শিরোনাম

এসটিপি বাস্তবায়নে রাজউকের হুঁশিয়ারি, মনঃক্ষুণ্ন গুলশান-বনানীবাসী

এসটিপি বাস্তবায়নে রাজউকের হুঁশিয়ারি, মনঃক্ষুণ্ন গুলশান-বনানীবাসী
এসটিপি বাস্তবায়নে রাজউকের হুঁশিয়ারি, মনঃক্ষুণ্ন গুলশান-বনানীবাসী গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

গুলশান লেকে সরাসরি পয়ঃবর্জ্য ও দূষিত পানি ফেলা বন্ধ করতে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার ভবনগুলোতে সেপটিক ট্যাংক, সোকওয়েল অথবা পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার (এসটিপি) স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। রাজউকের চিঠি পাওয়ার এক মাসের মধ্যে এ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংস্থাটি। তবে পর্যাপ্ত জায়গার সংকট ও কারিগরি বাস্তবতা বিবেচনা না করেই এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা ও হাউজিং সোসাইটির প্রতিনিধিরা। এছাড়া দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারের সঙ্গে সুয়ারেজ লাইন সংযুক্ত হওয়ার কথা থাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপিত এসটিপির ভবিষ্যৎ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় গুলশান লেক দূষণমুক্ত করতে গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকার প্রতিটি ভবনে সেপটিক ট্যাংক ও সোকওয়েল অথবা এসটিপি স্থাপনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নিতে রাজউককে নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ জুলাই এবং সর্বশেষ ৮ সেপ্টেম্বর ভবনমালিকদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

রাজউকের সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, অনেক ভবনের অনুমোদিত নকশায় সেপটিক ট্যাংক ও সোকওয়েলের ব্যবস্থা দেখানো থাকলেও বাস্তবে তা নির্মাণ করা হয়নি। ফলে গৃহস্থালি বর্জ্য ও দূষিত পানি পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি লেকে গিয়ে পড়ছে, যা লেক দূষণের অন্যতম কারণ।

গত ৮ সেপ্টেম্বর জারি করা চূড়ান্ত নোটিশে বলা হয়, রাজউতের পরিদর্শনে সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোতে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো সেপটিক ট্যাংক, সোকওয়েল বা এসটিপি পাওয়া যায়নি। ভবনগুলোর অনুমোদিত নকশায় এসব অবকাঠামো দেখানো থাকলেও বাস্তবে নির্মাণ করা হয়নি, যা ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই চিঠি পাওয়ার এক মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-২০২০ অনুসরণ করে ভবনের সুবিধাজনক স্থানে সেপটিক ট্যাংক ও সোকওয়েল অথবা এসটিপি নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, গুলশান বা বনানীর ভবন মালিকরা নকশায় সেপটিক ট্যাংক বা এসটিপি দেখানোর শর্তে যে অনুমোদন পেয়েছিলেন, বাস্তবে তা নির্মাণ না করে শর্ত ভঙ্গ করেছেন। এ কারণে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৯ ধারা অনুযায়ী সংস্থাটির তাদের নকশা ও অনুমোদন বাতিল করার আইনি ক্ষমতা রয়েছে।

তবে রাজউকের এ পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দারা। তাদের দাবি, বহু আগে নির্মিত ভবনগুলোতে নতুন করে এসটিপি বা সেপটিক ট্যাংক বসানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। পাশাপাশি কোনো ধরনের কারিগরি সহায়তা বা বিকল্প ব্যবস্থা না করে ঢালাওভাবে নোটিশ জারি করা হয়েছে।

নিকেতন সোসাইটির দপ্তর সম্পাদক জেসি আবদুর রউফ বলেন, ‘নিকেতনের নিজস্ব সেন্ট্রাল লাইন আছে এসটিইর। এর মাধ্যমে দূষিত পানি পরিশোধিত হয়ে লেকে যায়। অন্যান্য সোসাইটির দূষিত পানি সরাসরি লেকে যাচ্ছে, যা নিকেতন সোসাইটি করছে না।’

অন্যদিকে রাজউক বলছে, অনুসন্ধানে লেকে সরাসরি বর্জ্য ফেলার প্রমাণ পাওয়ার পরই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজউকের জোন-৪/২ এর অথরাইজড অফিসার মো. হাসানুর রেজা সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘ওয়াসা ইনভেস্টিগেশন করে লেকের মধ্যে বর্জ্য যাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সোসাইটির লোকজনের কাছে চিঠি দিয়েছি।’

একইভাবে রাজউকের জোন-৪/১ এর অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ কায়সার পারভেজ স্বাক্ষরিত চূড়ান্ত চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হলে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২, ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা-২০২৫, বিএনবিসি-২০২০ এবং বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ২০২২-২০৩৫ অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজউকের জোন-৪ এর পরিচালক সালেহ্ আহমদ জাকারিয়া সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘আমরা ভবন মালিকদের চিঠি দিয়েছি, নিজ উদ্যোগে সেপটিক ট্যাংক বা এসটিপি নির্মাণ করার জন্য। যদি তারা এই বিষয়টি উপেক্ষা করেন তাহলে আমরা এক-দুই মাসের মধ্যে অভিযান পরিচালনা শুরু করবো।’

এদিকে রাজউকের আওতাধীন এলাকার লেকগুলোর দূষণ রোধ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গত ১০ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ১৭ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে। গঠিত এ কমিটিতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন-২) মো. সারোয়ার আলমকে আহ্বায়ক এবং উপসচিব (প্রশাসন-২) লুৎফুন নাহার নাজীমকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটিতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. তানভীর মঞ্জুর এবং অধ্যাপক ড. শেখ মোখলেসুর রহমানকে।

কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান ও প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আলমগীর হাছিন আহমেদ, রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (প্রকল্প ও ডিজাইন) মো. মুজাফফর উদ্দিন এবং প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) মো. আমিনুর রহমান। এ ছাড়া কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (প্রশাসন অধিশাখা-১) অভিজিৎ রায়, রাজউকের ‘গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্প’-এর প্রকল্প পরিচালক এবং ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী ও ‘দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারের জন্য পয়ঃবর্জ্য সংগ্রহ লাইন নির্মাণ ফেজ-১’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. মোমতাজুর রহমান।

লেকসংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এ কমিটিতে বিভিন্ন সোসাইটির প্রতিনিধিদেরও যুক্ত করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে গুলশান সোসাইটি, বারিধারা সোসাইটি, বনানী সোসাইটি এবং নিকেতন সোসাইটির চারজন প্রতিনিধিকে।

গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক দূষণমুক্ত করার কৌশল ও বিকল্প সমাধান নির্ধারণে গঠিত এ কারিগরি কমিটির একটি সভা সোমবার (১৪ সেপ্টম্বর) বিকাল ৩টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) এরাদুল হক, সোসাইটির প্রতিনিধিসহ কারিগরি কমিটির অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

/এসএ/