শিরোনাম

‘খণ্ড’ নামে লেকশোর পাচ্ছে ৯ কাঠা, রাজউকের গচ্চা ৬০ কোটি

‘খণ্ড’ নামে লেকশোর পাচ্ছে ৯ কাঠা, রাজউকের গচ্চা ৬০ কোটি
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

অভিজাত এলাকা গুলশানের একটি বড় ‘প্লট উপযোগী’ সরকারি জমিকে ‘খণ্ড জমি’ দেখিয়ে বেসরকারি হোটেল লেকশোর কর্তৃপক্ষকে বাজারদরের চেয়ে অনেক কম মূল্যে বরাদ্দ দেওয়ার তোড়জোড় চালাচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।

বিধি অনুযায়ী, আড়াই কাঠা বা এর বেশি আয়তনের জায়গা হলে তা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বরাদ্দ দিতে হবে। সেই নিয়ম না মেনে এখানে প্রায় ৯ কাঠা ১ ছটাক জমি তুলে দেওয়া হচ্ছে হোটেল লেকশোর কর্তৃপক্ষের হাতে। নিয়ম ভাঙার এই মহোৎসবে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হতে যাচ্ছে কমপক্ষে ৬০ কোটি টাকা। রাজউক বলছে, প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনো বরাদ্দের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি। জমিটি আঁকাবাঁকা হওয়ায় লেকশোরকে দিতে হচ্ছে।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের ভূমি বরাদ্দের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। এখানে কোনোভাবেই ৯ কাঠার জমি খণ্ড জমি হিসেবে বরাদ্দ দেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই
স্থপতি ইকবাল হাবিব নগর পরিকল্পনাবিদ

২৪ বছর ধরে অবৈধ দখলে রেখে কেনার আবেদন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুলশান সিডব্লিউ (এ) ব্লকের ৪১ নম্বর রোডের ৪৬ নম্বর প্লটটি (বর্তমানে হোটেল লেকশোর গ্র্যান্ড) ১৯৬২ সালে তৎকালীন ডিআইটি (বর্তমানে রাজউক) আবু মোজাফফর নামে এক ব্যক্তির অনুকূলে বরাদ্দ দেয়। তখন এর আয়তন ছিল ১৮ কাঠা ৭ ছটাক। ১৯৭০ সালে জমিটি হস্তান্তর সূত্রে নামজারি হয় কাজী মমতাজ শিরিনের নামে। পরে তিনি প্লট সংলগ্ন অতিরিক্ত জমির জন্য আবেদন করলে ট্রাস্টি বোর্ড ‘কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না’ শর্তে আরও ৪ কাঠা ১৪ ছটাক জমি বরাদ্দ দেয়। সব মিলিয়ে বরাদ্দকৃত জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ কাঠা ৫ ছটাক।

হোটেল লেকশোর
গুলশানের ৪১ নম্বর রোডে হোটেল লেকশোর গ্রান্ড। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০২ সালে রাজউকের সরেজমিন জরিপেই ধরা পড়েছিল যে, লিজগ্রহীতা মমতাজ শিরিন বা হোটেল লেকশোর কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত ২৩ কাঠার জায়গায় অবৈধভাবে ৩২ কাঠা ৬ ছটাক জমির ওপর ভবন নির্মাণ করে রেখেছে। অর্থাৎ, প্রায় ২৪ বছর ধরে ৯ কাঠা ১ ছটাক সরকারি জমি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রাজউকের কানুনগো ও সার্ভেয়ারের যৌথ পরিদর্শনেও এই অবৈধ দখলের সত্যতা মেলে। এর পরপরই চলতি বছরের মে মাসে মমতাজ শিরিন জমিটি নিজের নামে বরাদ্দ চেয়ে আবেদন জমা দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, এই জমিতে প্রয়োজনীয় কিছু করা সম্ভব নয়। অন্য কাউকে বরাদ্দ দেওয়া হলে তাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

নথিতে ৯ কাঠা জমি বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু

জানা গেছে, অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বর্তমানে তা বৈধকরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে রাজউক। গত ২ জুন রাজউকের উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. মাহবুবুর রহমান কানুনগো ও সার্ভেয়ারের যৌথ নকশার অজুহাত দেখিয়ে এই ৯ কাঠা ১ ছটাক জমিকে ‘খণ্ড জমি’ হিসেবে উল্লেখ করে লেকশোরকে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বোর্ড সভায় অনুমোদনযোগ্য বলে সুপারিশ করে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেছেন।

রাজউকের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিদ্যমান আইন, নীতিমালা ও বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ কাঠার কম হলে প্লটের অভ্যন্তরে থাকা জমি ফাইলের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়। ১ কাঠার বেশি হলে তা বোর্ড সভার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। কিন্তু জমির পরিমাণ আড়াই কাঠা বা এর বেশি হলে তা কোনোভাবেই খণ্ড জমি হওয়ার সুযোগ নেই। এটি তখন প্লট হিসেবে গণ্য হবে।

অথচ ২০ থেকে ২২ বছর ধরে এ জমিটি খণ্ড হিসেবে বরাদ্দ পাওয়ার চেষ্টা করেও সফল হয়নি লেকশোর কর্তৃপক্ষ।

রাজউকের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিদ্যমান আইন, নীতিমালা ও বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ কাঠার কম হলে প্লটের অভ্যন্তরে থাকা জমি ফাইলের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়। ১ কাঠার বেশি হলে তা বোর্ড সভার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। কিন্তু জমির পরিমাণ আড়াই কাঠা বা এর বেশি হলে তা কোনোভাবেই খণ্ড জমি হওয়ার সুযোগ নেই। এটি তখন প্লট হিসেবে গণ্য হবে।

এমন একটি বিধি বহির্ভূত ঘটনা উত্তরা এলাকায় এর আগেও ঘটিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমান সরকারের শীর্ষ মহলের আত্মীয় পরিচয় দেওয়া এক প্রকৌশলী নেতাকে ২ কাঠা জমি খণ্ড জমি হিসেবে উল্লেখ করে ফাইলে অনুমোদন দিয়েছে রাজউক।

রাজউকের গচ্চা ৬০ কোটি টাকা

সরেজমিনে দেখা গেছে, গুলশানের ওই ৩২ কাঠা ৬ ছটাক জমির পুরোটাতেই দেয়াল দিয়ে ঘিরে হোটেলের অবকাঠামো ও বিশাল পার্কিং লট বানানো হয়েছে। হোটেল থেকে কয়েক কদম দূরেই বনানী লেক। পাশে রয়েছে পাঁচ তারকা হোটেল আমারি ঢাকা, ডেন্টাল সেন্টার এবং ফিটনেস ট্রেনিং সেন্টারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা।

হোটেল লেকশোর (2)
হোটেল প্রাঙ্গনে ঢুকতেই বিশাল পার্কিং এরিয়া। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

এই প্রতিবেদক হোটেল ও সংলগ্ন এলাকা পরিদর্শনের সময় ছবি তুলতে গেলে লেকশোরের দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ‘এই জায়গা নিয়ে ঝামেলা আছে। এজন্য হোটেল বা এর আশপাশের ছবি কাউকে তুলতে দেওয়া হয় না।’

রাজউকের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা যায়, ৯ কাঠা ১ ছটাক জমিকে যদি নতুন প্লট তৈরি করে উন্মুক্ত দরপত্র বা নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হতো, তবে বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী রাজউকের কোষাগারে জমা পড়তো ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা।

রাজউকের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা যায়, ৯ কাঠা ১ ছটাক জমিকে যদি নতুন প্লট তৈরি করে উন্মুক্ত দরপত্র বা নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হতো, তবে বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী রাজউকের কোষাগারে জমা পড়তো ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা।

অথচ খণ্ড জমি হিসেবে গুলশানের বর্তমান সরকারি রেট (প্রতি কাঠা ৫০ লাখ টাকা) অনুযায়ী বরাদ্দ দিলে রাজউক পাবে মাত্র ৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার মতো। হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৩ গুণ দাম নেওয়ার কথা বলা হলেও তা বড়জোর ১৫ কোটিতে দাঁড়াবে। ফলে সরাসরি সরকারের ক্ষতি বা গচ্চা যাবে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা।

‘খণ্ড জমি’ বরাদ্দের বিষয়ে কথা হয় নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিবের সঙ্গে। তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের ভূমি বরাদ্দের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। এখানে কোনোভাবেই ৯ কাঠার জমি খণ্ড জমি হিসেবে বরাদ্দ দেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই।’

তিনি যোগ করেন, ‘এই বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে সেই কমিটি বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা যাচাই করে প্রতিবেদন দেবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এর বাইরে গিয়ে অর্থাৎ ফাইল নোটের মাধ্যমে কোনো কিছু চূড়ান্ত করতে গেলে, তা হবে বেআইনি।’

দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বক্তব্য

জায়গাটা আঁকাবাঁকা, অন্য কেউ এই জমি নিতে চাইবে না। লেকশোর কর্তৃপক্ষকে দিলে তারা নির্ধারিত মূল্যের তিনগুণ টাকা দেবে। তবে এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের পর ফাইল মন্ত্রণালয়ে যাবে, তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে
ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম চেয়ারম্যান, রাজউক

এ বিষয়ে পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে রবিবার (৭ জুন) সন্ধ্যায় কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘আমি এখনও ফাইল অনুমোদন করিনি। কিছু বিষয়ে অনুসন্ধান দিয়েছি, সেগুলো বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

অন্যদিকে, উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. মাহবুবুর রহমান দায়সারাভাবে বলেন, ‘তাদের (লেকশোর) কাছ থেকে আমরা শুধু টাকা আদায় করবো, আর সেটা রাজউকের বিধিমালা অনুযায়ীই হবে।’

সার্বিক বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘জায়গাটা আঁকাবাঁকা, অন্য কেউ এই জমি নিতে চাইবে না। লেকশোর কর্তৃপক্ষকে দিলে তারা নির্ধারিত মূল্যের তিনগুণ টাকা দেবে। তবে এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের পর ফাইল মন্ত্রণালয়ে যাবে, তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।’

/এসএ/