শিরোনাম

এক্সপ্লেইনার

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের এক বছর: জয়ের আড়ালে বাস্তবতা

সিটিজেন ডেস্ক
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের এক বছর: জয়ের আড়ালে বাস্তবতা
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি। ছবি: সংগৃহীত

২০২৫ সালের ৭ মে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া চার দিনের সেই যুদ্ধের এক বছর পরও দুই দেশই নিজেদের কৌশলগত বিজয়ের দাবি করছে। তবে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি এই সংঘাত উন্মোচন করেছে উভয় দেশের নানা দুর্বলতা, যা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি।

মে মাসের শুরু থেকেই পাকিস্তানের বড় শহরগুলো পোস্টার, বিলবোর্ড ও ব্যানারে ভরে উঠেছে। সেখানে প্রশংসা করা হচ্ছে সেই সামরিক নেতৃত্বের, যারা সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী গত বছরের ভারত–পাকিস্তান আকাশযুদ্ধে দেশকে ‘বিজয়ের’ পথে নিয়ে গিয়েছিল।

রাওয়ালপিন্ডির নূর খান অডিটোরিয়ামে পাকিস্তান বিমান বাহিনী ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবিকে ঘিরে আয়োজন করে বিশেষ অনুষ্ঠান। লাহোরের লিবার্টি চকেও সরকার আয়োজিত কনসার্টে উদযাপন করা হয় কথিত ‘সত্যের যুদ্ধ দিবস’।

অন্যদিকে ভারতও পিছিয়ে নেই। নয়াদিল্লি এই সামরিক সংঘাতকে নিজেদের সাফল্য হিসাবেই তুলে ধরছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গত ৭ মে তার এক্স অ্যাকাউন্টের প্রোফাইল ছবিতে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর লোগো ব্যবহার করেন এবং দেশবাসীকেও একই আহ্বান জানান। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের সামরিক অভিযানের ভারতীয় নাম ছিল ‘অপারেশন সিঁদুর’।

মোদী লিখেছিলেন, ‘এক বছর আগে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী অসাধারণ সাহস, নির্ভুলতা ও দৃঢ়তা দেখিয়েছিল। সন্ত্রাসবাদ ও এর পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান এখনও আগের মতোই কঠোর।’

দুই দেশই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা জাহির করতে সংবাদ সম্মেলন ও প্রচারণায় জোর দেয়। ভারতীয় বিমান বাহিনীর এয়ার মার্শাল অবধেশ কুমার ভারতী দাবি করেন, ভারত ১৩টি পাকিস্তানি বিমান ধ্বংস করেছে এবং ১১টি বিমানঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)-এর মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেন, পাকিস্তান নিজেদের তুলনায় ‘পাঁচ গুণ বড়’ শত্রুকে পরাজিত করেছে এবং তাদের সামরিক শক্তির মাত্র ‘১০ শতাংশ’ ব্যবহার করেছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্য এই বিজয়োৎসবের আড়ালে মূল প্রশ্নটি রয়ে গেছে—দুই দেশই কি আদৌ এই সংঘাত থেকে কোনো বাস্তব শিক্ষা নিয়েছে?

যুদ্ধের শুরু পাহালগাম হামলা দিয়ে

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারত শাসিত কাশ্মীরের পাহালগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। ভারত এ হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করলেও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করে।

এর পর ৭ মে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে এবং পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায় ভারতীয় বাহিনী। ভারতের দাবি ছিল, তারা ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে পাকিস্তান বলেছে, এসব হামলায় বেসামরিক মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

জবাবে পাকিস্তান শুরু করে ‘অপারেশন বুনিয়ান আল-মারসুস’।

চার দিনের সংঘাতের পর উভয় দেশই নিজেদের জয়ী দাবি করলেও বাস্তবে কোনো পক্ষই সুস্পষ্ট বিজয় অর্জন করতে পারেনি।

পাকিস্তানের মুরিদকেতে একটি মসজিদে ভারত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ছবি: এপি
পাকিস্তানের মুরিদকেতে একটি মসজিদে ভারত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ছবি: এপি

পাকিস্তানের দাবি বনাম ভারতের অর্জন

সংঘাতের প্রথম দিকের আকাশযুদ্ধ পাকিস্তানের জন্য বড় প্রচারণার বিষয় হয়ে ওঠে। ইসলামাবাদের দাবি, তাদের চীন নির্মিত জে-১০সি যুদ্ধবিমান রাফালসহ একাধিক ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করেছিল।

পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরে শাংরি-লা সংলাপে ভারতের প্রতিরক্ষা প্রধান জেনারেল অনিল চৌহান যুদ্ধের প্রথম দিন বিমান হারানোর বিষয়টি স্বীকার করেন। এয়ার মার্শাল ভারতীও বলেন, ‘যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি থাকবেই।’

পাকিস্তান কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও কিছু সুবিধা পেয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। দেশটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি মধ্যস্থতার দাবিকে সমর্থন করে এবং তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়। পরবর্তীতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনে ইসলামাবাদ গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসাবেও আবির্ভূত হয়।

অন্যদিকে ভারত সামরিক সাফল্য হিসাবে তুলে ধরছে তাদের ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে। এসব হামলায় রাওয়ালপিন্ডির নূর খান ও সিন্ধুর ভোলারিসহ পাকিস্তানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতীয় ড্রোনও করাচি ও লাহোর পর্যন্ত প্রবেশ করেছিল।

একইসঙ্গে ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সামরিক সংঘাতের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে পাকিস্তানি সামরিক স্থাপনাগুলোর ক্ষতির প্রমাণ মিললেও ভারতীয় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রকাশ্যে খুব কম এসেছে। ফলে উভয় দেশের প্রচারিত বয়ানের মাঝখানে বাস্তবতা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

ইসলামাবাদে পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে এক সামরিক কুচকাওয়াজে পাকিস্তান-নির্মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও লঞ্চার প্রদর্শন করা হয়। ছবি: এপি
ইসলামাবাদে পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে এক সামরিক কুচকাওয়াজে পাকিস্তান-নির্মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও লঞ্চার প্রদর্শন করা হয়। ছবি: এপি

পাকিস্তানের নতুন সামরিক পরিকল্পনা

যুদ্ধের পর পাকিস্তান নিজেদের সামরিক কাঠামোতে কিছু বড় পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে। রাওয়ালপিন্ডিতে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির সেনাবাহিনী নতুন আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড (এআরএফসি) চালুর ঘোষণা দেয়।

এই ইউনিটকে উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন ও দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল হামলার সক্ষমতাসম্পন্ন বাহিনী হিসাবে তুলে ধরা হয়। সেখানে ফাতাহ-৩ সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল, ৭৫০ কিলোমিটার পাল্লার ফাতাহ-৪ এবং ১ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ফাতাহ-৫ রকেট সিস্টেমও প্রদর্শন করা হয়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিন বলেন, এই রকেট ফোর্স শুধু ব্রহ্মোসের মোকাবিলার জন্য নয়, বরং প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে পারমাণবিক কাঠামো থেকে আলাদা রাখার কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখনও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ২০২৫ সালের সংঘাতে চীনের সরবরাহকৃত এইচকিউ-৯বি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্রহ্মোস ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিল।

এ কারণে ইসলামাবাদ এখন আরও উন্নত এইচকিউ-১৯ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহের চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষক মুহাম্মদ ফয়সাল বলেন, সংঘাতের প্রথম পর্যায়ে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সমন্বয় ও কৌশল প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্রহ্মোস হামলায় বিমানঘাঁটিগুলোর দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে পড়ে।

তার মতে, শুধু নতুন অস্ত্র কিনলেই হবে না; শক্তিশালী বাঙ্কার, দ্রুত রানওয়ে মেরামত এবং বিকল্প প্রতিরক্ষা অবকাঠামোও গড়ে তুলতে হবে।

‘ভৌগোলিক নিরাপত্তা’ আর আগের মতো কার্যকর নয়

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত একটি বড় বাস্তবতাও সামনে এনেছে, শুধু ভৌগোলিক গভীরতা আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।

দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সাইবার প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট নির্দেশিত হামলার যুগে পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের ঘাঁটিগুলোতেও আঘাত পৌঁছে গেছে।

ফয়সালের ভাষায়, ‘লাহোর, করাচি ও রাওয়ালপিন্ডিতে গভীর হামলা দেখিয়েছে যে ভৌগোলিক নিরাপত্তার ধারণা এখন অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।’

ভারত-শাসিত কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের একটি রাস্তায় একজন ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর সৈন্য। ছবি: এপি
ভারত-শাসিত কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের একটি রাস্তায় একজন ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর সৈন্য। ছবি: এপি

ভারতের নীরবতা ও কৌশলগত হিসাব

যুদ্ধের পর থেকে ভারত মূলত আত্মপক্ষ সমর্থনের অবস্থানে রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক প্রবীণ দোনথি এই সংঘাতকে ‘অস্পষ্ট যুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করেছেন।

তার মতে, যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি অনলাইনেও ভুল তথ্যের আরেকটি যুদ্ধ চলছিল, যা উভয় পক্ষকেই বিজয় দাবি করার সুযোগ করে দেয়।

ভারতীয় সেনাপ্রধান অনিল চৌহান বিমান হারানোর কথা স্বীকার করলেও কতগুলো বিমান ধ্বংস হয়েছে, তা স্পষ্ট করেননি।

অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় নৌ কর্মকর্তা সি উদয় ভাস্কর বলেন, ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের তথ্য সংসদে উপস্থাপন করা উচিত ছিল।

পানি ইস্যুতে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে পানি নিয়ে।

ভারত ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করে এবং এখনো তা পুনর্বহাল করেনি। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, এই চুক্তি পাকিস্তানের কৃষি ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির ৮০ শতাংশের বেশি কৃষি পানি এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

পাকিস্তানের পানি সংরক্ষণ সক্ষমতা মাত্র ৩০ দিনের, যেখানে ভারতের সক্ষমতা ১২০ থেকে ২২০ দিনের মধ্যে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিক সংকটের চেয়ে পাকিস্তানের জন্য বড় সমস্যা তাদের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—অকার্যকর খাল ব্যবস্থা, পুরোনো কৃষি পদ্ধতি ও অনুপযুক্ত শস্যচক্র।

জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে হিমবাহ গলনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার পানি সংকট ভবিষ্যতে আরও তীব্র হতে পারে।

সংঘাতের ঝুঁকি এখনো কাটেনি

যুদ্ধের এক বছর পরও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অবিশ্বাস কমেনি। বরং উভয় দেশই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পথে হাঁটছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক যোগাযোগের ঘাটতি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে ভবিষ্যতে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

প্রবীণ দোনথির ভাষায়, ‘বিশ্বাসের সংকট ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে পরিস্থিতি আবারও দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।’

অন্যদিকে সি উদয় ভাস্কর সতর্ক করে বলেন, ‘উভয় দেশেরই বিকল্প কূটনৈতিক যোগাযোগ ও গোপন সংলাপ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা উচিত। কারণ পরবর্তী সংকট শুরু হলে তা খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।’

/এমআর/