শিক্ষক মূল্যায়ন করতে গিয়ে যে প্রশ্নের মুখে ডাকসু

শিক্ষক মূল্যায়ন করতে গিয়ে যে প্রশ্নের মুখে ডাকসু
সিজেডএন ডেস্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) চালু করা ওয়েবসাইট নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, শিক্ষক মূল্যায়নের মতো একাডেমিক কাজ ডাকসুর উদ্যোগে কেন পরিচালিত হবে। মূল্যায়নের ফল প্রকাশ্যে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন শিক্ষককে ব্যঙ্গ ও কটূক্তির শিকার হতে হয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বর ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ নামে ওয়েবসাইটটি চালু করে ডাকসু। গতকাল রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৮৯ জন শিক্ষার্থী এতে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করেছেন। সব মিলিয়ে পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ জন শিক্ষক ছিলেন ওয়েবসাইটের তালিকায়।
সমালোচনার মুখে গতকাল শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রেটিং দেখার সুযোগ বন্ধ করে দেয় ডাকসু। তবে এর আগেই কয়েকজন শিক্ষকের নম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষকদের বক্তব্য, শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু এর ফল গোপন রাখা এবং মূল্যায়নকে একটি নির্দিষ্ট একাডেমিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখাই আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত। ডাকসুর ওয়েবসাইটে যেভাবে ব্যক্তিগত রেটিং প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়েছিল, সেটিই তাদের প্রধান আপত্তির একটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের কাজ সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন। এর কিছু বিষয় গোপন না রাখলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
তার মতে, একজন শিক্ষকের কাজ শুধু ক্লাস নেওয়ার মধ্যে সীমিত নয়। তারা গবেষণা ও অন্যান্য একাডেমিক কাজেও যুক্ত থাকেন। ফলে শুধু শিক্ষার্থীদের জরিপের ভিত্তিতে একজন শিক্ষক সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায় না।
শিক্ষক মূল্যায়নের দাবি কেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই দশকে বিভাগ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০০ সালে বিভাগ ছিল ৪৭টি, এখন ৮৪টি। ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ৯ থেকে বেড়ে ১২ হয়েছে। নিয়মিত শিক্ষার্থী সাড়ে ২২ হাজার থেকে বেড়ে ৩৭ হাজারের বেশি হয়েছে। শিক্ষকসংখ্যাও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে এখন ২ হাজার ১৫ জন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শিক্ষক রাজনীতিতে দল ভারী করতে বিভাগ খোলা ও শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে গবেষণায় ফাঁকি, শ্রেণিকক্ষে অদক্ষতা, পছন্দের শিক্ষার্থীকে বেশি নম্বর দেওয়া কিংবা অপছন্দের শিক্ষার্থীকে কম নম্বর দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ সীমিত হওয়ায় শিক্ষক মূল্যায়নের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের ডাকসু নির্বাচনের আগে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ইশতেহারেও শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ছিল।
ডাকসুর এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার চার দিন আগে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। এটি চালুর কাজে সক্রিয় ছিলেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েমসহ শিবির-সমর্থিত প্যানেলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তবে ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম সেখানে ছিলেন না।
উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া বলেন, শিক্ষার্থীদের চাহিদার ভিত্তিতেই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইট চালুর জন্য তিনি গত এক বছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন। তবে তা পাননি। প্রশাসনের আপত্তি থাকলেও ওয়েবসাইটটি চালু থাকবে বলে জানান তিনি।
ডাকসুর পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন মাসের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হবে।
ডাকসুর নির্ধারিত এক বছরের মেয়াদ আজ সোমবার শেষ হচ্ছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হলে মেয়াদ আরও তিন মাস বাড়তে পারে।
কীভাবে হচ্ছে মূল্যায়ন
ওয়েবসাইটে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য কোর্সের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারি আচরণ এবং সার্বিক সন্তুষ্টির মতো বিষয় রাখা হয়েছে।
শিক্ষক কতটা পরিষ্কারভাবে পড়ান, প্রশ্ন ও আলোচনায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন কি না, সম্মানজনক আচরণ করেন কি না এবং নিয়মিত ক্লাস নেন কি না, এসব বিষয়েও মতামত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ওয়েবসাইটে মূল্যায়ন করতে পারছেন। এ জন্য একাডেমিক ই-মেইল দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। একজন শিক্ষার্থী শুধু নিজের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারেন। মূল্যায়নকারীর পরিচয় গোপন রাখার কথা জানিয়েছে ডাকসু।
একজন শিক্ষার্থী একাধিক শিক্ষককে মূল্যায়ন করতে পারেন। এখন পর্যন্ত সাড়ে ৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ১১ হাজারের বেশি মূল্যায়ন দিয়েছেন।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, ওয়েবসাইটের কোনো মূল্যায়ন চূড়ান্ত নয়। এটি এখনো উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করলে ডাকসুর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।
মূল্যায়নের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি
শিক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, মূল্যায়নে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট কোর্স সম্পর্কে অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া দরকার। একজন শিক্ষার্থী সব শিক্ষকের কোর্স করেন না। আবার নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকা শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন কতটা নির্ভরযোগ্য, সেই প্রশ্নও রয়েছে।
লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামি এ ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন। গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ডাকসুর ওয়েবসাইটে তার রেটিং ছিল ৫-এর মধ্যে ১ দশমিক ৪৯। পরে ১ দশমিক ৮৩ রেটিং দেখানো আরেকটি ফটোকার্ডও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
শনিবার ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে শেহরীন আমিন বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নে তার আপত্তি নেই। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করার সময় তিনি এমন মূল্যায়নের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশে মূল্যায়ন কতটা নিরপেক্ষ হবে এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কম হলে সেটি কতটা প্রতিনিধিত্বশীল হবে, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি ডাকসুর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া ওয়েবসাইট চালু করায় নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন।
গতকাল ব্যক্তিগত রেটিং বন্ধ করার পরও সামগ্রিক ফলাফল দেখা যাচ্ছিল। বিকেল চারটা পর্যন্ত পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৩৪৭ জনের রেটিং ছিল ৪ থেকে ৫-এর মধ্যে। ৩ থেকে ৪-এর মধ্যে ছিলেন ২০৫ জন, ২ থেকে ৩-এর মধ্যে ১৫৫ জন এবং ২-এর নিচে ১০৯ জন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাও ছিল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্যোগ নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য একটি জরিপ ফরম তৈরি করেছিল। শিক্ষার্থীদের সেখানে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনাও ছিল। তবে সরকার পরিবর্তন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রদবদলের কারণে সেই কার্যক্রম এগোয়নি।
২০২২ সালে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামালের নেতৃত্বে শিক্ষক মূল্যায়নের নীতিমালা করা হয়। ২০২৪ সালে এর অংশ হিসেবে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) নামে একটি ওয়েবসাইটও চালু হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুতে অন্তত ১৪টি বিভাগে শিক্ষক মূল্যায়ন চালু হয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ৮৪টি বিভাগে একযোগে চালুর পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়ন করা হয়। তবে সাধারণত ফলাফল সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, ডিন বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেখতে পারে; শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষের জন্য তা উন্মুক্ত থাকে না।
অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কী হয়
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের শিক্ষক মূল্যায়ন করা বাধ্যতামূলক। তবে কোনো শিক্ষক কত নম্বর পেয়েছেন, তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো ক্যাম্পাসের নিউরোসায়েন্সেস বিভাগের গবেষক নাদিম মাহমুদ জানান, সেখানে শিক্ষক নিয়োগের পর নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নও বিবেচনায় নেওয়া হয়। তবে মূল্যায়ন ছাত্রসংসদ পরিচালনা করে না এবং ফল প্রকাশ্যেও আসে না।
মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালায় কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত মূল্যায়ন ফরম পূরণ করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন ও উদীয়মান প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ এরশাদুল করিম বলেন, তিনি কত নম্বর পেয়েছেন, তা তার সহকর্মীরাও জানতে পারেন না।
ডাকসুর উদ্যোগকে রাজনৈতিক বলছেন কেউ কেউ
শিক্ষক ও গবেষক আসিফ বিন আলী ডাকসুর উদ্যোগকে রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এর মাধ্যমে ছাত্রনেতাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নের উদ্দেশ্যে শিক্ষক মূল্যায়ন করা হলে সেটি নির্দিষ্ট একাডেমিক প্রক্রিয়ার মধ্যে হওয়ার কথা। এ ধরনের মূল্যায়নে পেশাগত ও তথ্যগত গোপনীয়তা রক্ষা করা হয় এবং ফলাফল শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নে কাজে লাগানো হয়।
তার মতে, শিক্ষক মূল্যায়নের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়েরই নেওয়া উচিত।
শিক্ষকদের নিয়ে নানা উদ্যোগ
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযুক্ত শিক্ষকদের তালিকা করার ঘটনা বেড়েছে।
সর্বশেষ ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে ‘গোপন তৎপরতায়’ যুক্ত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক এমন তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই বছরে অন্তত ৩২ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে শিক্ষকদেরই একটি পক্ষ।
‘গোপন তৎপরতায়’ যুক্ত থাকার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গত ১৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের কমিটি করেছে। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনার জন্যও আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে শিক্ষকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও ডাকসুর শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট নিয়ে আপত্তি তুলেছেন বিভিন্ন মতের শিক্ষক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মূল্যায়নের পক্ষে। তবে এই কাজ ডাকসুর এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষকদের মর্যাদা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষার্থীরা যাতে যথাযথভাবে তাদের মতামত দিতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন।
অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী বলেন, ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষক প্রশাসনের কাছে মৌখিকভাবে, ফোনে এবং সরাসরি দেখা করে অভিযোগ জানিয়েছেন। তার মতে, ডাকসুর ব্যবস্থায় শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) চালু করা ওয়েবসাইট নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, শিক্ষক মূল্যায়নের মতো একাডেমিক কাজ ডাকসুর উদ্যোগে কেন পরিচালিত হবে। মূল্যায়নের ফল প্রকাশ্যে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন শিক্ষককে ব্যঙ্গ ও কটূক্তির শিকার হতে হয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বর ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ নামে ওয়েবসাইটটি চালু করে ডাকসু। গতকাল রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৮৯ জন শিক্ষার্থী এতে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করেছেন। সব মিলিয়ে পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ জন শিক্ষক ছিলেন ওয়েবসাইটের তালিকায়।
সমালোচনার মুখে গতকাল শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রেটিং দেখার সুযোগ বন্ধ করে দেয় ডাকসু। তবে এর আগেই কয়েকজন শিক্ষকের নম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষকদের বক্তব্য, শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু এর ফল গোপন রাখা এবং মূল্যায়নকে একটি নির্দিষ্ট একাডেমিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখাই আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত। ডাকসুর ওয়েবসাইটে যেভাবে ব্যক্তিগত রেটিং প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়েছিল, সেটিই তাদের প্রধান আপত্তির একটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের কাজ সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন। এর কিছু বিষয় গোপন না রাখলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
তার মতে, একজন শিক্ষকের কাজ শুধু ক্লাস নেওয়ার মধ্যে সীমিত নয়। তারা গবেষণা ও অন্যান্য একাডেমিক কাজেও যুক্ত থাকেন। ফলে শুধু শিক্ষার্থীদের জরিপের ভিত্তিতে একজন শিক্ষক সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায় না।
শিক্ষক মূল্যায়নের দাবি কেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই দশকে বিভাগ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০০ সালে বিভাগ ছিল ৪৭টি, এখন ৮৪টি। ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ৯ থেকে বেড়ে ১২ হয়েছে। নিয়মিত শিক্ষার্থী সাড়ে ২২ হাজার থেকে বেড়ে ৩৭ হাজারের বেশি হয়েছে। শিক্ষকসংখ্যাও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে এখন ২ হাজার ১৫ জন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শিক্ষক রাজনীতিতে দল ভারী করতে বিভাগ খোলা ও শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে গবেষণায় ফাঁকি, শ্রেণিকক্ষে অদক্ষতা, পছন্দের শিক্ষার্থীকে বেশি নম্বর দেওয়া কিংবা অপছন্দের শিক্ষার্থীকে কম নম্বর দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ সীমিত হওয়ায় শিক্ষক মূল্যায়নের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের ডাকসু নির্বাচনের আগে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ইশতেহারেও শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ছিল।
ডাকসুর এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার চার দিন আগে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। এটি চালুর কাজে সক্রিয় ছিলেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েমসহ শিবির-সমর্থিত প্যানেলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তবে ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম সেখানে ছিলেন না।
উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া বলেন, শিক্ষার্থীদের চাহিদার ভিত্তিতেই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইট চালুর জন্য তিনি গত এক বছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন। তবে তা পাননি। প্রশাসনের আপত্তি থাকলেও ওয়েবসাইটটি চালু থাকবে বলে জানান তিনি।
ডাকসুর পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন মাসের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হবে।
ডাকসুর নির্ধারিত এক বছরের মেয়াদ আজ সোমবার শেষ হচ্ছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হলে মেয়াদ আরও তিন মাস বাড়তে পারে।
কীভাবে হচ্ছে মূল্যায়ন
ওয়েবসাইটে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য কোর্সের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারি আচরণ এবং সার্বিক সন্তুষ্টির মতো বিষয় রাখা হয়েছে।
শিক্ষক কতটা পরিষ্কারভাবে পড়ান, প্রশ্ন ও আলোচনায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন কি না, সম্মানজনক আচরণ করেন কি না এবং নিয়মিত ক্লাস নেন কি না, এসব বিষয়েও মতামত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ওয়েবসাইটে মূল্যায়ন করতে পারছেন। এ জন্য একাডেমিক ই-মেইল দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। একজন শিক্ষার্থী শুধু নিজের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারেন। মূল্যায়নকারীর পরিচয় গোপন রাখার কথা জানিয়েছে ডাকসু।
একজন শিক্ষার্থী একাধিক শিক্ষককে মূল্যায়ন করতে পারেন। এখন পর্যন্ত সাড়ে ৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ১১ হাজারের বেশি মূল্যায়ন দিয়েছেন।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, ওয়েবসাইটের কোনো মূল্যায়ন চূড়ান্ত নয়। এটি এখনো উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করলে ডাকসুর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।
মূল্যায়নের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি
শিক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, মূল্যায়নে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট কোর্স সম্পর্কে অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া দরকার। একজন শিক্ষার্থী সব শিক্ষকের কোর্স করেন না। আবার নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকা শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন কতটা নির্ভরযোগ্য, সেই প্রশ্নও রয়েছে।
লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামি এ ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন। গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ডাকসুর ওয়েবসাইটে তার রেটিং ছিল ৫-এর মধ্যে ১ দশমিক ৪৯। পরে ১ দশমিক ৮৩ রেটিং দেখানো আরেকটি ফটোকার্ডও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
শনিবার ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে শেহরীন আমিন বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নে তার আপত্তি নেই। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করার সময় তিনি এমন মূল্যায়নের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশে মূল্যায়ন কতটা নিরপেক্ষ হবে এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কম হলে সেটি কতটা প্রতিনিধিত্বশীল হবে, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি ডাকসুর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া ওয়েবসাইট চালু করায় নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন।
গতকাল ব্যক্তিগত রেটিং বন্ধ করার পরও সামগ্রিক ফলাফল দেখা যাচ্ছিল। বিকেল চারটা পর্যন্ত পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৩৪৭ জনের রেটিং ছিল ৪ থেকে ৫-এর মধ্যে। ৩ থেকে ৪-এর মধ্যে ছিলেন ২০৫ জন, ২ থেকে ৩-এর মধ্যে ১৫৫ জন এবং ২-এর নিচে ১০৯ জন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাও ছিল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্যোগ নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য একটি জরিপ ফরম তৈরি করেছিল। শিক্ষার্থীদের সেখানে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনাও ছিল। তবে সরকার পরিবর্তন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রদবদলের কারণে সেই কার্যক্রম এগোয়নি।
২০২২ সালে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামালের নেতৃত্বে শিক্ষক মূল্যায়নের নীতিমালা করা হয়। ২০২৪ সালে এর অংশ হিসেবে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) নামে একটি ওয়েবসাইটও চালু হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুতে অন্তত ১৪টি বিভাগে শিক্ষক মূল্যায়ন চালু হয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ৮৪টি বিভাগে একযোগে চালুর পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়ন করা হয়। তবে সাধারণত ফলাফল সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, ডিন বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেখতে পারে; শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষের জন্য তা উন্মুক্ত থাকে না।
অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কী হয়
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের শিক্ষক মূল্যায়ন করা বাধ্যতামূলক। তবে কোনো শিক্ষক কত নম্বর পেয়েছেন, তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো ক্যাম্পাসের নিউরোসায়েন্সেস বিভাগের গবেষক নাদিম মাহমুদ জানান, সেখানে শিক্ষক নিয়োগের পর নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নও বিবেচনায় নেওয়া হয়। তবে মূল্যায়ন ছাত্রসংসদ পরিচালনা করে না এবং ফল প্রকাশ্যেও আসে না।
মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালায় কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত মূল্যায়ন ফরম পূরণ করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন ও উদীয়মান প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ এরশাদুল করিম বলেন, তিনি কত নম্বর পেয়েছেন, তা তার সহকর্মীরাও জানতে পারেন না।
ডাকসুর উদ্যোগকে রাজনৈতিক বলছেন কেউ কেউ
শিক্ষক ও গবেষক আসিফ বিন আলী ডাকসুর উদ্যোগকে রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এর মাধ্যমে ছাত্রনেতাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নের উদ্দেশ্যে শিক্ষক মূল্যায়ন করা হলে সেটি নির্দিষ্ট একাডেমিক প্রক্রিয়ার মধ্যে হওয়ার কথা। এ ধরনের মূল্যায়নে পেশাগত ও তথ্যগত গোপনীয়তা রক্ষা করা হয় এবং ফলাফল শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নে কাজে লাগানো হয়।
তার মতে, শিক্ষক মূল্যায়নের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়েরই নেওয়া উচিত।
শিক্ষকদের নিয়ে নানা উদ্যোগ
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযুক্ত শিক্ষকদের তালিকা করার ঘটনা বেড়েছে।
সর্বশেষ ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে ‘গোপন তৎপরতায়’ যুক্ত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক এমন তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই বছরে অন্তত ৩২ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে শিক্ষকদেরই একটি পক্ষ।
‘গোপন তৎপরতায়’ যুক্ত থাকার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গত ১৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের কমিটি করেছে। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনার জন্যও আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে শিক্ষকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও ডাকসুর শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট নিয়ে আপত্তি তুলেছেন বিভিন্ন মতের শিক্ষক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মূল্যায়নের পক্ষে। তবে এই কাজ ডাকসুর এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষকদের মর্যাদা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষার্থীরা যাতে যথাযথভাবে তাদের মতামত দিতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন।
অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী বলেন, ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষক প্রশাসনের কাছে মৌখিকভাবে, ফোনে এবং সরাসরি দেখা করে অভিযোগ জানিয়েছেন। তার মতে, ডাকসুর ব্যবস্থায় শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

শিক্ষক মূল্যায়ন করতে গিয়ে যে প্রশ্নের মুখে ডাকসু
সিজেডএন ডেস্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) চালু করা ওয়েবসাইট নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, শিক্ষক মূল্যায়নের মতো একাডেমিক কাজ ডাকসুর উদ্যোগে কেন পরিচালিত হবে। মূল্যায়নের ফল প্রকাশ্যে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন শিক্ষককে ব্যঙ্গ ও কটূক্তির শিকার হতে হয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বর ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ নামে ওয়েবসাইটটি চালু করে ডাকসু। গতকাল রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৮৯ জন শিক্ষার্থী এতে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করেছেন। সব মিলিয়ে পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ জন শিক্ষক ছিলেন ওয়েবসাইটের তালিকায়।
সমালোচনার মুখে গতকাল শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রেটিং দেখার সুযোগ বন্ধ করে দেয় ডাকসু। তবে এর আগেই কয়েকজন শিক্ষকের নম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষকদের বক্তব্য, শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু এর ফল গোপন রাখা এবং মূল্যায়নকে একটি নির্দিষ্ট একাডেমিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখাই আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত। ডাকসুর ওয়েবসাইটে যেভাবে ব্যক্তিগত রেটিং প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়েছিল, সেটিই তাদের প্রধান আপত্তির একটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের কাজ সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন। এর কিছু বিষয় গোপন না রাখলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
তার মতে, একজন শিক্ষকের কাজ শুধু ক্লাস নেওয়ার মধ্যে সীমিত নয়। তারা গবেষণা ও অন্যান্য একাডেমিক কাজেও যুক্ত থাকেন। ফলে শুধু শিক্ষার্থীদের জরিপের ভিত্তিতে একজন শিক্ষক সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায় না।
শিক্ষক মূল্যায়নের দাবি কেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই দশকে বিভাগ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০০ সালে বিভাগ ছিল ৪৭টি, এখন ৮৪টি। ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ৯ থেকে বেড়ে ১২ হয়েছে। নিয়মিত শিক্ষার্থী সাড়ে ২২ হাজার থেকে বেড়ে ৩৭ হাজারের বেশি হয়েছে। শিক্ষকসংখ্যাও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে এখন ২ হাজার ১৫ জন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শিক্ষক রাজনীতিতে দল ভারী করতে বিভাগ খোলা ও শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে গবেষণায় ফাঁকি, শ্রেণিকক্ষে অদক্ষতা, পছন্দের শিক্ষার্থীকে বেশি নম্বর দেওয়া কিংবা অপছন্দের শিক্ষার্থীকে কম নম্বর দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ সীমিত হওয়ায় শিক্ষক মূল্যায়নের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের ডাকসু নির্বাচনের আগে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ইশতেহারেও শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ছিল।
ডাকসুর এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার চার দিন আগে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। এটি চালুর কাজে সক্রিয় ছিলেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েমসহ শিবির-সমর্থিত প্যানেলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তবে ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম সেখানে ছিলেন না।
উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া বলেন, শিক্ষার্থীদের চাহিদার ভিত্তিতেই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইট চালুর জন্য তিনি গত এক বছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন। তবে তা পাননি। প্রশাসনের আপত্তি থাকলেও ওয়েবসাইটটি চালু থাকবে বলে জানান তিনি।
ডাকসুর পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন মাসের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হবে।
ডাকসুর নির্ধারিত এক বছরের মেয়াদ আজ সোমবার শেষ হচ্ছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হলে মেয়াদ আরও তিন মাস বাড়তে পারে।
কীভাবে হচ্ছে মূল্যায়ন
ওয়েবসাইটে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য কোর্সের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারি আচরণ এবং সার্বিক সন্তুষ্টির মতো বিষয় রাখা হয়েছে।
শিক্ষক কতটা পরিষ্কারভাবে পড়ান, প্রশ্ন ও আলোচনায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন কি না, সম্মানজনক আচরণ করেন কি না এবং নিয়মিত ক্লাস নেন কি না, এসব বিষয়েও মতামত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ওয়েবসাইটে মূল্যায়ন করতে পারছেন। এ জন্য একাডেমিক ই-মেইল দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। একজন শিক্ষার্থী শুধু নিজের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারেন। মূল্যায়নকারীর পরিচয় গোপন রাখার কথা জানিয়েছে ডাকসু।
একজন শিক্ষার্থী একাধিক শিক্ষককে মূল্যায়ন করতে পারেন। এখন পর্যন্ত সাড়ে ৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ১১ হাজারের বেশি মূল্যায়ন দিয়েছেন।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, ওয়েবসাইটের কোনো মূল্যায়ন চূড়ান্ত নয়। এটি এখনো উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করলে ডাকসুর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।
মূল্যায়নের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি
শিক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, মূল্যায়নে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট কোর্স সম্পর্কে অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া দরকার। একজন শিক্ষার্থী সব শিক্ষকের কোর্স করেন না। আবার নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকা শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন কতটা নির্ভরযোগ্য, সেই প্রশ্নও রয়েছে।
লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামি এ ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন। গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ডাকসুর ওয়েবসাইটে তার রেটিং ছিল ৫-এর মধ্যে ১ দশমিক ৪৯। পরে ১ দশমিক ৮৩ রেটিং দেখানো আরেকটি ফটোকার্ডও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
শনিবার ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে শেহরীন আমিন বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নে তার আপত্তি নেই। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করার সময় তিনি এমন মূল্যায়নের মুখোমুখি হয়েছেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশে মূল্যায়ন কতটা নিরপেক্ষ হবে এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কম হলে সেটি কতটা প্রতিনিধিত্বশীল হবে, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি ডাকসুর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া ওয়েবসাইট চালু করায় নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন।
গতকাল ব্যক্তিগত রেটিং বন্ধ করার পরও সামগ্রিক ফলাফল দেখা যাচ্ছিল। বিকেল চারটা পর্যন্ত পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৩৪৭ জনের রেটিং ছিল ৪ থেকে ৫-এর মধ্যে। ৩ থেকে ৪-এর মধ্যে ছিলেন ২০৫ জন, ২ থেকে ৩-এর মধ্যে ১৫৫ জন এবং ২-এর নিচে ১০৯ জন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাও ছিল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্যোগ নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য একটি জরিপ ফরম তৈরি করেছিল। শিক্ষার্থীদের সেখানে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনাও ছিল। তবে সরকার পরিবর্তন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রদবদলের কারণে সেই কার্যক্রম এগোয়নি।
২০২২ সালে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামালের নেতৃত্বে শিক্ষক মূল্যায়নের নীতিমালা করা হয়। ২০২৪ সালে এর অংশ হিসেবে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) নামে একটি ওয়েবসাইটও চালু হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুতে অন্তত ১৪টি বিভাগে শিক্ষক মূল্যায়ন চালু হয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ৮৪টি বিভাগে একযোগে চালুর পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়ন করা হয়। তবে সাধারণত ফলাফল সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, ডিন বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেখতে পারে; শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষের জন্য তা উন্মুক্ত থাকে না।
অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কী হয়
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের শিক্ষক মূল্যায়ন করা বাধ্যতামূলক। তবে কোনো শিক্ষক কত নম্বর পেয়েছেন, তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো ক্যাম্পাসের নিউরোসায়েন্সেস বিভাগের গবেষক নাদিম মাহমুদ জানান, সেখানে শিক্ষক নিয়োগের পর নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নও বিবেচনায় নেওয়া হয়। তবে মূল্যায়ন ছাত্রসংসদ পরিচালনা করে না এবং ফল প্রকাশ্যেও আসে না।
মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালায় কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত মূল্যায়ন ফরম পূরণ করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন ও উদীয়মান প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ এরশাদুল করিম বলেন, তিনি কত নম্বর পেয়েছেন, তা তার সহকর্মীরাও জানতে পারেন না।
ডাকসুর উদ্যোগকে রাজনৈতিক বলছেন কেউ কেউ
শিক্ষক ও গবেষক আসিফ বিন আলী ডাকসুর উদ্যোগকে রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এর মাধ্যমে ছাত্রনেতাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নের উদ্দেশ্যে শিক্ষক মূল্যায়ন করা হলে সেটি নির্দিষ্ট একাডেমিক প্রক্রিয়ার মধ্যে হওয়ার কথা। এ ধরনের মূল্যায়নে পেশাগত ও তথ্যগত গোপনীয়তা রক্ষা করা হয় এবং ফলাফল শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নে কাজে লাগানো হয়।
তার মতে, শিক্ষক মূল্যায়নের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়েরই নেওয়া উচিত।
শিক্ষকদের নিয়ে নানা উদ্যোগ
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযুক্ত শিক্ষকদের তালিকা করার ঘটনা বেড়েছে।
সর্বশেষ ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে ‘গোপন তৎপরতায়’ যুক্ত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক এমন তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই বছরে অন্তত ৩২ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে শিক্ষকদেরই একটি পক্ষ।
‘গোপন তৎপরতায়’ যুক্ত থাকার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গত ১৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের কমিটি করেছে। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনার জন্যও আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে শিক্ষকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও ডাকসুর শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট নিয়ে আপত্তি তুলেছেন বিভিন্ন মতের শিক্ষক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মূল্যায়নের পক্ষে। তবে এই কাজ ডাকসুর এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষকদের মর্যাদা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষার্থীরা যাতে যথাযথভাবে তাদের মতামত দিতে পারেন, সেই ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন।
অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী বলেন, ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষক প্রশাসনের কাছে মৌখিকভাবে, ফোনে এবং সরাসরি দেখা করে অভিযোগ জানিয়েছেন। তার মতে, ডাকসুর ব্যবস্থায় শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।









