শিরোনাম

বেলুচিস্তান কেন স্বাধীনতা চায়

বেলুচিস্তান কেন স্বাধীনতা চায়
স্বাধীনতাকামী বালুচদের সমাবেশ

বালুচরা কেন পাকিস্তান থেকে আলাদা হতে চায় এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে উপনিবেশিক ইতিহাস, রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়া, পরিচয়ের রাজনীতি এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার মধ্যে। পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ ও সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চল বেলুচিস্তান কয়েক দশক ধরেই সেদেশের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। মাঝেমধ্যেই সেখানে সশস্ত্র হামলা, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের তৎপরতা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। সাম্প্রতিক সময়েও এমন কয়েকটি ঘটনা এই অঞ্চলটিকে আবারও আলোচনায় এনেছে।

ব্রিটিশরা বেলুচদের আলাদা চোখে দেখত

ব্রিটিশ শাসকেরা খুব দ্রুত বুঝে গিয়েছিল, ভারতীয় উপমহাদেশের সব জনগোষ্ঠীকে একই কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে পশতু ও বেলুচ জনগোষ্ঠী ছিল স্বাধীনচেতা, গোত্রভিত্তিক এবং যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। তারা বাইরের কর্তৃত্ব সহজে মেনে নিত না।

প্রথমদিকে ব্রিটিশরা সামরিক শক্তি দিয়ে অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আফগান যুদ্ধে বড় ধরনের ব্যর্থতার পর তারা উপলব্ধি করে, শুধু অস্ত্রের জোরে এই জনগোষ্ঠীকে বশে রাখা যাবে না। এরপর তারা কৌশল বদলায়।

স্থানীয় গোত্রপ্রধানদের সঙ্গে সমঝোতা, আর্থিক সুবিধা, রাজনৈতিক স্বীকৃতি এবং পরোক্ষ শাসনের পথ বেছে নেয় ব্রিটিশরা। তারা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যেখানে স্থানীয় নেতৃত্বকে সম্মান দেওয়া হবে, কিন্তু সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে ব্রিটিশদের হাতে।

একই সঙ্গে বেলুচদের যুদ্ধদক্ষতাকেও কাজে লাগানো হয়। তাদের নিয়ে গড়ে ওঠে বালুচ রেজিমেন্ট, যা পরে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।

বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) সদস্য
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) সদস্য

পরিচয়ের ভিত্তি ছিল গোত্র ও ভূমি

বেলুচ সমাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তাদের গোত্র। প্রতিটি গোত্রের নেতৃত্বে থাকতেন একজন সরদার। তার নেতৃত্বই ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের প্রধান ভিত্তি।

বেলুচদের কাছে ভূমি, গোত্র এবং সম্মান এই তিনটি বিষয় ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেওয়ার ঐতিহ্য শত শত বছর ধরে তাদের সমাজে গড়ে উঠেছিল। তাই বাইরের কোনো শাসনব্যবস্থা সহজে গ্রহণ করার মানসিকতা তাদের ছিল না।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই ব্রিটিশরা অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি শাসনের পরিবর্তে স্থানীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করেছিল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বদলে যায় পরিস্থিতি

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটার পর নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় বেলুচিস্তান।

তৎকালীন কালাত ছিল একটি দেশীয় রাজ্য, যার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে স্বাধীনতার সময় কিছুটা অনিশ্চয়তা ছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে একটি স্ট্যান্ডস্টিল চুক্তিও হয়েছিল। সেই চুক্তির ভাষা নিয়ে পরবর্তীকালে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। কারণ সেখানে কালাতের আলাদা রাজনৈতিক অবস্থানের উল্লেখ ছিল।

কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই কালাত পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। পাকিস্তান এটিকে আইনগত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বলে ব্যাখ্যা করে। অন্যদিকে অনেক বেলুচ জাতীয়তাবাদী মনে করেন, এই অন্তর্ভুক্তি জনগণের পূর্ণ সম্মতি ছাড়াই হয়েছিল।

এই মতবিরোধ থেকেই ১৯৪৮ সালে প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন বিদ্রোহ দেখা দেয় এবং সংঘাত ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেয়।

স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র বালুচেরা
স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র বালুচেরা

বেলুচরা সম্পদের মালিক, কিন্তু উন্নয়নে পিছিয়ে

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। আয়তনের দিক থেকে বিশাল এই অঞ্চলে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস, তামা, সোনা, কয়লা ও অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদ।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সম্পদ থেকে মূল লাভ যায় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। অথচ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, অবকাঠামো কিংবা কর্মসংস্থানের মতো খাতে বেলুচিস্তান প্রত্যাশিত বিনিয়োগ পায়নি।

অনেক বেলুচ মনে করেন, তাদের সম্পদ ব্যবহার করা হলেও উন্নয়নের সুফল তাদের জীবনে পৌঁছায়নি। এই অর্থনৈতিক বৈষম্যই ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষোভকে আরও গভীর করেছে।

ক্ষমতার প্রশ্নেও তৈরি হয়েছে অসন্তোষ

পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকে। এর ফলে স্থানীয় গোত্রপ্রধানদের ঐতিহ্যগত প্রভাব কমে যায়।

বিশেষ করে ‘ওয়ান ইউনিট’ নীতির সময় পশ্চিম পাকিস্তানকে একটি প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে আনা হলে বেলুচদের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তাদের অভিযোগ ছিল, স্থানীয় বাস্তবতা ও জনগণের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

পরবর্তী কয়েক দশকে সামরিক অভিযান, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

সহিংস হামলার পর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের যন্ত্রাংশ কুড়াচ্ছে মানুষ
সহিংস হামলার পর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের যন্ত্রাংশ কুড়াচ্ছে মানুষ

পাকিস্তানের অবস্থান কী

পাকিস্তান সরকার বরাবরই বলে আসছে, বেলুচিস্তানের সশস্ত্র আন্দোলনের পেছনে বিদেশি শক্তির মদদ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ভারত ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করা হয়েছে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো বিদেশি সহযোগিতা নিয়ে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর দাবি, তাদের আন্দোলনের মূল কারণ হলো দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট।

নতুন করে কেন আলোচনায়

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) বিভিন্ন হামলার দায় স্বীকার করেছে। বিশেষ করে জাফর এক্সপ্রেসে হামলার মতো ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আবারও বেলুচিস্তানের দিকে ফিরিয়ে এনেছে।

একদিকে পাকিস্তান এসব ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো বলছে, তাদের রাজনৈতিক দাবিকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতেই তারা এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে।

সমাধানের পথ কোথায়

বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানের সংকট কেবল নিরাপত্তা অভিযান দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ এই সংঘাতের শিকড় কয়েক দশকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

তাদের মতে, স্থানীয় জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং মানবাধিকার নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কঠিন।

বেলুচিস্তানের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, শক্তি প্রয়োগে সংঘাত সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ক্ষোভ পুরোপুরি দূর করা যায় না। সেই কারণেই সাত দশক পরও অঞ্চলটি পাকিস্তানের সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক সংকটগুলোর একটি হয়ে আছে। এই সংকটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাষ্ট্র ও বেলুচ জনগণের মধ্যে আস্থার সেই দীর্ঘ ব্যবধান আদৌ কমানো সম্ভব হয় কি না।

/এমআর/