শিরোনাম

শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে ইসরায়েল জড়িত, গোপন নথি প্রকাশ

সিটিজেন ডেস্ক
শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে ইসরায়েল জড়িত, গোপন নথি প্রকাশ
শ্রীলঙ্কার জাফনায় গৃহযুদ্ধ চলাকালীন বা তার পরে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের আত্মীয়রা। ১৫ নভেম্বর, ২০১৩। ছবি: এপি

১৯৭০ সালে আরব রাষ্ট্রগুলোর চাপে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলেও, শ্রীলঙ্কা গৃহযুদ্ধের সময় গোপনে দেশটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে– এমন তথ্য উঠে এসেছে নতুন প্রকাশিত নথিতে। সম্প্রতি ইসরায়েল স্টেট আর্কাইভ ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের কিছু নথি প্রকাশ করলে এ সম্পর্কের বিস্তারিত চিত্র সামনে আসে।

নথিতে দেখা যায়, ১৯৮৪ সালে কলম্বোয় মার্কিন দূতাবাসের অধীনে একটি ইসরায়েলি ‘ইন্টারেস্টস সেকশন’ স্থাপনের অনুমতি দেয় শ্রীলঙ্কা সরকার। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল তামিল বিদ্রোহ দমনে ইসরায়েলের সরাসরি সহায়তা পাওয়া।

১৯৮৮ সালের মধ্যে ইসরায়েল শ্রীলঙ্কার কাছে প্রায় ৩ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করে। এর মধ্যে ছিল ডভোরা-ক্লাস দ্রুতগামী টহল নৌকা, মিনি-উজি সাবমেশিন গান, মেশিনগান, গোলাবারুদ, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং ইলেকট্রনিক নিরাপত্তা বেড়া।

নথিতে আরও জানা যায়, ইসরায়েল শুধু অস্ত্র সরবরাহেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তারা শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনী, বিশেষ পুলিশ ইউনিট (এসটিএফ) এবং প্রেসিডেন্ট জুনিয়াস রিচার্ড জয়াবর্ধনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দলকে প্রশিক্ষণ দেয়। প্রেসিডেন্টের দেহরক্ষীদের জন্য বিশেষ শুটিং কোর্স পরিচালনা করা হয় এবং পরবর্তীতে একটি ভিআইপি নিরাপত্তা ইউনিট গঠনে সরাসরি সহায়তা দেওয়া হয়।

ইসরায়েলি প্রশিক্ষকদের অনেক সময় ‘কৃষি উপদেষ্টা’ পরিচয়ে কাজ করতে দেখা যায়, যাতে তাদের উপস্থিতি গোপন রাখা যায়। নথিতে উল্লেখ রয়েছে, জাফনা অঞ্চলে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিতেও তারা সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং স্থানীয় বাহিনীকে দ্রুত আক্রমণ পরিচালনায় সক্ষম করে তোলার প্রশিক্ষণ দেন।

কূটনৈতিক বার্তাগুলোতে আরও দেখা যায়, শ্রীলঙ্কা সরকার ইসরায়েলের সহায়তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করত। এক পর্যায়ে দেশটির একজন মন্ত্রী পর্যন্ত মন্তব্য করেন, প্রয়োজনে ‘শয়তানের কাছ থেকেও’ সহায়তা নিতে রাজি তারা। এমনকি প্রেসিডেন্ট জয়াবর্ধনে নির্বাচনী সহায়তার জন্যও ইসরায়েলের কাছে অর্থ চেয়েছিলেন বলে নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তবে এসব সহায়তার পেছনে বড় বিতর্কের বিষয় ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘন। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের নিজেদের বার্তাতেই উঠে এসেছে, এসটিএফ ও অন্যান্য বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম, হত্যা ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ ছিল। তামিল বেসামরিক জনগণের ওপর নির্বিচার হামলা, হাসপাতাল ও বাজারে বোমাবর্ষণ এবং ব্যাপক সহিংসতার খবর নিয়মিত পাওয়া যেত।

যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু আন্তর্জাতিক পক্ষ এ ধরনের সহায়তা নিয়ে সতর্ক করলেও, ইসরায়েল তা উপেক্ষা করে। তাদের মূল্যায়নেই বলা হয়েছিল, সামরিকভাবে এই সংঘাতের সমাধান সম্ভব নয়। তবুও কৌশলগত স্বার্থে এবং শ্রীলঙ্কার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যে তারা সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন উন্মুক্ত এই নথিপত্র শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে ইসরায়েলের গোপন ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মানবাধিকার ইস্যুতে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

সূত্র: দ্য ওয়্যার

/এসএ/