শিরোনাম

সৌরবিদ্যুতের বৃহৎ স্বপ্ন বাস্তবায়নে যেসব চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক
সৌরবিদ্যুতের বৃহৎ স্বপ্ন বাস্তবায়নে যেসব চ্যালেঞ্জ
সোলার প্যানেল। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় নতুন সরকার আগামী ৪ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বৃহৎ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বড় ধরনের আর্থিক, কারিগরি ও ভূমি-সংকট রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে হবে। কিন্তু বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় না করে বড় আকারে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়তে পারে। এমনিতেই দেশে প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকে। এর মধ্যে নতুন করে ১০ হাজার মেগাওয়াট যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

সর্বশেষ মহাপরিকল্পনায় ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনতে ১৬ গিগাওয়াট সোলার পার্ক, ৬ গিগাওয়াট সোলার সেচ এবং ১২ গিগাওয়াট রুফটপ সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমান বাজারদরে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়। সেই হিসাবে ১০ হাজার মেগাওয়াট প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ক্যাবল, স্ট্রাকচার, বিদ্যুতের গ্রিড লাইনের যন্ত্রাংশ এবং সাবস্টেশন বাবদ অন্তত ৮০ ভাগ খরচ হয়। যার পুরোটাই বৈদেশিক মুদ্রায় করতে হয়। ফলে প্রয়োজন হবে প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা। বছরে বিনিয়োগ লাগবে প্রায় ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ২০০৮ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হলেও ১৮ বছরে মাত্র ১ হাজার মেগাওয়াট গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। তার মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের ঘোষণা বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য বেশি।

এত বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল জমিও প্রয়োজন হবে। প্রতি মেগাওয়াটে গড়ে আড়াই একর জমি ধরে ১০ হাজার মেগাওয়াটের জন্য লাগবে প্রায় ২৫ হাজার একর জমি। এতে কৃষিজমি কমে খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে।

কৃষিবিদ ড. রুস্তম আলী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিচের জমি অনাবাদি রাখা যাবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষি আবাদ নিশ্চিত করতে হবে।

কারিগরি দিক থেকেও রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। সৌরবিদ্যুৎ দিনে গড়ে সাড়ে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা উৎপাদন করতে পারে। মেঘলা আবহাওয়া বা শীতে উৎপাদন কমে যায়। ফলে গ্রিড স্থিতিশীল রাখতে জীবাশ্ম জ্বালানির কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে হয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দিনের বড় অংশে যদি সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়, তাহলে হঠাৎ উৎপাদন কমে গেলে ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি বহাল রেখে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করলে সরকারকে একদিকে সৌরবিদ্যুতের দাম দিতে হবে, অন্যদিকে অলস কেন্দ্রগুলোকেও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হবে। এতে বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।

/এফসি/