শিরোনাম

১২ পথে গুলশান লেকে ঢুকছে বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য

১২ পথে গুলশান লেকে ঢুকছে বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানীর অন্যতম জলাধার গুলশান লেক। দীর্ঘদিন ধরে এই লেকে পয়ঃবর্জ্য ও দূষিত পানি প্রবেশ করছে। গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার ভবনগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা যাচাই করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। লেকের আশপাশের এলাকা থেকে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশ করে এমন ১২টি উৎস পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ছয়টি প্রাইমারি এবং ছয়টি সেকেন্ডারি স্থান চিহ্নিত হয়েছে।

সবমিলিয়ে ২ হাজার ৩২৫টি ভবন পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রায় ৬৭ শতাংশ ভবনের সেপটিক ট্যাংক, প্রায় ৯৫ শতাংশ ভবনে সোকওয়েল (পয়ঃনিষ্কাশনের কূপ) ও প্রায় ৫ শতাংশ ভবনে ডিএনসিসির ড্রেনেজ নেটওয়ার্কে সংযোগ নেই।

রাজধানীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা নিয়ে এমন তথ্য মিলেছে খোদ সরকারি সংস্থার তদন্তে। সম্প্রতি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসার সুয়ারেজ লাইন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকার অপোরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য, দূষিত পানি এবং কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানিও সরাসরি গুলশান লেকে এসে পড়ছে।

১২ পথে গুলশান লেকে ঢুকছে বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য
চেয়ারম্যান বাড়ি সংলগ্ন পয়ঃনিষ্কাশন লাইন। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

জানা যায়, প্রাইমারি পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে কালাচাঁদপুর ব্রিজ, বনানী ১৮ নম্বর সড়ক, কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ের কালভার্ট, বনানী ১১ নম্বর ব্রিজ, চেয়ারম্যান বাড়ি এবং নিকেতনের ফজলে রাব্বি পার্কসংলগ্ন এলাকা।

সরেজমিনে দেখা যায়, কালাচাঁদপুর ব্রিজসংলগ্ন পয়েন্ট দিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ও বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার পয়ঃবর্জ্য ও দূষিত পানি লেকে পড়ছে। বনানী ১৮ নম্বর সড়কের পয়েন্ট দিয়ে বনানী কবরস্থান এলাকা, নৌবাহিনীর সদর দপ্তর এবং এয়ারপোর্ট রোডসংলগ্ন বিভিন্ন ভবনের অপোরিশোধিত বর্জ্যও লেকে পড়ছে। একইভাবে কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী ১১ নম্বর ব্রিজ এবং চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকার পয়েন্টগুলো দিয়েও গুলশান, বনানী, মহাখালী ডিওএইচএস ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বিভিন্ন ভবনের পয়ঃবর্জ্য লেকে প্রবাহিত হচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে নিকেতনের ফজলে রাব্বি পার্কসংলগ্ন এলাকায়। সেখানে একটি স্থানে মহাখালী, নাখালপাড়া, শাহীনবাগ, নিকেতন এবং গুলশান এভিনিউয়ের পশ্চিম পাশের এলাকার পয়ঃবর্জ্য, দূষিত পানি ও বৃষ্টির পানি জমা হয়। ভারী বর্ষণ কিংবা প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে ওই স্থান উপচে পড়ে বর্জ্য সরাসরি গুলশান লেকে চলে যায়।

অন্যদিকে, সেকেন্ডারি পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বীর উত্তম এ কে খন্দকার সড়কের ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা, পুলিশ প্লাজার পেছনের অংশ, বনানী ১৮ নম্বর এক্সটেনশন সড়কের লেক সংলগ্ন অংশ, মহাখালীতে পারটেক্স গ্রুপের গরুর খামাার সংলগ্ন এলাকা, কড়াইল বস্তি এবং বনানীর আই ব্লকের ১/এ সড়ক সংলগ্ন পয়েন্ট।

১২ পথে গুলশান লেকে ঢুকছে বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য (3)
বনানী আই ব্লকের ১/এ রোড সংলগ্ন লেক এলাকা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

পুলিশ প্লাজার পেছনের পয়েন্ট দিয়ে দক্ষিণ বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা এবং গুলশান এভিনিউয়ের পূর্ব পাশের এলাকার পয়ঃবর্জ্য ও দূষিত পানি লেকে প্রবেশ করছে। বনানী ১৮ নম্বর এক্সটেনশন সড়কে ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের কিছু আরসিসি পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখান থেকেও সরাসরি বর্জ্য লেকে পড়ছে। মহাখালী অংশে পারটেক্স গ্রুপের গরুর খামারের বর্জ্য এবং আশপাশের কিছু ভবনের পয়ঃবর্জ্য একটি ড্রেনের মাধ্যমে লেকে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া কড়াইল বস্তি ও বনানী আই ব্লকের লেকপাড়সংলগ্ন ভবনগুলোর বর্জ্যও সরাসরি লেকে পড়ছে।

এদিকে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার ভবনগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা যাচাই করতে সম্প্রতি

রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) এরাদুল হককে আহ্বায়ক এবং পরিচালককে (জোন-৪) সদস্যসচিব করে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১০টি পরিদর্শন দল মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করে।

জানা গেছে, ওই অঞ্চলের ২ হাজার ৩২৫টি ভবনের মধ্যে ৪৮৩টি ভবন একেবারে লেক ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে। আধুনিক ও বিলাসবহুল এই ভবনগুলোর প্রায় ৬৭ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ৫৫০টি ভবনেই কোনো সেপটিক ট্যাংক নেই। অর্থাৎ টয়লেটের নোংরা বর্জ্য কোনো রকম পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি ড্রেনে চলে যাচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, প্রায় ৯৫ শতাংশ বা ২ হাজার ২০৪টি ভবনে কোনো সোকওয়েল নেই। আর প্রায় ৫ শতাংশ অর্থাৎ ১১২টি ভবন তো কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সরাসরি তাদের সুয়ারেজ লাইন লেকের ভেতরে সংযুক্ত করে দিয়েছে। মাত্র ৭৭৫টি ভবনে সেপটিক ট্যাংক এবং ১২১টি ভবনে সোকওয়েল পাওয়া গেছে।

১২ পথে গুলশান লেকে ঢুকছে বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য (2)
ডা. ফজলে রাব্বি পার্ক সংলগ্ন পয়ঃনিষ্কাশন নালা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

এ বিষয়ে শনিবার (১৩ জুন) রাতে রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (প্রকল্প ও ডিজাইন) মো. মুজাফফর উদ্দীন সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঢাকা ওয়াসার সুয়ারেজ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ভবন মালিকদের অনিয়মের কারণে গুলশান লেকের পানি দূষিত হচ্ছে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত ড্রেনগুলোতে অনেক বাড়ির মালিক তাদের ভবনের পয়ঃবর্জ্যের লাইন সংযুক্ত করেছে। ফলে এসব বর্জ্য সরাসরি লেকে গিয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, রাজউকের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, ৫ কাঠা বা তার বেশি আয়তনের প্লটে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন বাধ্যতামূলক। যেসব ভবনে এখনো এ ধরনের প্ল্যান্ট নেই, তাদের এক বছরের মধ্যে তা স্থাপন করতে হবে।

তিনি আরও জানান, গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়নে প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মাঠপর্যায়ে বিশেষ টিম কাজ করছে।

/এসএ/