শিরোনাম

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

নিজের হাতে গড়া সামরিক নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারালেন শি জিনপিং

সিটিজেন ডেস্ক
নিজের হাতে গড়া সামরিক নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারালেন শি জিনপিং
ছবি: সংগৃহীত

চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মিতে (পিএলএ) প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চালানো দীর্ঘস্থায়ী শুদ্ধি অভিযানের এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় চিত্র ফুটে উঠেছে সাম্প্রতিক এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে। মাত্র এক বছর আগে যেখানে ৪০ জন জেনারেলের সরব উপস্থিতি ছিল, সেখানে এবার দেখা গেছে হাতেগোনা কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে। এ ঘটনা বেইজিংয়ের সামরিক নেতৃত্বের ভেতরে চলমান গভীর রাজনৈতিক সংকটেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ক্ষমতার ১৩ বছরে পা রাখা শি জিনপিং সম্ভবত এখন তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যেখানে এক দশক ধরে নিজ হাতে গড়ে তোলা সামরিক নেতৃত্বের ওপরই তিনি আস্থা হারিয়েছেন। অবিশ্বস্ততার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে শি জানিয়েছেন, সামরিক বাহিনীতে এমন কাউকেও রাখা হবে না যার হৃদয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি বিভক্ত।

তাইওয়ানের ন্যাশনাল চেংচি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক চিয়েন-ওয়েন কৌ মনে করেন, শি’র ব্যবহৃত বিভক্ত হৃদয় শব্দগুচ্ছটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এটি প্রাচীন চীনা রাজনৈতিক দর্শন থেকে নেওয়া, যেখানে বিশ্বাসঘাতক জেনারেলদের বিরুদ্ধে শাসকদের সতর্ক করা হয়েছিল। এ সংকট শি জিনপিংয়ের অন্যতম বড় অর্জন চীনা সামরিক বাহিনীকে একটি অত্যাধুনিক ও শক্তিশালী শক্তিতে রূপান্তর করার স্বপ্নকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে যখন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বর্ধিত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুঙ্গে, তখন এ অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বেইজিংয়ের জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যা একসময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযান মনে হয়েছিল, তা এখন ডজন ডজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে অপসারণের এক ব্যাপক রাজনৈতিক ঝড়ে পরিণত হয়েছে। এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে চীনের সর্বোচ্চ ইউনিফর্ম পরিহিত কমান্ডার জেনারেল ঝাং ইউশিয়ার পতনের মধ্য দিয়ে।

অভিযানের তীব্রতা বোঝা যায় সম্প্রতি ২ সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ঘটনার মাধ্যমে, যদিও সেই সাজা দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড্যানিয়েল ম্যাটিংলি প্রশ্ন তুলেছেন, শি কেন তার নিজের হাতে তৈরি ব্যবস্থাকেই এভাবে ভেঙে দিচ্ছেন? উত্তরে বিশ্লেষকরা বলছেন, শি এখন যেকোনো সামান্য অবাধ্যতাকেও তার শাসনের জন্য রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখছেন। তার বিশ্বাস, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি কমান্ডারদের আনুগত্য ও পেশাদার দক্ষতাকে নষ্ট করে দিয়েছে। এ পরিস্থিতির ফলে যুদ্ধের প্রস্তুতি বনাম রাজনৈতিক আনুগত্য এ দুই অগ্রাধিকারের মধ্যে একটি গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। বর্তমানে শি ছাড়া চীনের সর্বোচ্চ সামরিক কাউন্সিলে একমাত্র প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে টিকে আছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ঝাং শেংমিন, যা ইঙ্গিত দেয় যে শি এখন সমরকুশলীদের চেয়ে তদন্তকারীদের ওপর বেশি ভরসা করছেন।

শি জিনপিং ক্ষমতা নেওয়ার শুরু থেকেই তার পূর্বসূরি হু জিনতাওয়ের মতো দুর্বল হতে চাননি। হু জিনতাওয়ের আমলে সামরিক বাহিনী বেসামরিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল বলে মনে করা হতো, যার বড় প্রমাণ ছিল ২০১১ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরের সময় তার অগোচরেই স্টিলথ যুদ্ধবিমানের পরীক্ষা চালানো। সেই পরিস্থিতি বদলাতে ২০১২ সালে ক্ষমতায় এসেই শি সামরিক বাহিনীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দুর্নীতি দূর করতে নামেন। ২০১৪ সালে মাও সেতুংয়ের ঐতিহাসিক নীতি পার্টিই বন্দুক নিয়ন্ত্রণ করবে পুনর্জীবিত করেন তিনি। সে সময় তিনি জেনারেল সু চাইহৌ-এর মতো শক্তিশালী ব্যক্তিদের পতন নিশ্চিত করেন, যারা প্রকাশ্যে আনুগত্যের কথা বললেও গোপনে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিলেন।

নিজের আধুনিকায়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শি শুরুতে জেনারেল ঝাং ইউশিয়ার ওপর বড় দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এ জেনারেলকে তিনি রকেট ফোর্স ও অস্ত্র সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের দায়িত্ব দেন। কিন্তু ২০১৮ সালের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে থাকে। ২০২৩ সালে হঠাৎ করেই রকেট ফোর্সের শীর্ষ কমান্ডারদের সরিয়ে দেওয়া এবং পরবর্তীকালে প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করার মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট হয়, শি’র সংস্কার প্রচেষ্টাও দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলতে পারেনি। এর পর থেকে তদন্তের ব্যাপ্তি আরও বাড়ে এবং ঝাং শেংমিনের মতো কট্টর অনুগত ও তদন্তকারীদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির গবেষক জোয়েল উথনাও মনে করেন, শি’র কাছে দুর্নীতি মানেই হলো আদর্শগত বিচ্যুতি। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এ শুদ্ধি অভিযান কেবল কাঠামোই নয়, বরং সামরিক বাহিনীর ভারসাম্যকেও বদলে দিয়েছে। সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, জেনারেল ঝাং ইউশিয়ার সঙ্গে শি’র বিচ্ছেদ সম্ভবত চূড়ান্ত হয় যখন শি একজন তদন্তকারীকে বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ে বসাতে চান। পেশাদার জেনারেলরা মনে করেছিলেন, এতে বাহিনীর লড়াকু ইমেজ ক্ষুণ্ণ হবে। কিন্তু শি জিনপিং কোনো দ্বিমত সহ্য করেননি। এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শি জিনপিংয়ের শাসন সম্ভবত এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে তিনি চারপাশের সবার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে কেবল নিজের তৈরি করা কঠোর নজরদারি ও শৃঙ্খলার ওপরই নির্ভর করছেন। এ অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত চীনের সামরিক সক্ষমতাকে কতটা দুর্বল করবে, তা এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম বড় পর্যালোচনার বিষয়।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

/এমএকে/