শিরোনাম

ধোঁয়া ছড়ানোয় কানাডার ওপর নতুন শুল্কের হুমকি ট্রাম্পের

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ধোঁয়া ছড়ানোয় কানাডার ওপর নতুন শুল্কের হুমকি ট্রাম্পের
ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন নিউইয়র্ক সিটির দৃশ্য

কানাডার ভয়াবহ দাবানলের ধোঁয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলের আকাশ ঢেকে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে। দাবানলের ধোঁয়াকে ‘দূষিত ও অস্বাস্থ্যকর’ উল্লেখ করে কানাডার বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতার অভিযোগের পর ট্রাম্প এই বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের দাবি, কানাডার বন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে কানাডার কর্মকর্তারা বলছেন, দাবানল কোনো এক দেশের সমস্যা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বৈশ্বিক সংকট।

ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘অপ্রয়োজনীয়ভাবে নোংরা, দূষিত ও অস্বাস্থ্যকর বাতাসের’ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, কানাডা তাদের বনাঞ্চল যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করছে না এবং এ বিষয়ে দেশটির ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’ রয়েছে।

তিনি জানান, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইবেন এবং প্রয়োজন হলে নতুন শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

শত শত দাবানলে বিপর্যস্ত কানাডা

কানাডিয়ান ওয়াইল্ডল্যান্ড ফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৮৮৮টি দাবানল সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে অনেক আগুন এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

বিশেষ করে অন্টারিও প্রদেশে ১৯০টির বেশি স্থানে আগুন জ্বলছে। এরই মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

দাবানলের ধোঁয়া সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা, মিশিগান, পেনসিলভানিয়া, ওহাইও ও নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের বিখ্যাত এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং ও স্ট্যাচু অব লিবার্টির মতো স্থাপনাগুলোও ধোঁয়ার কারণে স্পষ্ট দেখা যায়নি। ওয়াশিংটন ডিসির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বায়ুদূষণের কারণে অনেক অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। স্কুলের বাইরের কার্যক্রম, কনসার্ট ও বিভিন্ন জনসমাগম সীমিত করা হয়েছে। কোথাও কোথাও বাসিন্দাদের ঘরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে।

কানাডার দাবানল
কানাডায় চলমান দাবানলের একাংশ

“সমালোচনা নয়, সাহায্য পাঠান”

ট্রাম্পের অভিযোগের জবাবে অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড বলেন, সমালোচনা না করে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সহযোগিতার হাত বাড়ানো।

তিনি বলেন, অতীতে কানাডা ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল মোকাবিলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দুর্যোগে সহায়তা করেছে। তাই এখন অভিযোগের বদলে বাস্তব সহায়তা প্রয়োজন।

ফোর্ড জানান, বর্তমানে অন্টারিওতে ১৫০টির বেশি অগ্নিনির্বাপণ দল, ৮০টির বেশি ওয়াটার বোম্বার বিমান ও হেলিকপ্টার আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

তার দাবি, ২০১৮ সাল থেকে অন্টারিও সরকার দাবানল মোকাবিলায় ১০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।

কানাডার জরুরি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক মন্ত্রীও জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘদিনের সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৮২ সালের অগ্নিনির্বাপণ চুক্তিসহ বিভিন্ন সমঝোতার মাধ্যমে দুই দেশ নিয়মিত একে অপরকে সহায়তা করে আসছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, দায় শুধু কানাডার নয়

যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আইনপ্রণেতা দাবি করেছেন, কানাডার বন ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ সমস্যায় পড়ছে।

তারা বন পরিষ্কার রাখা, দাহ্য উপাদান কমানো, নিয়ন্ত্রিত আগুন ব্যবহার এবং অগ্নিসংযোগকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, দাবানলের বিষয়টি এত সরল নয়।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. প্যাট্রিক জেমস বলেন, আবহাওয়া কোনো সীমান্ত মানে না। এক দেশের আগুনের ধোঁয়া অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক ঘটনা।

তিনি বলেন, অতীতেও যুক্তরাষ্ট্রের বড় দাবানলের ধোঁয়া কানাডাকে প্রভাবিত করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডার বিশাল বনাঞ্চলের অনেক অংশ দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। ফলে আগুনের শুরুতেই তা শনাক্ত করা এবং নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাদের মতে, উন্নত বন ব্যবস্থাপনা কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু এত বিশাল বনভূমিতে দাবানল পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়।

ধোঁয়ায় ঢাকা ওয়াশিংটন ডি সি
ধোঁয়ায় ঢাকা ওয়াশিংটন ডি সি

জলবায়ু পরিবর্তন বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

বিজ্ঞানীদের মতে, এবারের দাবানলের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও কম বৃষ্টিপাত।

বিশেষ করে উত্তর অন্টারিওতে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরিবেশ তৈরি করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে এবং আগুন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. আনাবেলা বোনাদা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই শুধু কানাডাকে দায়ী করলে পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা যাবে না।

ক্ষতিগ্রস্ত জনপদ, ঘরছাড়া মানুষ

দাবানলের কারণে উত্তর অন্টারিওর বেশ কয়েকটি এলাকার মানুষকে ঘর ছাড়তে হয়েছে।

ফার্স্ট নেশনসের কয়েকটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও মানুষ ছোট নৌকায় করে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।

নামায়গুসিসাগাগুন ফার্স্ট নেশন সম্প্রদায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে বাসিন্দাদের খুব অল্প সময়ের মধ্যে সরে যেতে হয়েছে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো সম্প্রদায়ের বসতি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

অন্টারিওর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অন্তত ১০টি সম্প্রদায়ের মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব

বাণিজ্য ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েনের মধ্যেই এবার দাবানল যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্ককে চাপে ফেলেছে।

গত বছর ট্রাম্প কানাডার ওপর শুল্ক আরোপ করেছিলেন। কয়েক দশকের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্কের পরও এখনো দুই দেশ নতুন কোনো বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি।

তবে দাবানলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় না হয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

তাদের মতে, সীমান্ত দিয়ে ধোঁয়া যেমন থেমে থাকে না, তেমনি জলবায়ু সংকটও কোনো দেশের একার সমস্যা নয়। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শুধু অভিযোগ নয়।

/এমআর/