শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

হঠাৎ কী ঘটলো দিল্লির রাজপথে

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
হঠাৎ কী ঘটলো দিল্লির রাজপথে
ব্যারিকেডে পুলিশের মুখোমুখি আন্দোলনকারীরা

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবনমুখী হাজারো আন্দোলনকারীর মিছিল, পুলিশের কড়া নিরাপত্তা, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ সব মিলিয়ে রাজধানী ছিল অস্থির।

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে ঘিরেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সংগঠনটির অভিযোগ, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিটে অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর দায় নিয়ে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, এটাই ছিল আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি।

আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে আরও কিছু বিষয় স্পষ্ট ছিল: শিক্ষা খাতের অনিয়ম, পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এখন ভারতের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

ভোর থেকেই জমতে থাকে জনসমাগম

কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আন্দোলনকারীরা দিল্লিতে আসতে শুরু করেন। রবিবার রাত থেকেই যন্তর মন্তরের আশপাশে জড়ো হতে থাকেন তারা।

সোমবার সকালে পরিস্থিতি বদলে যায়। সাধারণত রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য পরিচিত যন্তর মন্তর এলাকায় দেখা যায় ছাত্র, তরুণ কর্মী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যদের উপস্থিতি।

অনেকের হাতে ছিল শিক্ষা সংস্কারের দাবি লেখা পোস্টার। কেউ কেউ স্লোগান দিচ্ছিলেন পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার দাবিতে।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর বক্তব্য ছিল, বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় বসার পর যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস বা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাহলে শুধু একটি পরীক্ষা নয়, তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

জল ও ভেজা কাপড় দিয়ে কাঁদানে গ্যাসের সেল নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছেন দুই আন্দোলনকারী
জল ও ভেজা কাপড় দিয়ে কাঁদানে গ্যাসের সেল নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছেন দুই আন্দোলনকারী

সংসদ অধিবেশনের দিনকেই কেন বেছে নেওয়া হলো

সোমবার ভারতের সংসদে শুরু হয় বর্ষাকালীন অধিবেশন। আন্দোলনকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবেই এই দিনটিকে বেছে নেন বলে মনে করা হচ্ছে।

তাদের লক্ষ্য ছিল, সংসদের শুরুতেই সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং শিক্ষাসংক্রান্ত সমস্যাগুলোকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা।

কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক। তার সঙ্গে ছিলেন পরিবেশ ও শিক্ষা আন্দোলনের পরিচিত মুখ সোনাম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো।

সোনাম ওয়াংচুক নিজেও শিক্ষাব্যবস্থা ও নীতিগত সংস্কারের দাবিতে অনশন কর্মসূচিতে যুক্ত ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতির পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

নিরাপত্তার বলয়ে দিল্লির কেন্দ্রস্থল

আন্দোলনের আগেই দিল্লি পুলিশ বড় ধরনের প্রস্তুতি নেয়। যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবনের দিকে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে বসানো হয় একাধিক স্তরের ব্যারিকেড।

মোতায়েন করা হয় সিআরপিএফ, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সসহ বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী।

পুলিশের কাছে ছিল জলকামান, কাঁদানে গ্যাসের সরঞ্জাম ও বিশেষ যানবাহন।

প্রশাসনের বক্তব্য ছিল, সংসদ এলাকার নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান দায়িত্ব।

পুলিশ আগে জানিয়েছিল, কর্মসূচির জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমতি নেওয়া হয়নি। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাঁদানে গ্যাসের মাঝেও পুলিশের মুখোমুখি এক আন্দোলনকারী
কাঁদানে গ্যাসের মাঝেও পুলিশের মুখোমুখি এক আন্দোলনকারী

মিছিল এগোতেই শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি

সকালে যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবনের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করেন আন্দোলনকারীরা।

প্রথম দিকে মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও সামনে থাকা ব্যারিকেড অতিক্রমের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়।

পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে জনতাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

রেল ভবনের কাছাকাছি এলাকায় সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা দেখা যায়। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের মুখোমুখি অবস্থান চলে।

শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

সংঘর্ষের মাঝেই সরকারের সঙ্গে আলোচনা

রাজপথে যখন উত্তেজনা চলছিল, তখন অন্যদিকে সরকারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগও চলতে থাকে।

ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে দেখা করেন।

তারা সরকারের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন। এতে তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরা হয়।

এর মধ্যে ছিল: কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ; সোনাম ওয়াংচুককে দ্রুত মুক্ত করে আন্দোলনের স্থানে ফিরিয়ে আনা; নিট পরীক্ষার অনিয়মে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া।

আলোচনার পর সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আন্দোলনস্থলে পুলিশের উপস্থিতি কমানোর বিষয়ে আশ্বাস পাওয়া গেছে।

তবে দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানানো হয়।

সোনাম ওয়াংচুক ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা

আন্দোলনের আরেকটি বড় বিষয় হয়ে ওঠে সোনাম ওয়াংচুকের অনশন।

লাদাখে শিক্ষা ও পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা ওয়াংচুক ভারতের নাগরিক সমাজে পরিচিত মুখ। শিক্ষা সংস্কার ও পরিবেশ রক্ষায় তার ভূমিকার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন।

আন্দোলনকারীদের দাবি, তার অনশনকে গুরুত্ব না দিয়ে পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।

তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো অভিযোগ করেন, সরকার আন্দোলনের প্রকৃত কারণ থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করছে।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানায়, চিকিৎসার প্রয়োজনেই তাকে ভর্তি করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার নিয়ে বিভ্রান্তি

দুপুরের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে আন্দোলনের নেতা অভিজিৎ দীপককে পুলিশ আটক করেছে।

পরে সংগঠনের পক্ষ থেকেই বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়। জানানো হয়, তাকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।

দিল্লি পুলিশও একই তথ্য জানিয়ে মানুষকে গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানায়।

দিল্লির অন্য এলাকাতেও প্রভাব

শুধু সংসদ এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি আন্দোলনের প্রভাব।

বিকালের দিকে কনট প্লেস, রাজীব চক ও মধ্য দিল্লির কয়েকটি এলাকায় ছাত্র-যুবকদের ছোট ছোট জমায়েত দেখা যায়।

এর ফলে কিছু এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়।

রাজনৈতিক বিতর্কও তুঙ্গে

আন্দোলনকে ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য।

বিজেপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই ইস্যুকে ব্যবহার করে সরকারবিরোধী পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।

তাদের দাবি, নিট পরীক্ষা নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো নিয়ে সরকার ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে।

অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতার দাবিতেই তাদের আন্দোলন।

সামনে কী

দিন শেষে দিল্লির পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হলেও আন্দোলনের কেন্দ্র যন্তর মন্তরে কর্মসূচি অব্যাহত থাকে।

ককরোচ জনতা পার্টি জানিয়েছে, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

অন্যদিকে সরকার কীভাবে এই চাপ সামাল দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

/এমআর/