শিরোনাম

চোখের সামনে বিলের মতো খাল সরু নালা হয়ে গেল

চোখের সামনে বিলের মতো খাল সরু নালা হয়ে গেল
এটি কোনো ময়লার ভাগাড় নয়। রাজধানীর মিরপুরের বাইশটেকি খাল। শুধু ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে না, খাল দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে ভবন। এই খালের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

একসময় খালটি দিয়ে নৌকা চলাচল করতো। পানিও ছিল টলটলে পরিষ্কার। গোসলসহ গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার হতো এই পানি। এখন খালের সেই পানি কালচে হয়ে গেছে। বের হচ্ছে দুর্গন্ধ। খালের দুই পাড় দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বড় বড় ভবন ও টিনের ঘর। এতে খালের প্রস্থ ৩০ ফুট থেকে কমে কোথাও কোথাও ৫ ফুটে ঠেকেছে। চোখের সামনে বিলের মতো খাল সরু নালা হয়ে যাওয়ার কথা জানালেন স্থানীয় একজন। আর অবাধে ময়লা-আবর্জনা ফেলায় খালের অধিকাংশ এলাকা ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ।

এই দুরবস্থা রাজধানীর মিরপুরের বাইশটেকি খালের। তিন বছর আগে খালটি পরিষ্কার করেছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি)। খালটির যেসব স্থান ভরাট হয়ে গেছে এবং প্রস্থ কমে গেছে সেসব স্থানে খনন করার কথা ছিল ডিএনসিসির। কিন্তু আজও তারা খালটি পরিষ্কার বা খননের উদ্যোগ নেয়নি। এতে খালটির অনেক স্থান ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় লোকজন সরকারের কাছে বারবার খালটি রক্ষার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না সরকার।

বুধবার দুপুর ১২ টা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, বাইশটেকি খালের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় পানির রং কালো হয়ে গেছে। পলিথিনের ব্যাগ ও বর্জ্য জমে অনেক জায়গায় খালের গভীরতা কমে গেছে। খালের দুই পাড় দখলে নিয়ে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বহুতল ভবন, টিনশেড ভবন ও টিনের ঘরও আছে। এসব ভবন থেকেও খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। খালের কোথাও কোথাও ময়লা-আবর্জনা স্তূপ করে রাখা হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও এমনভাবে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে যে খালের গতিপথই বদলে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলার কারণে বাইশটেকি খালের পানি কালচে হয়ে গেছে। পানি পজে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলার কারণে বাইশটেকি খালের পানি কালচে হয়ে গেছে। পানি পজে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ডিএনসিসি ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাইশটেকি খালের দৈর্ঘ্য দেড় কিলোমিটার। এই খালটি মূলত বাউনিয়া খালের একটি অংশ। এটি মিরপুরের পলাশনগরের সাংবাদিক কলোনি খালের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পরে এটি প্যারিস রোড ও এভিনিউ-৫ হয়ে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের মধ্য দিয়ে রূপনগর খালের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

খাল নিয়ে এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া

বাইশটেকি এলাকার বাসিন্দা রিকশাচালক মো. সাফায়েত বলেন, ‘১৪ বছর ধরে বাইশটেকির মুন্সি বক্স আলী জামে মসজিদ এলাকায় থাকি। একসময় এই খালে নৌকা চলাচল করতে দেখেছি। পুরো এলাকায়ই তখন বিলের মতো ছিল, মানুষের বসবাসও কম ছিল। অনেকে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চওড়া খাল এখন সরু হয়ে গেছে।’

একই এলাকার বাসিন্দা মো. নোমান উদ্দিন। শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘এখানেই বেড়ে উঠেছি। জয়নগর ও বাইশটেকি খাল দুটো অনেক চওড়া ছিল। এখন খালের কোনো অংশ সংকুচিত হতে হতে একদম সরু হয়ে গেছে। খালের অনেক স্থান ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে ভরাট হয়ে গেছে। এতে বৃষ্টি হলেই এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।’

জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমে খালের সীমানা নির্ধারণ করে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। এরপর খালটি পুনঃখনন ও পরিষ্কার করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। এসব কাজ করা হলে মিরপুর এলাকার জলাবদ্ধতা দূর হবে এবং বর্ষাকালে মিরপুর এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে না।’

২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে ডিএনসিসির সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের উদ্যোগে জয়নগর এবং বাইশটেকি খালের আড়াই কিলোমিটার এলাকা পরিষ্কার করা হয়েছিল। তখন পানি প্রবাহ কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। পরে ময়লা-আবর্জনা ফেলতে ফেলতে খালটি আবার ভরাট করে ফেলা হয়। এতে খালে পানির প্রবাহ নেই বললেই চলে।

খালের প্রাণ ফেরাতে যা করতে হবে

নগর-পরিকল্পনাবিদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, খাল পরিষ্কার ও খননে সিটি করপোরেশনের টেকসই উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। তাই সংস্থাটিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে বাইশটেকি খাল সংকুচিত করে গড়ে তোলা সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এসব স্থাপনা নির্মাণের সময় দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বড় ভবন নির্মাণে অনুমোদন দেওয়া রাজউকের কর্মকর্তাদেরও তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে।

মিরপুরের বাইশটেকি খাল দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
মিরপুরের বাইশটেকি খাল দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়ে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শুধু খাল খনন কিংবা পরিষ্কার করলেই হবে না, কেউ যাতে খালে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে- সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যারা ময়লা ফেলবে, প্রয়োজনে তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

ডিএনসিসির বক্তব্য

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, বাইশটেকি খালে আগামী মাসেই পরিষ্কার এবং খননের কাজ শুরু হবে।

এবিষয়ে ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর), ড্রেনেজ সার্কেল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) কামরুল হাসান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ আমাদের খালটি খনন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা অলরেডি একটা কমিটি গঠন করেছি। আশা করছি, এ বছরের অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে কাজ শুরু হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নকশা অনুযায়ী খালের পাশে যেসব অবৈধ স্থাপনা রয়েছে, সেগুলো উচ্ছেদ করা হবে। কেউ যাতে খাল দখল করতে না পারে আমরা সেই ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবো। প্রায় তিন বছর আগে এই খালটি পরিষ্কার করা হয়েছিল। এরপর আর খালটি পরিষ্কার করা হয়নি।’

/বিবি/