শিরোনাম

ইউক্রেনের নতুন রণকৌশলে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রাশিয়া

সিটিজেন ডেস্ক
ইউক্রেনের নতুন রণকৌশলে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রাশিয়া
যুদ্ধে বিস্ফোরক বোঝাই রোবট ব্যবহার করছে ইউক্রেন।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের চিত্র এখন আর আগের মতো নেই। সম্মুখ সমরে মানুষের জায়গা ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি ও রোবট। যুদ্ধক্ষেত্রের শত মাইল দূরে নিরাপদ কমান্ড সেন্টারে বসে স্ক্রিন আর লাইভস্ট্রিমের দিকে চোখ রেখে এখন ড্রোনের মাধ্যমে ভয়ংকর সব আক্রমণ পরিচালনা করছেন ইউক্রেনীয় কমান্ডাররা, যা আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ বদলে যাওয়া রণকৌশলের চাঞ্চল্যকর চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনীয় বাহিনীর অনেক অভিযানে এখন আর কোনো সেনার সরাসরি পদচারণা থাকে না। এর বদলে বিস্ফোরক বোঝাই রোবট আর আকাশে থাকা গোয়েন্দা ড্রোনের নিখুঁত সমন্বয়ে দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির মাধ্যমে রুশ ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানো হচ্ছে। মূলত দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে চরম জনবল সংকট এবং পশ্চিমা মিত্রদের সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তার বাধ্যবাধকতাই ইউক্রেনকে চালকবিহীন অস্ত্র ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করেছে। বৃহত্তর রুশ বাহিনীর মোকাবিলায় ড্রোন ও রোবট এখন কিয়েভের প্রধান প্রযুক্তিগত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

স্বয়ংক্রিয় এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা এতটাই প্রবল যে, গত এপ্রিলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, তার বাহিনী শুধুমাত্র ড্রোন ও রোবট ব্যবহার করেই প্রথমবারের মতো একটি রুশ ঘাঁটি দখল করতে সক্ষম হয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ২২ হাজারেরও বেশি এমন চালকবিহীন সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। আধুনিক মারণাস্ত্রগুলো রুশ বাহিনীর মনেও গভীর ত্রাসের সঞ্চার করেছে। বন্দি হওয়া একাধিক রুশ সেনার মতে, বিস্ফোরক বহনকারী ইউক্রেনীয় রোবটগুলো এতটাই নিঃশব্দে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে আসে যে, বিস্ফোরণস্থলের মাত্র ১০ মিটার দূরে আসার আগে এর উপস্থিতি টেরই পাওয়া যায় না। রুশ সেনারা এ যন্ত্রগুলোর নাম দিয়েছে ‘নীরব মৃত্যু’।

দোনবাসের মতো অঞ্চলে একসময় যারা ঘরে ঘরে ঢুকে যুদ্ধ করেছেন, সেইসব ইউক্রেনীয় কমান্ডারদের কাছে এ পরিবর্তন রীতিমতো নাটকীয়। ‘বার’ নামের এক ডেপুটি কমান্ডারের আক্ষেপ, এমন প্রযুক্তি আগে থাকলে হয়তো অনেক সহযোদ্ধার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো। তার মতে, আগে যুদ্ধে সেনার দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও সাহসের মতো বিষয়গুলোই মুখ্য ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তিই যুদ্ধের সবকিছু নির্ধারণ করে দিচ্ছে, যেখান থেকে আর পেছনের দিকে ফেরার কোনো উপায় নেই।

চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত ও ব্যাপক প্রাণহানির পর ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্ব এখন এ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। ড্রোন উৎপাদন ও এর কার্যকারিতা উন্নত করা কিয়েভের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে ইউক্রেনের সামরিক লক্ষ্য হলো প্রতি মাসে অন্তত ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হতাহত করা, যা তারা এ বছর পূরণ করেছে বলে দাবি করছে। এর মাধ্যমে তারা ক্রেমলিনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে, যাতে রাশিয়া শহুরে ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকেও সেনা নিয়োগে বাধ্য হয়। এদিকে, ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ-এর এক নতুন হিসাবে দেখা গেছে, চলমান এ সংঘাতে রাশিয়ায় মোট সামরিক সদস্যের প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ৫ লাখে দাঁড়িয়েছে।

এ প্রযুক্তি একসময় রণক্ষেত্রে কেবল নতুন এক ধারণা ছিল, আজ ইউক্রেনীয় সামরিক অভিযানের এক স্বাভাবিক অংশে পরিণত হয়েছে। আক্রমণ চালানো থেকে শুরু করে আহতদের উদ্ধার বা সম্মুখ সমরে রসদ পৌঁছানো সব ক্ষেত্রেই এখন ব্যবহৃত হচ্ছে রোবট। আর এর মধ্য দিয়েই কয়েক দশকের মধ্যে ইউরোপের সবচেয়ে বড় এ সংঘাত প্রমাণ করছে, আধুনিক রণক্ষেত্রের যুদ্ধকৌশল কত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।

সূত্র: সিএনএন

/এমএকে/