শিরোনাম

ইরানের খার্গ দ্বীপ দখলে নিতে যে পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের

সিটিজেন ডেস্ক
ইরানের খার্গ দ্বীপ দখলে নিতে যে পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবহরে মেরিন সেনা। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত এ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঝুঁকিও রয়েছে।

ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই খার্গ দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। দ্বীপটির আয়তন মাত্র ২০ বর্গ কিলোমিটারের (৭.৭ বর্গমাইল)। উপকূল থেকে কিছুটা দূরে এমন এক গভীর জলসীমায় এটি অবস্থিত, যেখানে ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) নামক বিশাল তেলের ট্যাঙ্কারগুলো সহজেই ভিড়তে পারে। এসব ট্যাঙ্কারে প্রতিটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা যায়।

১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাকি বিমান বাহিনী এই দ্বীপে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়েছিল।

গত ১৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রও এই খার্গ দ্বীপে প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। তবে দ্বীপের তেলের অবকাঠামোগুলোকে তারা লক্ষ্যবস্তু করেনি।

যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত খারগ দ্বীপে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় তবে সেটি সম্ভবত একটি সাময়িক পদক্ষেপ হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হবে, ইরানের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করে দিয়ে দেশটিকে চাপে ফেলা যাতে তারা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে এবং ওয়াশিংটনের দাবিগুলো মেনে নেয়।

তবে ইরানি সরকারের কঠোর মনোভাব এবং নতি স্বীকার না করার ইতিহাস বিবেচনায় নিলে, এই পরিকল্পনা আদৌ সফল হবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, কোনো মার্কিন বাহিনী সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করলে তার দেশের সেনারা তাদের ওপর ‘আগুনের বৃষ্টি’ চালাবে।

খার্গ দ্বীপে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরো জোরদার করেছে ইরান। এর মধ্যে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইল ব্যাটারিও রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক সেনা পাঠাচ্ছে। প্রায় ৫ হাজার মার্কিন নৌ-সেনা এবং ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় ২ হাজার প্যারাস্যুটধারী সৈন্য রয়েছে এই সেনাবহরে।

এই ঘটনা ব্যাপক জল্পনার জন্ম দিয়েছে যে, খার্গ দ্বীপ দখল এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই দুই বাহিনীর একটি অথবা দুইটিকেই ব্যবহার করা হতে পারে। প্যারাট্রুপাররা সম্ভবত রাতে আকাশপথে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে এই ছোট দ্বীপটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে।

তবে এর আগে মার্কিন জাহাজগুলোকে ইরান নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এরপরে পারস্য উপসাগরের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় ইরানের অসংখ্য লুকানো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের নজরদারি এড়িয়েই যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলোকে এগিয়ে যেতে হবে।

মার্কিন সেনারা জল বা আকাশপথ– যে পথেই অবতরণ করুক না কেন তাদের অ্যান্টি-পারসোনেল মাইন (সৈন্য বিধ্বংসী মাইন) এবং ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোনের মুখে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

মার্কিন মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটগুলোর (এমইইউ) যুদ্ধের সক্ষমতা এতোটাই শক্তিশালী যে তারা প্রায় নিশ্চিতভাবেই জয়ী হবে, তবে এর বিনিময়ে তাদের বিশাল সংখ্যক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।

এরপরে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে দখল করা এই খার্গ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ অনির্দিষ্টকাল ধরে তাদের ইরানি মূল ভূখণ্ড থেকে ধেয়ে আসা তীব্র গোলাবর্ষণ মোকাবিলা করতে হবে।

এ ছাড়া ইরানের ভূখণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি যে কোনো মার্কিন দখলদারি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও জনসমর্থন পাবে না। এমনকী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনেক সমর্থকও তা পছন্দ করছেন না কারণ তাদের একাংশ এই প্রতিশ্রুতিতে ট্রাম্পকে নির্বাচিতই করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আর কখনো এ ধরনের যুদ্ধে জড়াবে না।

পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ। ছবি: সংগৃহীত
পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ। ছবি: সংগৃহীত

পারস্য উপসাগরে আরো কিছু দ্বীপ রয়েছে যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এর মধ্যে একটি হলো লারাক দ্বীপ। এটি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আব্বাসের ঠিক উল্টোদিকে এবং হরমুজ প্রণালির প্রবেশপথেই অবস্থিত।

ইরান বর্তমানে এই দ্বীপের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সব তেলের ট্যাঙ্কার তল্লাশি করছে। খবর পাওয়া গেছে যে, পার হওয়ার জন্য জাহাজপ্রতি ২০ লাখ ডলার করে দিতে বাধ্য করছে তারা।

এছাড়াও রয়েছে কেশম দ্বীপ যেটি পারস্য উপসাগরের বৃহত্তম দ্বীপ এবং খার্গ দ্বীপের থেকে প্রায় ৭৫ গুণ বড়। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানে এখানে মাটির নিচে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনে ঘাঁটি তৈরি করে রেখেছে।

এছাড়া আরও তিনটি দ্বীপ রয়েছে– আবু মুসা, দ্যা গ্রেটার এন্ড লেসার টাবস। এই দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকলেও বর্তমানে সবগুলোই ইরানের দখলে রয়েছে।

অন্যান্য দ্বীপের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের এই দ্বীপগুলোর ইরানের জন্য একটি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এগুলো ব্যবহার করে ইরান জাহাজ চলাচলে যেমন বাধা দিতে পারে তেমনি ভৌগোলিক অবস্থানের এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠতর সামরিক শক্তির মোকাবিলা করাও তাদের জন্য সহজ হবে।

তবে, এমনও হতে পারে যে, ওপরের কোনো পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হলো না।

এই অঞ্চলে আরো সৈন্য পাঠানো এবং স্থল অভিযানের হুঁশিয়ারি দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প সোমবার (৩০ মার্চ) আবারও জানিয়েছেন,যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলছে। এই আলোচনার সফল পরিণতিই সামরিক অভিযান বন্ধ করতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

/এফসি/