শিরোনাম

গণপূর্তের ১০০ কোটি টাকার আসবাবপত্র ক্রয়ে ভয়াবহ অনিয়ম

গণপূর্তের ১০০ কোটি টাকার আসবাবপত্র ক্রয়ে ভয়াবহ অনিয়ম
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজেদুল ইসলাম। গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

আসবাবপত্র কেনার দরপত্র হওয়ার বিধিগত বাধ্যবাধকতা হলো গুডস বা পণ্য সরবরাহ ক্যাটাগরিতে। অথচ সেটি আহ্বান করা হয়েছে ওয়ার্কস বা নির্মাণকাজ ক্যাটাগরিতে। এরপর একের পর এক বড় অঙ্কের কার্যাদেশ গেছে নিজের পছন্দমাফিক নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে। পদে পদে ক্রয় বিধিমালা লঙ্ঘন করে কোথাও অভিজ্ঞতার শর্ত উপেক্ষা করা হয়েছে, কোথাও প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই বদলে ফেলা হয়েছে প্রকল্পের প্যাকেজ। আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গঠন করা হয়নি সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিও।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমের হাতে আসা নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজেদুল ইসলাম এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। যশোর, কক্সবাজার, পাবনা ও নোয়াখালীর ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পের ২২টি কার্যাদেশে প্রায় ৭৭ কোটি টাকার কেনাকাটায় এমন ধারাবাহিক অনিয়ম করা হয়েছে। এ ছাড়াও পটুয়াখালী ও সুনামগঞ্জ মেডিকেল, নরসিংদী জেলখানা এবং ঢাকার অফিসার্স ক্লাবের আসবাবপত্র সরবরাহে কাজের আগে প্রায় ৩০ কোটি টাকা বিল পরিশোধের মতো অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

সরকারি সংস্থায় দীর্ঘদিন ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে প্রকৌশলী এস এম ফজলুল কবিবের। তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসে (পিপিআর) ওয়ার্কস এবং গুডস-এর সংজ্ঞা আলাদা। ওয়ার্কস-এ মূলত নির্মাণসংক্রান্ত বিষয় জড়িত। আর গুডস-এ সরবরাহ করার মতো পণ্য থাকে। গুডসের কাজে ওয়ার্কের সক্ষমতা আছে, এমন বিবোচনায় ঠিকাদার নিয়োগের সুযোগ নেই। যে ধরনের পণ্য নেওয়া হবে, সে ধরনের অর্থাৎ সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতা লাগবে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চারটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিস, একাডেমিক, অডিটোরিয়াম, চিকিৎসক, শিক্ষকদের আসবাবপত্র তৈরির প্রায় সব দরপত্রেই একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী এসব কাজ মালামাল (গুডস) ক্যাটাগরির হলেও দরপত্র আহ্বান করা হয় নির্মাণকাজ (ওয়ার্কস) হিসেবে। অথচ সরকারি ক্রয়বিধি ভেঙে আসবাবপত্র তৈরি ও সরবরাহের কাণ্ডে গচ্চা গেছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

সবচেয়ে বড় কার্যাদেশগুলোর একটি ছিল কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিস ও চিকিৎসকদের আসবাবপত্র তৈরির কাজ। প্রায় ৭ কোটি ৯ লাখ ২৯ হাজার টাকার এ কাজ পায় লামিয়া এন্টারপ্রাইজ। একই ধরনের আরেকটি ৭ কোটি ৯ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয় পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিস ও চিকিৎসকদের আসবাবপত্র তৈরির কাজে, যা পায় হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড। যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিস ও শিক্ষকদের আসবাবপত্রের ৫ কোটি ৮৪ লাখ ৯ হাজার টাকার কাজ দেওয়া হয় এসএস এন্টারপ্রাইজকে। যশোর, পাবনা ও নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটোরিয়াম ও বিবিধ আসবাবপত্রের প্রতিটি ৫ কোটি ৩৯ লাখ ৭১ হাজার টাকার কার্যাদেশ পায় যথাক্রমে এম/এস সুমন, আখতার ফার্নিশার্স লিমিটেড এবং এস. ইসলাম কনস্ট্রাকশন।

নথিতে দেখা যায়, ২২টি কার্যাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এস. ইসলাম কনস্ট্রাকশন পেয়েছে তিনটি কাজ। লামিয়া এন্টারপ্রাইজ, এসএস এন্টারপ্রাইজ, হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড, ডালাস ইন্টারন্যাশনাল এবং রুবেল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল যথাক্রমে দুটি করে কার্যাদেশ পেয়েছে। বাকি কাজগুলো ভাগাভাগি হয়েছে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এক বা দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফ্যাক্টরি, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা বড় পরিসরে আসবাবপত্র সরবরাহের অভিজ্ঞতা নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি আসবাবপত্র সরবরাহ-পরবর্তী সার্ভিস দেওয়ার সক্ষমতাও তাদের নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া গণপূর্ত কাঠের কারখানা বিভাগে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রকৌশলী মো. সাজেদুল ইসলাম দায়িত্ব পালনকালে পটুয়াখালী মেডিকেল, সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ এবং ঢাকার অফিসার্স ক্লাবের আসবাবপত্র কেনাকাটার ক্ষেত্রেও হয়েছে অনিয়ম। তবে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে নরসিংদীতে নতুন নির্মিত জেলখানার ক্ষেত্রে। সেখানে নির্মাণকাজ চলমান থাকা অবস্থায় প্রায় ৮ কোটি টাকার আসবাবপত্র কিনে মালামাল বুঝে না পেয়ে সব অর্থ ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়েছে। আবার সব নথিপত্রও ঠিকঠাক মতো সংরক্ষণ করা হয়নি বলে জানা যায়।

অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি বড় কার্যাদেশে দরপত্রে নির্ধারিত নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করলেও তাদের ঠিকাদার হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। আবার কক্সবাজার, যশোর, পাবনা ও নোয়াখালীর সরকারি উন্নয়ন তহবিলের কয়েকটি প্যাকেজে জিডিএফ-২৫, জিডিএফ-২৬, জিডিএফ-২৮ ও জিডিএফ-২৯ প্রশাসনিক অনুমোদন বা ডিপিপি সংশোধন ছাড়াই পরিবর্তন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০১৬ ও ২০১৯ সালের সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে অধিকাংশ দরপত্রে বিধি অনুযায়ী মূল্যায়ন কমিটি গঠন না করার অভিযোগও রয়েছে। প্রায় সব দরপত্রেই একই ধরনের কমিটি দায়িত্ব পালন করেছে। কমিটির সভাপতি ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজেদুল ইসলাম, সদস্যসচিব সহকারী প্রকৌশলী, পর্যালোচনায় ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম (বর্তমানে অবসরে আছেন) এবং অনুমোদন দেন গণপূর্ত ই/এম পিএন্ডডি জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর খাঁন।

সরকারি ক্রয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গুডস ক্যাটাগরির কাজকে ওয়ার্কস হিসেবে প্রকাশ করলে প্রতিযোগিতার ধরন বদলে যায়। এতে আসবাবপত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তে সীমিতসংখ্যক নির্মাণ ঠিকাদার অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। একই সঙ্গে যোগ্যতার শর্ত পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া, ব্যয়ের প্রাক্কলন বাড়ানো এবং দরপত্র প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। যারা কেনাকাটা করেছে, তাদের জিজ্ঞাসা করুন।’

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর খাঁন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজেদুল ইসলামকে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে অভিযোগের বিষয়ে লিখে পাঠানো হলেও প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব দেননি।

প্রকৌশলী এসএম ফজলুল কবির মনে করেন, এ ধরনের দরপত্র মূলত টেকনিক্যাল রেসপনসিভনেস পর্যায়ে বাতিল হওয়ার কথা। ক্রয়কারী সত্ত্বা বা প্রকিউরিং এনটিটি কাজটি অসৎ উদ্দেশ্যে করেছে। আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিজের পছন্দমাফিক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টরা পদে পদে ক্রয় সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘন করেছেন।

/এসএ/