনো নিশ্চিত উত্তর তাঁর কাছে নেই।

কূটনৈতিক সমাধানের অপেক্ষা

নৌপরিবহন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫০টি জাহাজ বিশেষ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর নেভাল অ্যানালাইসেসের গবেষক জনাথন শ্রোডেন বলেন, যেসব জাহাজ পার হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই ইরানের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনুমতি পেয়েছে। এসব জাহাজের বড় অংশ এসেছে চীন, ভারত ও পাকিস্তান থেকে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত মাশুলও দিতে হয়েছে।

‘বাংলার জয়যাত্রা’র ক্ষেত্রেও এখন কূটনৈতিক উদ্যোগকেই সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন জাহাজটির নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য কাজ করছে।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল মালেক জানান, শুরুতে ইরানের দাবি করা টোল পরিশোধের বিষয়ে সম্মতি ছিল। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের অর্থ পরিশোধকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিলে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে তারা এক ধরনের জটিল উভয়সংকটের মধ্যে রয়েছেন। ফলে কবে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ এবং এর নাবিকেরা মুক্তভাবে যাত্রা শুরু করতে পারবেন, তা এখনো অনিশ্চিত।

/এমআর/